৭ লাখ টন ডিজেল কেনার অনুমোদন মিললেও সরবরাহ নিয়ে দোটানা

ইকবাল হোসেন
ইকবাল হোসেন ইকবাল হোসেন , নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৯:৫৮ পিএম, ০৪ এপ্রিল ২০২৬
প্রতীকী ছবি/এআই নির্মিত

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে তরল জ্বালানি ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন নিয়ে ঘুম হারাম অবস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কমেছে মজুত। আমদানিতে দাম বাড়ার পাশাপাশি রয়েছে নানান অনিশ্চয়তা। এরই মধ্যে সরকার স্পট মার্কেট থেকে সাত লাখ টন ডিজেল কেনার অনুমোদন দিয়েছে। তবে মিলছে না ‘পারফরম্যান্স গ্যারান্টি’ (পিজি)।

সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে স্পট মার্কেট থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল সংগ্রহের কার্যক্রমেও ইতিবাচক গতি আসেনি। বিশেষ করে বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগের সুপারিশের পর ইতোমধ্যে অর্থবিভাগ অনুমোদন দিলেও প্রায় সোয়া আট লাখ টন জ্বালানি পাওয়া নিয়ে কাটেনি অনিশ্চয়তা। এর মধ্যে সাত লাখ টন ডিজেল সরবরাহের জন্য ‘নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়ার পরেও সম্ভাব্য সরবরাহকারীরা নিয়ম অনুযায়ী ‘পারফরম্যান্স গ্যারান্টি’ (পিজি) জমা না দেওয়ায় এখনো ওই তেল পাওয়া নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে। অন্যদিকে, প্রথমবারের মতো ২৫ হাজার টন অকটেন সরবরাহের জন্য পিজি জমা দিলেও চুক্তি করা নিয়ে তৈরি হয়েছে দোটানা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে একযোগে হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর ইরানও ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায়। এক পর্যায়ে হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করলে সারাবিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও। ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশে দাম বাড়বে এমন আশঙ্কায় দেশজুড়ে শুরু হয় জ্বালানি তেলের ‘প্যানিক বায়িং’। এতে সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিপিসিকে।

জ্বালানি সরবরাহে বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব

স্পট মার্কেট থেকে বিপিসি জ্বালানি কিনবে এমন খবরে দেশি-বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠান জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যে দুই লাখ টন ডিজেল সরবরাহের প্রথম প্রস্তাব পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ‘এঅ্যান্ডএ এনার্জি অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এলএলসি’ থেকে। প্রতিষ্ঠানটির লোকাল এজেন্ট হিসেবে রয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। সমসাময়িক ‘পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন’ নামে দুবাইভিত্তিক আরেকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এক লাখ টন ডিজেল ও ২৫ হাজার টন অকটেন সরবরাহের বিষয়ে প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান জিসিজি গ্লোবাল কমার্স গেটওয়ে লিমিটেড।

স্পট মার্কেট থেকে ডিজেল ও অকটেন কেনার জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৫ হাজার টন অকটেন সরবরাহের বিষয়ে একটি প্রতিষ্ঠান পিজি জমা দিয়েছে। তাছাড়া আরও একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের বিষয়টি চলমান।-বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মো. মোরশেদ হোসাইন আজাদ

প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে আলোচনার পর সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে তিন লাখ টন ডিজেল ও ২৫ হাজার টন অকটেন কেনার বিষয়ে অনুমতি চেয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায় বিপিসি। গত ১২ মার্চ সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বিশেষ সভা ‘এঅ্যান্ডএ এনার্জি অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এলএলসি’ এবং ‘পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন’র প্রস্তাবিত জ্বালানি কেনার বিষয়ে অনুমোদন দেয়।

ধারাবাহিকভাবে ২৬ মার্চ ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ‘এপি এনার্জি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড’ থেকে এক লাখ টন ডিজেল ও হংকংভিত্তিক ‘সুপারস্টার ইন্টারন্যাশনাল (গ্রুপ) লিমিটেড’ থেকে আরও দুই লাখ টন ডিজেল কেনার অনুমোদন দেয়।

একইভাবে ৩১ মার্চ সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ‘আবীর ট্রেড অ্যান্ড গ্লোবাল মার্কেটস’র কাছ থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) এবং এক্সন মোবিল কাজাখস্তান ইনকরপোরেটেড (ইএমকেআই) থেকে এক লাখ টন ডিজেল কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দেয় ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। পাশাপাশি নিয়মিত সরবরাহ চুক্তির বাইরে ইন্দোনেশিয়ান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পিটি ভূমি সিয়াক পুসাকো জাপিন (বিএসপি জাপিন) থেকে আরও ৬০ হাজার টন ডিজেল কেনারও অনুমোদন দেওয়া হয়।

অনুমোদনের পরেও যে কারণে জ্বালানি পাওয়া নিয়ে ‘ধোঁয়াশা’

বিপিসি সূত্রে জানা যায়, প্রথম দফায় ১২ মার্চ ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির অনুমোদনের পর ১৬ মার্চ এঅ্যান্ডএ এনার্জি অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এলএলসিকে দুই লাখ টন ডিজেল ও পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশনকে এক লাখ টন ডিজেল এবং ২৫ হাজার টন অকটেন সরবরাহের বিষয়ে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড দেয় বিপিসি। এরপর শুধু ‘পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন’র পক্ষে লোকাল প্রতিনিধি জিসিজি গ্লোবাল কমার্স গেটওয়ে লিমিটেড গত ৩০ মার্চ ২৫ হাজার টন অকটেন সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় পিজি জমা দিলেও ডিজেল সরবরাহের জন্য এ পর্যন্ত কেউ পিজি জমা দেয়নি।

আরও পড়ুন

জরুরিভিত্তিতে এক লাখ টন ডিজেল, দুই কার্গো এলএনজি কিনছে সরকার
দেশি পেট্রোল উৎপাদনেও লাগে বিদেশি অকটেন
৮ এপ্রিল শেষ হতে পারে ক্রুডের মজুত, বন্ধের হুমকিতে ইস্টার্ন রিফাইনারি

জানতে চাইলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘পিজির বিষয়টি বিপিসি বলতে পারবে। বিপিসি বিষয়টি হ্যান্ডেল করছে।’

সূত্র জানায়, জিসিসি গ্লোবাল কমার্স গেটওয়ে লিমিটেড স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে নিজেরাই পিজি হিসেবে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক বিজয়নগর শাখা থেকে ১৫ লাখ ৪৯ হাজার ৫০৫ ইউএস ডলার ও সমমান ১৯ কোটি ১০ লাখ টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি দেয়। পিজি জমা দিলেও বিপিসির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির এখনো চুক্তি হয়নি। চুক্তি না হওয়ায় এখনো ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছে না বিপিসি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, শুধু জিসিজি থেকে ২৫ হাজার টন অকটেনের পিজি পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এখনো চুক্তি করতে আসেনি। যে কারণে এলসি খোলা যাচ্ছে না। তবে আর কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে এখনো পিজি পাওয়া যায়নি। নিয়ম অনুযায়ী আগে পিজি পেতে হবে। তারপর চুক্তি হলেই পার্সেল আনার বিষয়ে এলসি খুলতে হয়।

পিজির অনিশ্চয়তা নিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিসির আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন সারা বিশ্বে এক ধরনের জরুরি অবস্থা চলছে। এখন আমাদের সংকট কাটানো হচ্ছে আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু যেসব সরবরাহকারী ডিজেল সরবরাহের জন্য প্রস্তাব দিয়েছে, তাদের বেশিরভাগ পিজি দিতে গড়িমসি করছে। পিপিআর (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস) অনুযায়ী বর্তমানে এ ধরনের ক্রয়ের ক্ষেত্রে আড়াই শতাংশ পিজি প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে পিজির জন্য সময়ক্ষেপণ হলে সংকট সমাধান আরও প্রকট হবে। সময় বিবেচনায় পিজি না নিয়ে হলেও কীভাবে জ্বালানি তেল আসা নিশ্চিত করা যাবে, সেই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’

এদিকে পিজি দিয়েও চুক্তি না হওয়া নিয়ে কথা হয় জিসিজি গ্লোবাল কমার্স গেটওয়ে লিমিটেডের চেয়ারম্যান ড. ইশতিয়াক আবিদুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘পিজি দিলেও এখনো কিছুই হচ্ছে না। তবে আমরা দেশের জন্য কাজ করছি। চেষ্টা করেছি।’

সরবরাহযোগ্য জ্বালানির উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই হরমুজ হবে না। এখন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আমরা যেখান থেকে দিতে চেয়েছি, সেগুলো তো বসে থাকছে না। আমি না এনেও ফাইন (জরিমানা) দিচ্ছি। চাইলে এখন অন্য জায়গা থেকে নেবে। আমাদের তো কিছু করার নেই।’

এপ্রিল মাসে আমদানির লক্ষ্য

এদিকে চলতি (এপ্রিল) মাসে তিন লাখ ২৩ হাজার টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিপিসি। নিয়মিত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে এসব জ্বালানি সরবরাহ নেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নিয়মিত সরবরাহকারীদের পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকে দ্রুততম সময়ে জ্বালানি তেল আনার কথা জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মো. মোরশেদ হোসাইন আজাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘মার্চ মাসে নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ২৫ হাজার টন ডিজেল পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। পাশাপাশি অন্য সাপ্লাইয়াররা ১০টি পার্সেল সরবরাহ দেওয়ার বিষয়ে কথা দিয়েছেন। এর মধ্যে সাতটি পার্সেল নিশ্চিত হয়েছে। গত শুক্রবার দুই পার্সেল চলেও এসেছে। জাহাজ দুটিতে ৬১ হাজার টনের বেশি ডিজেল রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘স্পট মার্কেট থেকে ডিজেল ও অকটেন কেনার জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৫ হাজার টন অকটেন সরবরাহের বিষয়ে একটি প্রতিষ্ঠান পিজি জমা দিয়েছে। তাছাড়া আরও একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের বিষয়টি চলমান।’

এমডিআইএইচ/এএসএ/এমএফএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।