গভর্নরের কাছে প্রত্যাশা
ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে বিনিয়োগবান্ধব নীতি জরুরি
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমান। সদ্য বিদায়ী গভর্নর অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
মো. মোস্তাকুর রহমান এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছেন যখন ব্যাংক খাত কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণ এবং শৃঙ্খলার অভাবে ব্যাংক খাত এখন গভীর সমস্যায় জর্জরিত। পাশাপাশি বাকি রয়েছে অনেক সংস্কার কাজও। এ অবস্থায় এটা ধরে নেওয়া যায় যে, নতুন গভর্নরের জন্য সামনে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একদিকে নতুন গভর্নরের কাছে তাদের প্রত্যাশা আছে, অন্যদিকে রয়েছে চ্যালেঞ্জ। সবাই আশা করছেন, নতুন গভর্নর বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়ে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলা করবেন। একই সঙ্গে তার জন্য চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক চাপ, শক্তিশালী ঋণ খেলাপিদের মোকাবিলা করে এ খাতের শৃঙ্খলা পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা।
নতুন গভর্নরের সামনে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। কোনো কোনো ব্যাংকের পারফরম্যান্স খারাপ, ডিপোজিটে সমস্যা রয়েছে। সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতের অবস্থা দুর্বল
মো. মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী মহলে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তবে অর্থনীতিবিদরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।
সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ
নতুন গভর্নরের সামনে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। কোনো কোনো ব্যাংকের পারফরম্যান্স খারাপ, ডিপোজিটে সমস্যা রয়েছে। সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতের অবস্থা দুর্বল। এ প্রেক্ষাপটে ব্যাংক খাতকে পুনরায় স্থিতিশীল করা এবং লিকুইডিটি (তারল্য) নিশ্চিত করা নতুন গভর্নরের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হলেন মোস্তাকুর রহমান
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবর্তন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া: অর্থমন্ত্রী
গভর্নরকে অপসারণের খবরে ঘুরে দাঁড়ালো শেয়ারবাজার
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ- সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন জাগো নিউজকে বলেন, খেলাপি ঋণের সমস্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা ডিফল্টে (খেলাপি) আছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে প্রভাবশালী। এদের সঙ্গে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা এবং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না। তবে যদি গভর্নরের দৃঢ় কমিটমেন্ট থাকে এবং নীতিগতভাবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সাপোর্ট পান, তিনি ব্যাংক খাতকে পুনরায় সুষ্ঠু ও স্থিতিশীল করতে পারবেন।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি জাগো নিউজকে বলেন, সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নতুন গভর্নর নিয়োগ প্রত্যাশিত ছিল। তবে দ্রুত এই পরিবর্তন আনা অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিত মনে হয়েছে। তার মতে, গভর্নর পরিবর্তন কেবল প্রশাসনিক রদবদল নয়; এর প্রভাব মুদ্রানীতি, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ও চলমান সংস্কার কার্যক্রমে পড়তে পারে।
এসময় তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রমে সরকারের হস্তক্ষেপ কমিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন এ অর্থনীতিবিদ। একই সঙ্গে বড় ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং কৃষি ও মৎস্য খাতের স্বার্থ বিবেচনায় ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কথা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আব্দুল বায়েসের সঙ্গে। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, নতুন গভর্নর নিয়োগ সরকারের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত। তবে তার সফলতা নির্ভর করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগের ওপর। তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখা এবং সব খাতের স্বার্থ বিবেচনায় নীতি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন।
ঋণ খেলাপি প্রসঙ্গে ড. বায়েস বলেন, এটি কোনো একক গভর্নরের কারণে হয় না; বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশ, আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট। তিনি মনে করেন, নতুন গভর্নরের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা
দীর্ঘ কর্মজীবনে মোস্তাকুর রহমান দেশের শীর্ষ শিল্প ও ব্যবসায়িক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ফলে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন তার অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন।
আরও পড়ুন
রিটার্ন দাখিলে ফের সময় বাড়ানোর প্রস্তাব, এখনো সরকারের ‘সংকেত’ মেলেনি
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতে বাংলাদেশের লাভ না ক্ষতি?
‘নগদ’ কীভাবে চলবে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার: ব্যারিস্টার আরমান
ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশা করেন যে, নতুন গভর্নর ব্যাংক খাতকে সঠিক ধারায় আনবেন এবং ব্যবসায়ীদের সমস্যা বুঝে নীতি নেবেন, যা দেশের অর্থনীতি সচল ও গতিশীল করবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নতুন গভর্নর অবশ্যই বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেবেন। বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় দায়িত্ব পালন একটা বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যবসায়ী হিসেবে তার অভিজ্ঞতা আছে এবং ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো নতুন গভর্নর দ্বারা সম্ভব হবে। এ ধরনের সমস্যার মোকাবিলা করে এ খাতকে স্থিতিশীল করতে পারবেন তিনি।
বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি মূলত বেসরকারি খাতনির্ভর। উন্নত দেশগুলোতেও বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আনা হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশেও এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ঢাকা চেম্বার নতুন গভর্নরকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাচ্ছে। তার ভাষ্য, প্রথমবারের মতো একজন ব্যবসায়ী ও এফসিএমএ এই ঐতিহাসিক দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বেসরকারি খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন।
তাসকিন আহমেদ আশা প্রকাশ করেন, নতুন গভর্নর দ্রুত বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল, নীতিগত সুদের হার পুনর্বিবেচনা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন। পাশাপাশি ঋণের খরচ যৌক্তিক পর্যায়ে আনা, সিএমএসএমই খাতের জন্য পর্যাপ্ত তারল্য নিশ্চিত করা এবং খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান নতুন গভর্নরের প্রতি ইতিবাচক প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, আগের গভর্নর ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও অর্থ পাচার রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, যা প্রশংসনীয়। নতুন গভর্নর একজন ব্যবসায়ী হওয়ায় তার বাস্তব অভিজ্ঞতা দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতকে আরও গতিশীল করতে সহায়ক হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ফজলে শামীম এহসানের মতে, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি মূলত বেসরকারি খাতনির্ভর। উন্নত দেশগুলোতেও বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আনা হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশেও এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন গভর্নরের নেতৃত্বে ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যকর হলে ব্যক্তিগত খাতের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোও সুবিধা পাবে। পাশাপাশি ঋণ খরচ যুক্তিসঙ্গত করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত তহবিল নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক পরিবেশকে স্থিতিশীল ও বিনিয়োগ-বান্ধব করা সম্ভব হবে।
ইএআর/আইএইচও/কেএসআর