বহুজাতিক কোম্পানির তালিকাভুক্তি ‘অলীক স্বপ্ন’

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৩১ এএম, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
এআই মোটিফ ব্যবহার করে নির্মিত গ্রাফিক্স/জাগো নিউজ

দীর্ঘদিন গতিহীনতা, সংকোচন ও আস্থাহীনতার মধ্যে দিয়ে চলছে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার। এই প্রেক্ষাপটে বহুদিনের দাবি- বহুজাতিক কোম্পানিসহ শক্তিশালী মৌলভিত্তিসম্পন্ন ও বৈচিত্র্যময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা। তবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তি এখনো সেই ‘অলীক স্বপ্ন’।

বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে বাজারের গভীরতা বাড়ার পাশাপাশি তরলতা ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব বলে মনে করা হয়। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ারবাজারের গতি ফেরাতে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি ভালো কোম্পানি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সরকারের আন্তরিকতার অভাবে এ উদ্যোগ সফল হচ্ছে। শেয়ারবাজারের মন্দার পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির বিষয়ে পরামর্শ দেন। ফলে ধারণা করা হচ্ছিল এ সরকারের মেয়াদে হয়তো দু-একটি ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হবে। কিন্তু পরিস্থিতি এখনো আগের মতোই।

গত বছরের ১১ মে যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনে তার সভাপতিত্বে পুঁজিবাজারের সঠিক অবস্থা পর্যালোচনা ও উন্নয়নে করণীয় নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান, অর্থ উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা পুঁজিবাজারের উন্নয়নে বড় বড় কোম্পানি তালিকাভুক্ত করাসহ বেশকিছু নির্দেশনা দেন। প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি বৈঠকও করেছে। সবশেষ গত ৭ জানুয়ারি কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো), নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড, সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেড, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড, ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড, সিনোভিয়া বাংলাদেশ লিমিটেড, নোভার্টিস (বাংলাদেশ) লিমিটেড এবং নেসলে বাংলাদেশ পিএলসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অর্থ উপদেষ্টার সভাপতিত্বে সচিবালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

ওই বৈঠকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া হলেও তাদের পক্ষ থেকে খুব একটা ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। সূত্রটি আরও জানায়, বৈঠকে প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে দায়সারা উত্তর দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে— তালিকাভুক্তির বিষয়ে বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবে, বোর্ডে আলোচনা না করে তাদের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। তাদের কথার ধরন দেখে মনে হয়েছে, তারা তালিকাভুক্ত হতে চায় না। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে ইতিবাচক মনোভাব পাওয়া গেছে।

বৈঠকে উপস্থিত এক সদস্য নাম প্রকাশ না করে জানান, শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়ানোর লক্ষ্য আমরা প্রাথমিকভাবে ১০টি লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সরকারের শেয়ার থাকা বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছিলাম। সে লক্ষ্যেই ১০টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক হয়। তবে বৈঠকে অংশগ্রহণ করা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের মনোভাব দেখে মনে হয়েছে তারা তালিকাভুক্ত হতে চায় না।

তারা যে ধরনের কথা বলে, তা দীর্ঘ সময় ও জটিল প্রক্রিয়া মনে হয়েছে। এই সরকারের আমলে অর্থাৎ, আগামী দেড়-দুই মাসে কোনো বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্ত হবে বলে মনে হয় না। আমার কাছে মনে হয়েছে, এটি অতীতের মতোই একটি সাধারণ আলোচনা সভা হয়েছে। বাস্তবে এর কোনো ফল নাও পাওয়া যেতে পারে।

যে সব বহুজাতিক কোম্পানি ব্যবসা করে এই দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে আয় করছে, তাদের দায়বদ্ধতা আছে এই দেশের মানুষকে তার মালিকানার অংশ কিছুটা দেওয়া। এই দায়বদ্ধতা বাইরের দেশে আইন করে করা হয়েছে, আমাদের দেশেও যদি প্রয়োজন হয় সেক্ষেত্রে আইন করে এটা করতে হবে।- ডিএসই পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারি

দেশে ব্যবসা করা অনেক বহুজাতিক কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসছে না, বিষয়টি কীভাবে দেখছেন? এমন প্রশ্ন রাখা হলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারিও জাগো নিউজকে বলেন, ‘যে সব বহুজাতিক কোম্পানি ব্যবসা করে এই দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে আয় করছে তাদের দায়বদ্ধতা আছে এই দেশের মানুষকে তার মালিকানার অংশ কিছুটা দেওয়া। এই দায়বদ্ধতার বাইরের দেশে আইন করে করা হয়েছে, আমাদের দেশেও যদি প্রয়োজন হয় সেক্ষেত্রে আইন করে এটা করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এখানে আলাপ হতে পারে সেটা ১০-২০ শতাংশ হবে। কিন্তু তাদের বাধ্যতামূলক শেয়ারবাজারে আসতে হবে, এই নিয়ম করা উচিত। এক্ষেত্রে সরকার কীভাবে এ পদক্ষেপ নেবে, সে পরিকল্পনা করতে হবে। অতীতে সরকার কখনোই এ পদক্ষেপ নেয়নি। অনেকেরই মনের মধ্যে ভয় ছিল যে এ ধরনের পদক্ষেপ নিলে হয়তো সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাবে। এটা ঠিক নয়। কারণ, এখানে ব্যবসা আছে বলেই তো তারা এসেছে। ব্যবসা থাকলে সে সব নিয়ম-কানুন মেনেই আসবে, এটা নিয়ে এত চিন্তা করার কিছু আছে বলে আমি মনে করি না।’

আরও পড়ুন
গতিহীন শেয়ারবাজার
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারমূল্য শূন্য ঘোষণা
শেয়ারবাজারে ঢালাও দরপতন
সঞ্চয়পত্রের ‘ধাক্কা’ শেয়ারবাজারে

সরকারি ভালো কোম্পানির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত না হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘অতীতে সরকারি শেয়ারগুলো আসেনি, আমরা অনেকবার চেষ্টা করেছি। আমার যেটা মনে হয়— এখানে (সরকারি প্রতিষ্ঠানে) যারা স্বাধীন পরিচালক হন তারা রাজনৈতিক লোকজন। আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে, তাহলে তারা বোর্ডের বাইরে অন্য কোনোভাবে সুবিধা পান। এ কারণে তাদেরও একটা আপত্তি থাকে এই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার শেয়ারবাজারে আনার ক্ষেত্রে। এখন যেহেতু একটা অরাজনৈতিক সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে, সুতরাং আমি মনে করি এই সরকারের পক্ষে এসব প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে আনা সহজ হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা (সরকারি ভালো প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হলে) করলে শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সুবিধা পাবেন তা কিন্তু নয়, সরকারও লাভবান হবে। সুতরাং, অবশ্যই সরকারের এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। আমি মনে করি নির্বাচিত সরকার আসার আগেই এ ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে বর্তমান সরকারের কাজ করা উচিত।’

১০টি সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্তির বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো তালিকাভুক্ত হলে বাজার কীভাবে উপকৃত হবে? এমন প্রশ্ন করলে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আলোচনা মাধ্যমে কিছু হবে বলে মনে হয় না। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক যে এই সরকারের সময় একটা শেয়ারও বাজারে আসেনি। বহুজাতিক ও সরকারি ফান্ডামেন্টাল প্রতিষ্ঠানগুলো তালিকাভুক্ত করতে পারলে শেয়ারবাজারের অনেক উপকার হতো।’

সরকারি ভালো কোম্পানিগুলো কেন শেয়ারবাজারে আসে না? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এখানে একটা সমস্যার, যারা এই কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদে থাকেন তারা চান না। বড় সমস্যা হচ্ছে সরকারি যেসব কর্মকর্তা এসব কোম্পানিতে আছেন, তারা চান না এগুলো শেয়ারবাজারে আসুক। হয়তো তারা এসব কোম্পানি থেকে অন্য কোনো সুবিধা পান, তালিকাভুক্ত হলে সেই সুবিধা পুরোপুরি পাবেন না।’

আমি বলবো তারা যদি কিছু ইনসেনটিভ চায়, করছাড় চায়, সেটা দেওয়া হোক। আর যদি না আসে, তাহলে কর বাড়িয়ে দিতে হবে। ভেরি সিম্পল। তা না হলে আরও বহুদিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।- আইসিবি চেয়ারম্যান আবু আহমেদ

সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে কীভাবে দেশের শেয়ারবাজারে আনা যায়? এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি সরকারি মৌলভিত্তিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজারে না আসা এক ধরনের বৈষম্য। এ বৈষম্য থেকে বের হওয়ার জন্য আমরা বলছি এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে আনার জন্য। এক্ষেত্রে একটাই পদক্ষেপ, তা হলো সরকারি সিদ্ধান্ত। সরকার আন্তরিকভাবে চাইলেই এ প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজারে আনা সম্ভব।’

গত ৭ জানুয়ারি বহুজাতিক ও সরকারি ১০টি কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়— বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিষয়ে বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে? উত্তরে তিনি বলেন, ওখানে (বহুজাতিক কোম্পানিতে) আমাদেরও (সরকারের) শেয়ার আছে, কিন্তু তালিকাভুক্ত নয়। ওরা বলেছে ওদের সিদ্ধান্ত বোর্ড ছাড়া হবে না। তবে সরকার থেকে আমরা সম্মতি দিয়েছি।

এ বিষয়ে তো আগেও আলোচনা হয়েছে। এমন কথা বলা হলে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, আগে এত দূর যায়নি। এবার মন্ত্রণালয় সম্মতি দিয়েছে। বর্তমান সরকারের মেয়াদে কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হবে? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি। এগুলো জটিল। কোম্পানি আইনকে তো আমরা উপেক্ষা করতে পারি না।

বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান আবু আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকার চাচ্ছে পাবলিক ইন্টারেস্টে। পাবলিক ইন্টারেস্টের চেয়ে কোনো বড় ইন্টারেস্ট কারও নেই। নেসলে যদি বোম্বেতে লিস্টেড থাকতে পারে, আমাদের এখানে সমস্যাটা কী? ইউনিলিভার জিএসকের অংশ তালিকাভুক্ত, কিন্তু তাদের মূল অংশ তালিকাভুক্ত নয়। কিন্তু বোম্বেতে টপ টেনের মধ্যে আছে। পাকিস্তানে আছে, থাইল্যান্ডে আছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি বলবো তারা যদি কিছু ইনসেনটিভ চায়, করছাড় চায়, সেটা দেওয়া হোক। আর যদি না আসে, তাহলে কর বাড়িয়ে দিতে হবে। ভেরি সিম্পল। তা না হলে আরও বহুদিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ইউনিলিভারে সরকারের ৪০ শতাংশের মতো শেয়ার আছে। এই ৪০ শতাংশের মধ্যে ৫ শতাংশও ছাড়তে চায় না। আমি বলি আমার সরকারি শেয়ারও বেচতে পারবে না? ওরা বলে বিদেশে ওদের বোর্ড মিটিং লাগবে।’

এমএএস/এএসএ/এমএফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।