১০ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বসন্তকালীন অধিবেশনে যোগ দিতে আগামী শুক্রবার (১০ এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটি অর্থমন্ত্রীর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর, যা দেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন সরকারের অর্থনৈতিক নীতির দিকনির্দেশনা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে তুলে ধরারও এটি একটি বড় সুযোগ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, প্রতি বছর বসন্তে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এবং উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি, প্রবৃদ্ধির ধারা এবং নীতিনির্ধারণী দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সফরের গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হচ্ছে আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির সর্বশেষ অবস্থা পর্যালোচনা। এ কর্মসূচির আওতায় এরই মধ্যে একাধিক কিস্তি ছাড় হয়েছে, তবে পরবর্তী কিস্তি পেতে হলে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ এবং আর্থিক খাতে সংস্কারসহ বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির চাপ বাংলাদেশের জন্য আইএমএফের সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে একইসঙ্গে ঋণের শর্ত বাস্তবায়ন অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জও তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি ভর্তুকি হ্রাস, বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা এবং কর কাঠামো সংস্কারের মতো পদক্ষেপগুলো সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে অর্থমন্ত্রী আইএমএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসতে পারেন। এসব বৈঠকে ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি দ্রুত ছাড়, শর্ত বাস্তবায়নে সময়সীমা শিথিলকরণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নীতিগত সহায়তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে বলে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সফর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। সফল আলোচনা হলে একদিকে যেমন বৈদেশিক সহায়তা প্রবাহ বাড়বে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থাও জোরদার হবে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনে চাপ তৈরি হওয়ার পর ২০২২ সাল থেকে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়। ২০২৩ সালের শুরুতে সংস্থাটির সঙ্গে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশ। পরে ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার করা হয়।
ঋণ কর্মসূচির অধীনে ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রথম কিস্তিতে ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার পায় বাংলাদেশ। একই বছরের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় কিস্তিতে আসে ৬৮ কোটি ২০ লাখ ডলার। ২০২৪ সালের জুনে তৃতীয় কিস্তির ১১৫ কোটি ডলার ছাড় করা হয়। পরবর্তীতে শর্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় চতুর্থ কিস্তি স্থগিত রাখা হয় এবং সময় বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুনে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি একসঙ্গে ১৩৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার ছাড় করা হয়।
এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে মোট ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। ঋণ কর্মসূচির অধীনে এখনও ১৮৬ কোটি ডলার পাওনা রয়েছে। মূল সময়সূচি অনুযায়ী ষষ্ঠ কিস্তি ছাড় হওয়ার কথা ছিল গত বছরের ডিসেম্বরে। তবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শেষ না হওয়ায় সেই অর্থ ছাড় স্থগিত রাখা হয়।
ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে গত মার্চে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল গত মার্চে বাংলাদেশ সফর করেছে। ওই সফরে ২৪ মার্চ অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন সাংবাদিকদের বলেন, যে কোনো অর্থায়ন সংক্রান্ত আলোচনা সব সময়ই নীতিগত (পলিসি) আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশ নতুন করে কোনো ঋণের অনুরোধ করেছে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি সরাসরি কিছু না বললেও ইঙ্গিত দেন, অর্থায়ন ও নীতিগত আলোচনা একসঙ্গেই এগিয়ে চলছে।
তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সব দেশই কমবেশি অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও এর ফলে সৃষ্ট অস্থিরতা অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আইএমএফ নিবিড়ভাবে কাজ করছে।
অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী বলেন, আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান ঋণ কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। এই কর্মসূচি কয়েক বছর ধরে চলছে এবং সামনে আরও রিভিউ হবে। আগামী জুলাইয়ে পরবর্তী রিভিউ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে।
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আপনারা কী বললেন—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, হ্যাঁ, ওটা চলছে। আলাপ আলোচনা চলছে। আইএমএফের যে রিকোয়ারমেন্ট এগুলো আমরা আলোচনা করেছি কতটুকু সম্ভব এবং যেখানে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেগুলো সম্ভব না এগুলোকে আমরা ক্রমান্বয়ে করতে হবে। একসঙ্গে সব করা যাবে না, কারণ অর্থনীতি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে উত্তরণ করতে হলে আমাদের মতো করে কিছু চিন্তা করতে হবে।
এমএএস/এমকেআর