২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর
কনটেইনার-কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে নতুন রেকর্ড, বেড়েছে জাহাজ আগমন
পরিবহন ধর্মঘট, শুল্ক কর্মকর্তাদের কর্মবিরতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটি কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে আগের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। বছর শেষ হওয়ার আগেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বন্দর সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সন্তোষ ও আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্দরে ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউস কনটেইনার এবং ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৮১২ মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। এ সময় বন্দরে এসেছে ৪ হাজার ৪০৬টি জাহাজ, যা এক বছরে সর্বোচ্চ জাহাজ আগমনের রেকর্ড।
২০২৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৬২৭ টিইইউস। এর তুলনায় ২০২৫ সালে অতিরিক্ত ১ লাখ ৩৩ হাজার ৪৪২টি কনটেইনার এবং ১ কোটি ৪১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৯৮ মেট্রিক টন কার্গো বেশি হ্যান্ডলিং হয়েছে। ফলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
বিভিন্ন লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক অপারেশনাল সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে বাল্ক কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি মোট কার্গো বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ অর্জন জাতীয় লজিস্টিক চেইন সচল রাখতে বন্দরের শক্ত অবস্থানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
এদিকে, চিটাগাং ড্রাইডভ লিমিটেড (সিডিডিএল) পরিচালিত টার্মিনালগুলো ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই–ডিসেম্বর) উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। এ সময়ে মোট ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৬৬৮ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে এককভাবে অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
২০২৫ সালে কাস্টমসের কলম বিরতি, বিভিন্ন ধর্মঘট ও দেশের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে লজিস্টিক খাতে চ্যালেঞ্জ থাকলেও চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের ওয়েটিং টাইম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অক্টোবর মাসে ওয়েটিং টাইম ছিল ১৮ দিন, আর নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে টানা ২৬ দিন করে জাহাজের ওয়েটিং টাইম শূন্য ছিল।
জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে জাহাজ সেবা ও মালামাল হ্যান্ডলিং খাত থেকে। প্রায় চার দশক ধরে (১৯৮৬ সাল থেকে) পুরোনো ক্যারেজ ট্যারিফে সেবা দেওয়া হলেও এসময়ে জ্বালানি, জনবল, যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বন্দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার সময়োপযোগীভাবে ট্যারিফ হালনাগাদের সিদ্ধান্ত নেয়। আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইডিওএমের সুপারিশ এবং স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা শেষে নতুন ট্যারিফ নির্ধারণ করে ১৪ সেপ্টেম্বর গেজেট আকারে প্রকাশ করে তা কার্যকর করা হয়।
২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মোট রাজস্ব আয় দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি। এ সময়ে রাজস্ব উদ্বৃত্ত হয়েছে ৩ হাজার ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৫১ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও সেবার মান বজায় রেখে রাজস্ব আরও বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
এছাড়া ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সরকারকে এক হাজার ৮০৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা রাজস্ব দিয়েছে, যা বন্দরকে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজস্ব প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থাপন করেছে।
ইএআর/এমএএইচ/এমএস