বিয়ে নিয়ে মুশকিল আসান, ব্যয় সামলাবে ‘বিবাহ ঋণ’

ইয়াসির আরাফাত রিপন
ইয়াসির আরাফাত রিপন ইয়াসির আরাফাত রিপন
প্রকাশিত: ১১:১৩ এএম, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
বিবাহ ঋণসুবিধা দেয় দেশের বিভিন্ন ব্যাংক/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে (বিজিবি) সৈনিক পদে চাকরি করেন রাশেদুল ইসলাম। চাকরির বয়স তিন বছর পার হলেও বিয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ জমাতে পারেননি তিনি। এজন্য বারবার তার বিয়ের তারিখ পিছিয়ে যাচ্ছিল।

একপর্যায়ে পরিবারের পক্ষ থেকে পাত্রী দেখার কাজ এগিয়ে গেলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত এক সহকর্মী মুশকিল আসান হয়ে আসেন। জানান বিবাহ ঋণের বিষয়ে। পরে সীমান্ত ব্যাংক থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সারেন বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা।

বিয়ে করতে গিয়ে রাশেদুলের মতো অনেকেই অর্থ সংকুলান নিয়ে মুশকিলে পড়েন। এক্ষেত্রে মুশকিল আসান হতে পারে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া বিবাহ ঋণ সুবিধা। বিয়ের খরচের জন্য সাধারণত ২৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে প্রায় ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এই ঋণ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মাসিক কিস্তিতে পরিশোধ করতে হয়, যেখানে পরিশোধের সর্বোচ্চ সময়সীমা সাধারণত পাঁচ বছর। তবে কিস্তির সংখ্যা যত বেশি হবে, মোট সুদের পরিমাণও তত বাড়বে।

বাণিজ্যিক ব্যাংক বর্তমানে ‘বিবাহ লোন’ বা ব্যক্তিগত ঋণের একটি বিশেষ অংশ হিসেবে বিয়ের জন্য ঋণের সুবিধা দিচ্ছে। এটি মূলত ভোক্তা ঋণের অন্তর্ভুক্ত। তবে নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সব ব্যাংক এখনো এ খাতে সক্রিয় হয়নি।-বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান

বিয়ের খরচ সামাল দিতে দেশে দিন দিন বিবাহ ঋণের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এ খাতে ঋণ বিতরণের হার ও গ্রাহকের সংখ্যা দুটিই বাড়ছে ক্রমান্বয়ে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক প্রান্তিকগুলোতে ঋণের পরিমাণ ও হিসাবধারীর সংখ্যা দুটিতেই উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন দেখা গেছে।

বিজিবির সদস্য রাশেদুল জানান, ঋণ নিয়ে ছয় মাস আগে বিয়ে করেছেন। খরচ হয়েছে দুই লাখ টাকার মতো। বাকি টাকা দিয়ে গ্রামে বাবার জন্য দুটি গরু ও একটি মোটরসাইকেলও নিয়েছেন। মাসে মাসে কিস্তি পরিশোধ করতে হলেও সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি তাকে স্বস্তি দিচ্ছে।

বিবাহ ঋণবিবাহ ঋণের কিছু শর্ত

বিয়ের খরচ সামাল দেওয়া নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সানিবুল ইসলাম রায়হান। তিনি জানান, বিয়ের জন্য পাঁচ লাখ টাকার কিছু বেশি ঋণ নিয়েছিলেন। তবে বিয়েতে পাওয়া উপহারই খরচের বড় অংশ মিটিয়ে দিয়েছে। হাতে কিছু সঞ্চয়ও রয়েছে। এখন নির্ধারিত সময়ের আগেই ঋণ পরিশোধ করার কথা ভাবছেন তিনি।

কোন ব্যাংক কত ঋণ দেয়

বিয়ের জন্য তুলনামূলক বেশি ঋণ পাওয়া যায় ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংক থেকে। তারা ব্যক্তিগত ঋণের আওতায় এক লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত দেয়। চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং জমির মালিকরা এ সুবিধা নিতে পারেন। ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ১-৫ বছর। চাকরিজীবীদের মাসিক আয় কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা এবং অন্যদের ক্ষেত্রে অন্তত ৪০ হাজার টাকা হতে হবে।

আরও পড়ুন

ঋণ থাকলে ছেড়ে যেতে পারে সঙ্গী, বলছে গবেষণা
কম খরচের বিয়েই দীর্ঘস্থায়ী হয়: গবেষণা
কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ে করতে আয়কর রিটার্ন লাগবে
বিয়ের জন্য পুরুষের যেসব গুণাবলি থাকা জরুরি
মানুষ কেন বিয়ে করে?

উত্তরা ব্যাংক বিয়ের জন্য তুলনামূলক ছোট পরিসরের ঋণ দেয়। এখানে ২৫ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া যায়। এই ঋণ ১ থেকে ৩ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) ব্যক্তিগত ঋণের আওতায় ২ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিয়ের ঋণ দেয়। ২১ থেকে ৬৫ বছর বয়সী চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা পেতে পারেন।

ইউসিবিও বিয়ের জন্য ঋণ দেয়, যেখানে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। ঋণ পরিশোধের সময়সীমা সর্বোচ্চ ৫ বছর।

কাদের জন্য বিবাহ ঋণ প্রযোজ্য নয়

যাদের নিয়মিত ও পর্যাপ্ত আয় নেই, অস্থায়ী চাকরি বা অনিশ্চিত পেশায় যুক্ত, চাকরির অভিজ্ঞতা কম, বয়স নির্ধারিত সীমার বাইরে কিংবা ব্যাংকে লেনদেনের ইতিহাস দুর্বল তাদের বিবাহ ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

jagonews24ফাইল ছবি

এছাড়া মাসিক আয়ের তুলনায় ঋণের কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা না থাকলে ব্যাংক সাধারণত ঋণ অনুমোদন করে না। ঋণ খেলাপি, দুর্বল ক্রেডিট রেকর্ড বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে অসঙ্গতি থাকলেও আবেদন বাতিল হতে পারে।

কারা কাদের জন্য পাবেন ‘বিবাহ ঋণ’

বিবাহ ঋণের ক্ষেত্রে যোগ্য ব্যক্তি নিজের জন্য নিতে পারবেন। বয়স ও আয়ের স্ট্যাটাস অনুযায়ী ব্যক্তি তার সন্তান ও ভাই-বোনের জন্য এ ঋণ সুবিধা পাবেন। বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে ২১ থেকে ৬৫ বছর বয়সী চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীরা এই ঋণ পাবেন।

আবার বিজিবি সদস্যের ক্ষেত্রে বয়স হতে হবে ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। তবে কোনো বিজিবি সদস্য তার সন্তানের বিয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫৬ বছর পর্যন্ত এই ঋণ নিতে পারবেন। এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে হবে।

যেভাবে আবেদন করবেন

প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সঙ্গে অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের কপি লাগবে। সদ্য তোলা দুই কপি ছবি ও বেতন স্লিপ বা বেতনের সার্টিফিকেট (চাকরিজীবীদের জন্য)। আর চাকরিজীবী না হলে ঘর সাজানো লোনের জন্য ট্রেড লাইসেন্স (ব্যবসায়ীদের জন্য)। ব্যাংক স্টেটমেন্ট (গত ৬-১২ মাসের) প্রয়োজন হতে পারে। তবে ঘর সাজানো ও আসবাব কেনা বাবদ দেশের প্রায় সিংহভাগ ব্যাংকই ঋণ দেয়। এই ঋণ নিতে কিছু ক্ষেত্রে অনাপত্তি সনদ (এনওসি) প্রয়োজন হয়।

দেশে বাড়ছে বিবাহ ঋণের গ্রাহক

বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বিবাহ ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা আগের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের ৭৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকার তুলনায় ৪০ কোটি ৬২ লাখ টাকা বেশি। ২০২৪ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বিবাহ ঋণের পরিমাণ ছিল ৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকায়।

আরও পড়ুন

জামানতবিহীন ঋণ নিতে পারবেন এসএমই উদ্যোক্তারা
আবাসন মেলায় হোম লোনে আকর্ষণীয় অফার
বিয়ের যেসব ছবি ভুলেও ফেসবুকে দেবেন না

একই সময়ে বেড়েছে হিসাবধারীর সংখ্যাও। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) হিসাবধারী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৩৪ জনে, যা আগের প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৪ হাজার ৫১৯ জনের তুলনায় ৪১৫ জন বেশি। ২০২৪ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮৬২ জন। সে হিসাবে এক বছরে হিসাবধারী বেড়েছে ১ হাজার ৭২ জন।

মূলত ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার ভিত্তিতে বিবাহ ঋণ চালু হয়। ওই বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৬৯০, যা আগের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ছিল ৩ হাজার ৬৭৮। একই বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে বিবাহ ঋণের পরিমাণ ছিল ৫১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, যা ডিসেম্বর শেষে বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ কোটি ৯৮ লাখ টাকায়।

jagonews24ফাইল ছবি

ব্যাংকারদের মতে, বিবাহ ঋণ মূলত রিটেইল লোনের আওতায় পড়ে এবং বিভিন্ন ব্যাংক এটি ভিন্ন ভিন্নভাবে গ্রাহকদের কাছে তুলে ধরছে। কিছু ব্যাংক সরাসরি ‘ম্যারেজ লোন’ বা বিবাহ ঋণ দিলেও, অন্য অনেক ব্যাংক বাড়ি সাজানো, আসবাব কেনা, গহনা কেনাসহ নানা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ঋণ দিয়ে থাকে, যা গ্রাহকরা বিয়ের খরচ মেটাতেও ব্যবহার করতে পারেন।

ইউনাইটেড কমার্সিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) এক কর্মকর্তা জানান, অনেক গ্রাহক সরাসরি বিবাহ ঋণের পরিবর্তে ব্যক্তিগত ঋণ নিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সেই ঋণ দিয়েই তারা বিয়ের খরচ—যেমন কাবিন বা অন্য আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটান। তবে এ খাতে আগ্রহ একেবারে কম নয়। ধীরে ধীরে বাড়ছে ঋণের পরিমাণ ও হিসাবধারীর সংখ্যা।

আরও পড়ুন

বছরের পর বছর যায়, শেষ হয় না দেনমোহর আদায়ের লড়াই
ক্রেডিট কার্ডে ঋণসীমা দ্বিগুণ, নেওয়া যাবে ৪০ লাখ টাকা
ভারতীয়রা বিয়েতে এত বেশি খরচ করে কেন?
বিয়ের জন্য সোনার গহনা কিনছেন? যা জানা জরুরি
৫ শতাংশ এককালীন পরিশোধ ঋণে এক্সিট সুবিধা

সীমান্ত ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, তাদের ব্যাংকে বিশেষভাবে বিজিবি সদস্যদের জন্য বিয়ে ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। কর্মরত সদস্যরা ৫০ হাজার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। এমনকি সন্তানের বিয়ের ক্ষেত্রেও এই সুবিধা পাওয়া যায়।

বিবাহ ঋণসুবিধা সম্প্রসারণ চান অর্থনীতিবিদরা

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাণিজ্যিক ব্যাংক বর্তমানে ‘বিবাহ লোন’ বা ব্যক্তিগত ঋণের একটি বিশেষ অংশ হিসেবে বিয়ের জন্য ঋণের সুবিধা দিচ্ছে। এটি মূলত ভোক্তা ঋণের অন্তর্ভুক্ত। তবে নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সব ব্যাংক এখনো এ খাতে সক্রিয় হয়নি।’

তিনি জানান, বিবাহ ঋণ সাধারণত স্বল্পমেয়াদি হওয়ায় চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের জন্য এটি তুলনামূলক নিরাপদ এবং খেলাপির ঝুঁকিও কম।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, বিবাহ ঋণের মতো নতুন ও উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলো ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকের আস্থা আরও বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। যদি খেলাপি ঋণের ঝুঁকি কম থাকে, তাহলে অন্য ব্যাংকগুলোরও এ খাতে এগিয়ে আসা উচিত।

তবে অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি সতর্ক করে বলেন, ঋণ যেন নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা হয় সে বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে নজরদারি বাড়াতে হবে।

ইএআর/এমএমকে/এএসএ/ এমএফএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।