স্পিনিং খাতের সংকট দীর্ঘ হলে ঝুঁকিতে পড়বে গার্মেন্টস শিল্প

ইব্রাহীম হুসাইন অভি
ইব্রাহীম হুসাইন অভি ইব্রাহীম হুসাইন অভি
প্রকাশিত: ১০:২৩ এএম, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬

গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে দেশের টেক্সটাইল ও স্পিনিং খাত। এই খাতকে আলাদা কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়ার দাবি নয়—বরং অবহেলা না করে সময়মতো বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি। যদি স্পিনিং খাতকে রক্ষা করা না যায়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের গার্মেন্টস শিল্পও ঝুঁকির মুখে পড়বে, বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সাবেক পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাজীব হায়দার।

আউটপেস স্পিনিং মিলস লিমিটেডের এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরও বলেন, আমরা অনির্দিষ্টকালের জন্য সুরক্ষা চাই না। আমাদের দাবি ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ, যুক্তিসঙ্গত নীতি সহায়তা এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এসব সহায়তা পেলে এই খাত আবারও নিজের শক্তিতে দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে—যেমনটি অতীতে ছিল।

জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন ইঞ্জিনিয়ার রাজীব হায়দার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি ইব্রাহীম হুসাইন অভি

জাগো নিউজ: টেক্সটাইল খাতে চলমান সংকটের মূল কারণ কী? কেন এটি এত গভীর হচ্ছে?

রাজীব হায়দার: মূল সমস্যাটা কমবেশি সবার জানা এবং এখন সবাই মোটামুটি বুঝতে পারছে। গত দুই মাসেই ৫০টির বেশি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে। এই মিলগুলো বন্ধ হওয়ার কারণে পুরো টেক্সটাইল সেক্টরে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে। বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা প্রতি কেজি সুতায় প্রায় ৩০ সেন্টেরও বেশি লোকসান দিচ্ছি। অর্থাৎ আমাদের উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে সুতা বিক্রি করতে হচ্ছে।

আরও পড়ুন
১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার
নির্দেশনা বাতিলের দাবিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে বিজিএমইএ-বিকেএমইএর চিঠি
বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের আদেশ বাতিলের আহ্বান

আজকের এ পরিস্থিতির মূল কারণ হলো—ভারত থেকে আমাদের দেশে ডাম্পিং প্রাইসে সুতা প্রবেশ করছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ব্যাপক সরকারি প্রণোদনার সুবিধা নিয়ে এই কাজটি করছে। তাদের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রণোদনা আছে, পাশাপাশি প্রাদেশিক সরকারেরও আলাদা আলাদা প্রণোদনা রয়েছে। এই সব প্রণোদনা ব্যবহার করে তারা ভর্তুকি দামে বাংলাদেশে সুতা রপ্তানি করছে।

জাগো নিউজ: কেন ভারতের কথা আসছে?

রাজীব হায়দার: একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—ভারতের মোট সুতা রপ্তানির প্রায় ৪৬ শতাংশই বাংলাদেশে আসে। অন্যদিকে বাংলাদেশের মোট সুতা আমদানির প্রায় ৭৬ শতাংশ আসে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে। শুধু তিনটি এইচএস কোডে তুলার সুতার আমদানি টাকার অঙ্কে বেড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা থেকে ২৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের আগের দুই বছরে যেখানে আমদানি ছিল প্রায় ৩৫ কোটি কেজি, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৭০ কোটি কেজি।

এই আমদানি এত দ্রুত বেড়ে যাওয়ার একমাত্র কারণ হলো প্রাইস অ্যাডভান্টেজ। যদি এই সুবিধা না থাকত, তাহলে এত বড় ভলিউমে আমদানি হতো না। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বায়াররা ওপেন কস্টিং শিটে গার্মেন্টস মালিকদের বলে দিচ্ছেন—ভারতের নির্দিষ্ট মিল থেকে এই দামে সুতা কিনে এনে বাংলাদেশে শুধু সেলাই করতে। ফলে দেশীয় গার্মেন্টস কারখানাগুলো শুধু সামান্য ভ্যালু অ্যাডিশনের অংশ পাচ্ছে।

জাগো নিউজ: আপনারা কি বিষয়টি সরকারকে জানিয়েছেন?

রাজীব হায়দার: অসম প্রতিযোগিতার কারণে আজ দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। আমরা সরকারের কাছে বারবার বিষয়টি তুলে ধরেছি, তথ্য দিয়েছি, উপাত্ত দিয়েছি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি বিশ্লেষণ করে একটি যৌক্তিক সুপারিশ অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। এখন অর্থ মন্ত্রণালয় যদি এনবিআরকে নির্দেশ দেয় এবং সেখান থেকে কার্যকর সিদ্ধান্ত আসে, তাহলেই কিছুটা স্বস্তি মিলবে।

আরও পড়ুন
বাংলাদেশ সুতা আমদানি বন্ধ করলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারতের চাষিরা
বাংলাদেশের কাপড়-পাট-সুতার পণ্য আমদানিতে ভারতের নিষেধাজ্ঞা
তুলা আমদানিতে ২ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার চান টেক্সটাইল মালিকরা

তা না হলে দেশের মিলগুলো ধীরে ধীরে ক্যাপাসিটি হারাবে এবং একসময় আমরা শতভাগ আমদানি নির্ভর হয়ে পড়ব। তখন সুতা আমদানি করে শুধু এক্সপোর্ট চালু রাখার সক্ষমতা কি থাকবে—এটাই বড় প্রশ্ন।

জাগো নিউজ: ভারত সরকার কি আগে ব্যবসায়ীদের এ ধরনের সুবিধা দিত না? তখন তো এমন সংকট দেখা যায়নি।

রাজীব হায়দার: এই সুবিধাগুলো আগে ছিল, কিন্তু ২০২১-২২ সালের পর থেকে ভারত এগুলো আরও তীব্রভাবে বাড়িয়েছে। ভারতের পরিস্থিতিটা একটু বুঝতে হবে। সেখানে শক্তিশালী একাধিক লবি কাজ করে—তুলা চাষিদের লবি আছে, মেশিন ম্যানুফ্যাকচারারদের লবি আছে, গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল মিল মালিকদের আলাদা লবি আছে।

ভারতে একটি স্পিনিং মিল করতে গেলে একজন মিল মালিককে এক টাকারও মেশিন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় না। সব মেশিন নিজ দেশ থেকেই সংগ্রহ করা যায়। ফলে একটি মিল স্থাপনের খরচ আর আমাদের দেশের মিল স্থাপনের খরচের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আমরা ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ডের অত্যাধুনিক মেশিন ব্যবহার করি। আমাদের উৎপাদন দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের চেয়ে ভালো।

তবু তারা নিজস্ব তুলা, নিজস্ব মেশিন, নিজস্ব জমির সুবিধা নিয়ে আবার সরকারিভাবে স্পিনিং ও টেক্সটাইল খাতে প্রণোদনা দেয়—অনেক ক্ষেত্রেই ডব্লিউটিওর সীমাবদ্ধতা পাশ কাটিয়ে। তাদের স্ট্র্যাটেজি অত্যন্ত ইনোভেটিভ।

আর আমরা কী করছি? আমরা কোনো প্রণোদনা দিচ্ছি না। বরং আগে গার্মেন্টস মালিকরা দেশীয় সুতা ব্যবহার করলে যে ৫ শতাংশ ইনসেনটিভ পেতেন, সেটাও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের কথা বলে কমিয়ে ১.৪ শতাংশ করা হয়েছে। এটা একেবারেই বিপরীতমুখী নীতি।

আগে যখন গার্মেন্টস মালিকরা ৫ শতাংশ ইনসেনটিভ পেতেন, তখন ভারতীয় সুতার সঙ্গে যদি ১০ বা ২০ সেন্ট দামের পার্থক্যও থাকত, তবুও তারা দেশীয় সুতা কিনতেন। কারণ ইনসেনটিভ সেই পার্থক্যটা পুষিয়ে দিত। এখন সেই বিশ্বাসটাও নষ্ট হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন
সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারে বায়াররা উদ্বিগ্ন
বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহারের আদেশ বাতিলের দাবি
ট্যারিফ কমিশন একপক্ষীয় সুপারিশ করেছে, দাবি রপ্তানিকারকদের

বাস্তবতা হলো—বিশ্ববাজারে সামান্য পার্থক্য হলেই কেউ দেশীয় সুতা নেবে না, যদি নীতিগত সমর্থন না থাকে।

জাগো নিউজ: এই সংকট যদি চলতেই থাকে—তাহলে সামনে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

রাজীব হায়দার: এই সংকট যদি চলমান থাকে, তাহলে খুব স্পষ্টভাবে বলতে হয়—দেশের স্পিনিং মিলগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। আজ যারা কোনোমতে অপারেশন চালাচ্ছে, তারা ধীরে ধীরে ক্যাপাসিটি কমাবে, অনেক মিল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আমরা এমন একটি অবস্থায় পৌঁছাব, যেখানে দেশীয় সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় শূন্যের দিকে চলে যাবে।

এর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—বাংলাদেশ তখন পুরোপুরি আমদানি নির্ভর হয়ে পড়বে। আজ যদি আমরা নিজেদের সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা হারাই, তাহলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো সংকট হলে বা কোনো দেশ যদি হঠাৎ করে রপ্তানি সীমিত করে, তখন আমাদের গার্মেন্টস এক্সপোর্টও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তখন শুধু বন্ডেড সুবিধা বা ইন্টারনাল সোর্সের কথা বলে আর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না।

জাগো নিউজ: সরকারের কাছে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন এই মুহূর্তে?

রাজীব হায়দার: আমরা খুব অযৌক্তিক কিছু চাইছি না। আমরা চাই একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। ভারত যেভাবে তাদের প্রণোদনার মাধ্যমে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করেছে, তার বিপরীতে আমাদেরও ন্যূনতম নীতিগত সাপোর্ট দরকার।

প্রথমত, ডাম্পিং প্রাইসের বিরুদ্ধে কার্যকর ট্রেড রেমেডি ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশীয় সুতা ব্যবহারে গার্মেন্টস খাতকে আবার উৎসাহিত করতে হবে—আগের মতো ইনসেনটিভ কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। তৃতীয়ত, নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন দরকার। কারণ এখানে প্রতিদিন দেরি মানে আরও মিল বন্ধ হওয়া, আরও কর্মসংস্থান হারানো।

জাাগো নিউজ: আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার যুগে টিকে থাকতে হলে দেশীয় মিলগুলোকে আরও দক্ষ হতে হবে। আপনি এই যুক্তিকে কীভাবে দেখেন?

রাজীব হায়দার: দক্ষতার প্রশ্নে আমাদের কোনো ঘাটতি নেই। আমাদের মিলগুলো অত্যাধুনিক ইউরোপিয়ান মেশিনারিজ ব্যবহার করে, আমাদের উৎপাদন দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে ভালো। কিন্তু প্রশ্ন হলো—দক্ষতার সঙ্গে যদি নীতিগত বৈষম্য যুক্ত হয়, তাহলে শুধু দক্ষতা দিয়ে টিকে থাকা যায় না।

আরও পড়ুন
সুতা আমদানি বন্ধে নতুন বিপদে পোশাক রপ্তানিকারকরা
ভারতীয় সুতার কারণে ক্ষতির মুখে দেশীয় টেক্সটাইল মিলস
কম দামে সুতা রপ্তানি করে ভারত আগ্রাসন চালাচ্ছে: রাজীব হায়দার

আপনি যদি একদিকে প্রণোদনা দেন, ভর্তুকি দেন, আর অন্যদিকে কোনো দেশকে সেই সুবিধা ছাড়া প্রতিযোগিতায় নামান—তাহলে সেটা আর মুক্তবাজার থাকে না। সেটা অসম প্রতিযোগিতা হয়ে যায়। আজকে আমাদের সঙ্গে ঠিক সেটাই হচ্ছে।

জাগো নিউজ: এই সংকটের প্রভাব কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে কীভাবে পড়তে পারে?

রাজীব হায়দার: স্পিনিং মিল মানে শুধু একটি কারখানা নয়—এর সঙ্গে হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন জড়িত। একটি মিল বন্ধ হওয়া মানে সরাসরি কর্মসংস্থান হারানো, পরোক্ষভাবে পরিবহন, কেমিক্যাল, প্যাকেজিংসহ আরও অনেক সাপ্লাই চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।

টেক্সটাইল খাত গার্মেন্টস শিল্পের ভিত্তি। এই ভিত্তি দুর্বল হলে পুরো এক্সপোর্ট ইকোসিস্টেম ঝুঁকির মুখে পড়বে। তখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, বিনিয়োগ আস্থা—সবকিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

জাগো নিউজ: নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা কী?

রাজীব হায়দার: আমাদের একটাই অনুরোধ—এই খাতটাকে আলাদা করে দেখার কিছু নেই, কিন্তু অবহেলা করার সুযোগও নেই। সময় থাকতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আজ যদি আমরা স্পিনিং খাতকে বাঁচাতে না পারি, কাল গার্মেন্টস খাতও নিরাপদ থাকবে না।

আমরা চাই না অনির্দিষ্টকাল সুরক্ষা। আমরা চাই ন্যায্য প্রতিযোগিতা, যুক্তিসঙ্গত নীতি সহায়তা এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। সেটুকু পেলে এই খাত নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবে—আগের মতোই।

আইএইচও/এমএমএআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।