তেল কেনায় অনিয়ম
জাগো নিউজের সংবাদে তাৎক্ষণিক ওএসডি বিপিসি কর্মকর্তা
সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে বেসরকারি চারটি সিআরইউ রিফাইনারি থেকে জ্বালানি তেল কেনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে বেসরকারি সিআরইউ প্ল্যান্ট থেকে তেল কিনে যোগসাজশে বেশি টাকা পরিশোধ করে সংশ্লিষ্টরা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটিও ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ না করা নিয়ে জাগো নিউজে সংবাদ প্রকাশের জেরে মূল অভিযুক্ত কর্মকর্তা শাহরিয়ার মোহাম্মদ রাশেদকে সচিবের দপ্তরে সংযুক্ত (ওএসডি) করা হয়েছে।
বিপিসির তেল কেনার প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় সংস্থাটির তিন মাসে ২৮ কোটি টাকা গচ্চার অভিযোগ ওঠে। মন্ত্রণালয় গঠিত উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি পৌনে ১৮ কোটি টাকা গচ্চার প্রমাণ পায়। যথাযথ প্রমাণ মেলার পরও সরকারি এসব টাকা উদ্ধারে প্রতিবেদনের সুপারিশ করেনি তদন্ত কমিটি। পুরো ঘটনায় জড়িত মূলহোতার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো সুপারিশ নেই প্রতিবেদনে।
রোববার (৮ মার্চ) বিকেলে ‘বিপিসির গচ্চা আদায়ে তদন্ত কমিটির গড়িমসি’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাগো নিউজ। এ সংবাদের পর সন্ধ্যায় বিপিসির প্রধান কার্যালয়ে জরুরি সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক বিপিসির বণ্টন ও বিপণন বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক শাহরিয়ার মোহাম্মদ রাশেদকে বিপিসি সচিবের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। বিপিসি সচিব শাহিনা সুলতানার সই করা এক অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। একই আদেশে আরও ১১ কর্মকর্তাকে দপ্তর পরিবর্তন করা হয়।
জানা যায়, আমদানির পাশাপাশি দেশীয় বেসরকারি চারটি সিআরইউ রিফাইনারি থেকে জ্বালানি তেল কিনে বিক্রি করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এসব তেলের ক্রয়মূল্য নির্ধারণে সরকারি আদেশকে তোয়াক্কা না করে অর্থের বিনিময়ে বিলম্বে প্রজ্ঞাপন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে বিপিসির সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। এতে বিগত অর্থবছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে বিপিসির প্রায় ২৮ কোটি টাকা গচ্চা গেছে।
এ নিয়ে গত ২২ নভেম্বর জাগো নিউজে “বেসরকারি প্ল্যান্টের তেল কিনে ৩ মাসে বিপিসির ‘গচ্চা’ ২৮ কোটি টাকা” শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরের দিন প্রতিবেদনটি আরও একটি পত্রিকায় হুবহু প্রকাশিত হয়। তথ্য অধিদপ্তরের বরাতে প্রতিবেদনের বিষয়টি সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপদেষ্টা মোহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের নজরে এলে তিনি অভিযোগটি তদন্ত করার নির্দেশ দেন। এরপর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে জ্বালানি বিভাগ।
আরও পড়ুন
- বিপিসির গচ্চা আদায়ে তদন্ত কমিটির গড়িমসি
বেসরকারি প্ল্যান্টের তেল কিনে ৩ মাসে বিপিসির ‘গচ্চা’ ২৮ কোটি টাকা
গত ১ ফেব্রুয়ারি তদন্ত কমিটি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। এর এক মাস পর গত ১ মার্চ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপ-সচিব মো. বজলুর রশীদের সই করা দাপ্তরিক এক চিঠিতে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উপস্থাপিত সুপারিশগুলো বিপিসির বোর্ড সভায় উপস্থাপনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য বিপিসি চেয়ারম্যানকে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
তদন্ত কমিটির পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিন মাসে বিলম্বে মূল্য বিজ্ঞপ্তি জারির কারণে বিপিসির ২৮ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়। কিন্তু বিপিসির দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে তিন মাসে ১৭ কোটি ৭৮ লাখ ৯৭ হাজার ৩১৯ টাকা ৫৯ পয়সা আর্থিক ক্ষতি নির্ধারণ করে তদন্ত কমিটি।
প্রতিবেদনের এক পর্যালোচনায় তদন্ত কমিটি উল্লেখ করে, ২০২২ সালে প্রাইসিং কমিটি গঠনের পর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত শাহরিয়ার মো. রাশেদ উপ-মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া মূল্য বিজ্ঞপ্তি জারির তারিখ পর্যালোচনায় দেখা যায়, জুলাই ২০২৪ থেকে জুন ২০২৫ এর আগে কোনো মাসেই নির্দেশনা অনুযায়ী ৭ তারিখের মধ্যে মূল্য বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়নি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সার্বিক বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ১০-১০-২০২২ তারিখের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বিপিসির প্রাইসিং কমিটির দায়িত্ব ছিল প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেলের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ এবং বিজ্ঞপ্তি জারি করা। তবে বাস্তবে মূল্যবিজ্ঞপ্তি জারি করতে অতিরিক্ত ৩ থেকে ১০ দিন সময় লেগেছে, যাকে তারা (প্রাইসিং কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব) একটি ‘চলমান প্রশাসনিক প্রক্রিয়া’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
সভার পর কার্যবিবরণী প্রস্তুত, সদস্যদের স্বাক্ষর সংগ্রহ, নথি উপস্থাপন ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের কারণে বিলম্ব হয়েছে বলে দাবি করা হয়। বিলম্বের বিষয়টি একবার নয়, বরং একাধিক মাসে পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। অভিযোগ ওঠার পর বিপিসি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন পেশের জন্য বলা সত্ত্বেও কমিটি তিন মাস পর ‘বিষয়টি স্পর্শকাতর’ উল্লেখ করে তদন্তে অপারগতা প্রকাশ করে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। পরবর্তীসময়ে প্রাইসিং কমিটির সদস্য সচিবকে অন্য বিভাগে বদলি করার পর প্রাইসিং বিজ্ঞপ্তি নিয়মিত হওয়ায় বিপিসির আর্থিক ক্ষতি বন্ধ হয়, যা অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও জোরালো করে।
বিশ্লেষণে আরও প্রতীয়মান হয় যে, প্রাইসিং কমিটির সদস্য সচিব বিপিসির নিজস্ব ডিজিএম পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা। অন্যদিকে এ (প্রাইসিং) কমিটির আহ্বায়ক প্রেষণে নিযুক্ত একজন কর্মকর্তা। সরকার কোনো কর্মকর্তাকে কোনো দপ্তরে প্রেষণে নিয়োগ দিলে তাকে কাজ বুঝিয়ে দেওয়া বা তার কাছ থেকে কাজ করিয়ে নেওয়া ওই দপ্তরের স্থায়ী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব। বিপিসিতে পরিচালক (অপারেশন ও পরিকল্পনা) হিসেবে ড. এ কে এম আজাদুর রহমান গত ৫ মার্চ ২০২৫ তারিখ অপরাহ্নে যোগ দেন এবং পদাধিকারবলে তিনি প্রাইসিং কমিটির আহ্বায়ক। তবে প্রাইসিং কমিটির সদস্য সচিব শাহরিয়ার মোহাম্মদ রাশেদ ২০২২ সাল থেকে এ কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ফলে নির্ধারিত সময়ে মূল্য নির্ধারণী বিজ্ঞপ্তির গুরুত্ব তার জানা ছিল। তবে তিনি যথেষ্ট সময় নিয়ে সভা আহ্বান, কার্যবিবরণী অনুমোদন ও নথি উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের উদ্যোগ নেননি, যা কর্তব্য কর্মে অবহেলার শামিল। ফলে মার্চ ২০২৫ থেকে মে ২০২৫ সময়কালে বিপিসির ১৭ কোটি ৭৮ লাখ ৯৭ হাজার ৩১৯ টাকা ৫৯ পয়সা আর্থিক ক্ষতি হয় (বিপিসি থেকে প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী)।
প্রতিবেদনে চারটি মতামত ও সুপারিশ দেয় তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে তদন্তে নিশ্চিত হওয়া বিপিসির ১৭ কোটি ৭৮ লাখ ৯৭ হাজার ৩১৯ টাকা ৫৯ পয়সা আর্থিক ক্ষতির টাকা উদ্ধারে কোনো সুপারিশ করেনি তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উপস্থাপিত সুপারিশসমূহ বিপিসির বোর্ড সভায় উপস্থাপনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য গত ১ মার্চ বিপিসি চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। তবে রোববারের বোর্ড সভায় তোলার জন্য প্রথম দিকে সিদ্ধান্ত হলেও বিপিসি চেয়ারম্যানের নির্দেশে বোর্ড সভার এজেন্ডায় রাখা হয়নি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন। তবে জাগো নিউজে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সন্ধ্যায় প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে সচিবের দপ্তরের সংযুক্ত করে অফিস আদেশ জারি করে বিপিসি।
এমডিআইএইচ/এএমএ