বছরের পর বছর যায়, শেষ হয় না দেনমোহর আদায়ের লড়াই

জাহাঙ্গীর আলম
জাহাঙ্গীর আলম জাহাঙ্গীর আলম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:৫২ পিএম, ১৫ জুলাই ২০২১

বিয়ে একজন নারী ও একজন পুরুষের মধ্যে সামাজিক চুক্তি। এ চুক্তি সম্পাদনের অন্যতম শর্ত দেনমোহর। দেনমোহর হলো কিছু অর্থ বা সম্পত্তি, যা বিয়ে বন্ধনে জড়ানোর প্রতিদানস্বরূপ স্বামীর কাছ থেকে পেয়ে থাকেন স্ত্রী। ইসলামী শরিয়ত স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ করা স্বামীর ওপর ফরজ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ পারিবারিক আইনেও স্ত্রীকে দেনমোহরের টাকা দেয়া স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক।

বিয়ের সময় অনেকেই দেনমোহরের টাকা বাকি রাখেন। বিয়ে বিচ্ছেদ কিংবা দুজন আলাদা হয়ে যাওয়ার পর অনেক স্বামীই দেনমোহরের টাকা দিতে চান না স্ত্রীকে। এ দেনমোহরের টাকার জন্য নিরূপায় হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন অসহায় নারী। টাকার জন্য স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। আদালতে ছোটাছুটি করতে করতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়েন তিনি। তবু প্রাপ্য সেই দেনমোহরের অপেক্ষা ফুরোয় না।

ঢাকায় কলহের মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম তিনটি পারিবারিক আদালতে পরিচালিত হয়। জাগো নিউজের অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে (২০১৬-২০২০ সাল) পারিবারিক আদালতে ৩৯ হাজার ৭২২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বিচার করার পর্যাপ্ত উপাদান না থাকায় পাঁচ হাজার ৩০টি মামলা খারিজ হয়েছে। এক হাজার ২৫২টি মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে ভরণ-পোষণ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৬৫ শতাংশ।

২০১৬ সালে পারিবারিক মামলা হয়েছে সাত হাজার ১০৩টি। এর মধ্যে খারিজ হয়েছে এক হাজার ২৪০টি এবং রায় হয়েছে ৩৩৫টি মামলার। পরের বছর ২০১৭ সালে পারিবারিক মামলা হয়েছে সাত হাজার ৩৩০টি। এর মধ্যে খারিজ হয়েছে ৯৮১টি এবং রায় হয়েছে ২৯৪টি মামলার। ২০১৮ সালে পারিবারিক মামলা হয়েছে সাত হাজার ৪৯২টি। এর মধ্যে খারিজ হয়েছে ৭৪১টি এবং রায় হয়েছে ১৯০টি। ২০১৯ সালে পারিবারিক মামলা হয়েছে নয় হাজার ৩৪৫টি। এর মধ্যে খারিজ হয়েছে এক হাজার ৩৯১টি এবং রায় হয়েছে ২৭৫টির। ২০২০ সালে পারিবারিক আইনে মামলা হয়েছে আট হাজার ৪৫২টি। এর মধ্যে খারিজ হয়েছে ৬৭৭টি এবং রায় হয়েছে ১৫৮টির। দেখা যাচ্ছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক কলহের মামলা বেড়েই চলছে।

আদালতের মাধ্যমে দেনমোহর বুঝে পাওয়ার আশায় মাহিয়া
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় মাহিয়া আফরোজের (ছদ্মনাম) পরিচয় হয় একই কলেজপড়ুয়া হারুন-আর রশীদের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। পরিচয় থেকে প্রেমের সম্পর্ক। এই প্রেমের সম্পর্ক থেকে ২০০৫ সালে এক লাখ এক টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয় দুজনের। মাহিয়ার ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে হলেও পরে পরিবার তা মেনে নেয়। কিন্তু বিয়ের কিছু দিন পর থেকে দুজনের মধ্যে শুরু হয় ঝগড়াঝাটি।

এর মধ্যে বিয়ের চার বছরের মাথায় তাদের ঘর আলো করে আসে এক পুত্রসন্তান। নাম রাখা হয় শাহজালাল জুয়েল (ছদ্মনাম)। পুত্র জন্মের পর মাহিয়া ভেবেছিলেন তাদের সংসারে শান্তি আসবে। কিন্তু ঘটল উল্টো, বাড়তে থাকে অশান্তি, যা শেষ করে দেয় সংসারকে। ২০১৬ সালে মাহিয়াকে তালাক দেন হারুন। কিন্তু তালাকের সময় মাহিয়ার প্রাপ্য দেনমোহর বুঝিয়ে দেননি তিনি। সেজন্য স্থানীয়ভাবে অনেক সালিশ-দরবারও হয়।

কোনো উপায় না পেয়ে পরের বছর ২০১৭ সালে মাহিয়া দেনমোহরের জন্য ঢাকার আদালতে একটি মামলা করেন। মামলায় বিবাদী করেন হারুনকে। ওই মামলায় প্রতি মাসে মাহিয়াকে হাজিরা দিতে আদালতে আসতে হয়। কয়েক বছর ঘুরে মামলাটি বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। দিনের পর দিন আদালতে আসছেন মাহিয়া। কিন্তু কবে রায় পাবেন, কবে প্রাপ্য দেনমোহর পাবেন, তা এখনো জানেন না। তবে হাল ছাড়েননি। মাহিয়ার আশা, একদিন আদালতের মাধ্যমে তিনি দেনমোহরের টাকা অবশ্যই বুঝে পাবেন।

আদালত প্রাঙ্গণে ডা. মাহিয়া আফরোজ জাগো নিউজকে বলেন, বিয়ের পর থেকে আমাদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকতো। একসময় হারুন আমাকে তালাক দেন। তিনি আমাকে দেনমোহরের কোনো টাকা দেননি। দেনমোহরের টাকার জন্য স্থানীয়ভাবে অনেক সালিশ-দরবার হয়। উপায় না পেয়ে আমি আদালতে মামলা করি। মামলা করার চার বছর পার হচ্ছে। কিন্তু আমি এখনো আমার দেনমোহরের টাকা বুঝে পাইনি। জানি না এ টাকা কবে পাবো। তবে আমি হাল ছাড়বো না। নিজের অধিকার আদালতের মাধ্যমে আদায় করেই ছাড়বো।

jagonews24বিয়ে একজন নারী ও একজন পুরুষের মধ্যে সামাজিক চুক্তি, এই চুক্তি সম্পাদনের অন্যতম শর্ত দেনমোহর

ডা. হারুন-অর রশীদ বলেন, দেনমোহরের টাকার জন্য মাহিয়া আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। আদালতের মাধ্যমেই এর সমাধান হবে। আদালত যেটা রায় দেবেন আমি সেটাই মেনে নেবো।

আদালতে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত নীলিমা
নীলিমা জাহান টুম্পা (ছদ্মনাম) রাজধানীর বংশাল এলাকার বাসিন্দা। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি দুই লাখ ২০ হাজার টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয় রাশেদ নবীর (ছদ্মনাম) সঙ্গে। রাশেদ একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। বিয়ের সময় রাশেদ দেনমোহরের ২০ হাজার টাকা উসুল করেন। মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে নীলিমার দিনমজুর বাবা রাশেদকে ৬০ হাজার টাকার আসবাবপত্র দেন। বিয়ের পর তারা কিছু দিন সুখে-শান্তিতে সংসার করেন। কিছুদিন গড়াতেই মাদকাসক্ত রাশেদ খারাপ আচরণ করতে থাকেন নীলিমার সঙ্গে। করতে থাকেন মানসিক নির্যাতন। এক পর্যায়ে নীলিমার ভরণ-পোষণও বন্ধ করে দেন।

এই কলহের ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের প্রথম দিকে নীলিমাকে এক কাপড়ে বাসা থেকে বের করে দেন রাশেদ। তখন নীলিমাকে রাশেদ বলেন, ‘আজ থেকে তোর বাপের বাড়িতে থাকবি এবং টাকার ব্যবস্থা করবি।’ নীলিমা নিরূপায় হয়ে গরিব বাবার বাড়ি অবস্থান করেন। তারপর রাশেদের সঙ্গে নীলিমার বাবা যোগাযোগের অনেক চেষ্টা করেও বিফল হন। নীলিমার ভরণ-পোষণের জন্য রাশেদকে নানাভাবে বলা হলেও তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন।

নিরূপায় হয়ে ২০১৮ সালের প্রথম দিকে ঢাকার আদালতে দেনমোহরের জন্য মামলা করেন নীলিমা। কিন্তু মামলার পর আদালতের পাঠানো সমনেরও জবাব দেননি রাশেদ। মামলাটি এখন ঢাকার পারিবারিক আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য রয়েছে।

jagonews24ঢাকা মহানগর আদালত

আদালত প্রাঙ্গণে নীলিমা জাহান জাগো নিউজকে বলেন, দেনমোহরের টাকার জন্য রাশেদের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। তিনি আদালতের পাঠানো সমনেরও জবাব দেননি। দেনমোহরের টাকা পাওয়া নারীর হক। ইসলামেও তা বলা আছে। আমি মামলা করে দিনের পর দিন আদালতের বারান্দায় ঘুরছি। ক্লান্তি এসে গেছে। জানি না কবে পাব আমার দেনমোহরের টাকা।

দেনমোহরের বিষয়ে আইনে যা রয়েছে
১৯৬১ সালের পারিবারিক আইনের ১০ ধারা মোতাবেক, ‘দেনমোহর পরিশোধ পদ্ধতি সম্পর্কে কাবিনে বিস্তারিত উল্লেখ না থাকলে স্ত্রীর তলবমাত্র সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করিতে হইবে। স্ত্রীকে তালাক দেয়ার ব্যাপারে স্বামীকে প্রতিশ্রুত যাবতীয় অর্থ প্রদান করিতে হইবে এবং প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ অনেক বেশি কিংবা স্বামীর পরিশোধ ক্ষমতার বাহিরে, এই যুক্তিই স্ত্রীর দাবির বিরুদ্ধে উপযুক্ত জবাব নহে। যদিও [বেইলী-২য়, ৬৭} অনুযায়ী শিয়া আইনে দেনমোহরের সর্বনিম্ন কোনো অর্থ নির্দিষ্ট নাই।

দেনমোহরের পরিমাণ যদি নির্দিষ্ট করা না হইয়া থাকে, স্ত্রী দেনমোহর নির্ণয়কালে স্ত্রীর পিতার পরিবারের অন্যান্য নারী সদস্যের ক্ষেত্রে যেমন তাহার পিতার ভগিনীর ক্ষেত্রে, দেনমোহরের পরিমাণ কত ছিল তাহা বিবেচনা করিতে হইবে। [হেদায়া,৪৫; বেঈলী-৯২]’

এ বিষয় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজীম আল ইসলাম বলেন, আইন অনুযায়ী দেনমোহর স্বামীকে অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। কারণ দেনমোহর সব সময়ই স্বামীর ঋণ। স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করে দেনমোহর আদায় করতে পারবেন। দেনমোহর দাবি করার পর স্বামী ওই দাবি পরিশোধ না করলে স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে পৃথক থাকতে পারবেন এবং ওই অবস্থায় স্বামী অবশ্যই তার ভরণ-পোষণ দিতে বাধ্য থাকবেন।

jagonews24বিচ্ছেদের পর অনেক নারীই দেনমোহর আদায়ের লড়াইয়ে নেমে ভোগান্তিতে পড়েন

তিনি আরও বলেন, বিয়েবিচ্ছেদ হলে বা স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রী তার দেনমোহর আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা করে তা আদায় করতে পারেন। তবে অবশ্যই তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর তিন বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে। স্বামীর মৃত্যু হলেও বকেয়া দেনমোহর একটি ঋণের মতো। এটি শোধ করতেই হয়। স্বামীর উত্তরাধিকারীরা এটি দিতে বাধ্য। অন্যথায় মৃত স্বামীর উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করে আদায় করা যায়। স্ত্রী আগে মারা গেলেও দেনমোহর মাফ হয় না। স্ত্রীর উত্তরাধিকারীরা এই দেনমোহরের হকদার। তারাও মামলা করার অধিকার রাখেন।

আইনজীবী মলয় কুমার সাহা জাগো নিউজকে বলেন, দেনমোহর পাওয়া স্ত্রীর অধিকার। বিয়ে বিচ্ছেদের পর অথবা আলাদা হওয়ার পর স্ত্রীকে স্বামী অনেক সময় দেনমোহরের টাকা দিতে চান না। এজন্য স্ত্রী আদালতে মামলা করেন। মামলা করে আইনের গ্যাঁড়াকলে পড়ে অনেক সময় তাকে বছরের পর বছর আদালতপাড়ায় ঘুরতে হয়। বিয়ে বিচ্ছেদ বা আলাদা হওয়ার সময় যদি স্বামী স্ত্রীর দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করে দেন, তাহলে আর স্ত্রীকে হয়রানির শিকার হতে হয় না। প্রত্যেক স্বামীর উচিত তাদের স্ত্রীর দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করে দেয়া। কারণ দেনমোহর পাওয়া আইনগতভাবে স্ত্রীর অধিকার।

আইনজীবী জি এম মিজানুর রহমান বলেন, দেনমোহর পাওয়া স্ত্রীর অধিকার। ইসলামে দেনমোহর পরিশোধ করে দেয়া ফরজ। কিন্তু আমাদের দেশে অনেকে স্ত্রীর দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করতে চান না। এতে স্ত্রীকে আদালতের আশ্রয় নিতে হয়। অনেক সময় বিবাদী মামলায় পক্ষ হন না। আবার অনেক সময় বিবাদীপক্ষ মামলার কার্যক্রম পেছানোর জন্য বারবার সময়ের আবেদন করেন। এতে মামলার বাদীকে হয়রানির শিকার হতে হয়। দেনমোহরের টাকার জন্য দিনের পর দিন আদালতপাড়ায় ঘুরতে হয়।

পড়ুন আগের পর্ব
ভরণ-পোষণের জন্য শিশুকে নিয়ে আদালতে ঘোরেন মা

ভরণ-পোষণ চেয়ে মামলা করে উল্টো ভোগান্তি

কলহের করাতে শিশুমনে রক্তক্ষরণ

জেএ/এইচএ/এএসএম

বিয়ের পর থেকে আমাদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকতো। একসময় হারুন আমাকে তালাক দেন। তিনি আমাকে দেনমোহরের কোনো টাকা দেননি। দেনমোহরের টাকার জন্য স্থানীয়ভাবে অনেক সালিশ-দরবার হয়। উপায় না পেয়ে আমি আদালতে মামলা করি। মামলা করার চার বছর পার হচ্ছে। কিন্তু আমি এখনো আমার দেনমোহরের টাকা বুঝে পাইনি। জানি না এ টাকা কবে পাবো

দেনমোহরের টাকার জন্য রাশেদের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। তিনি আদালতের পাঠানো সমনেরও জবাব দেননি। দেনমোহরের টাকা পাওয়া নারীর হক। ইসলামেও তা বলা আছে। আমি মামলা করে দিনের পর দিন আদালতের বারান্দায় ঘুরছি। ক্লান্তি এসে গেছে। জানি না কবে পাব আমার দেনমোহরের টাকা

আইন অনুযায়ী দেনমোহর স্বামীকে অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। কারণ দেনমোহর সব সময়ই স্বামীর ঋণ। স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করে দেনমোহর আদায় করতে পারবেন। দেনমোহর দাবি করার পর স্বামী ওই দাবি পরিশোধ না করলে স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে পৃথক থাকতে পারবেন এবং ওই অবস্থায় স্বামী অবশ্যই তার ভরণ-পোষণ দিতে বাধ্য থাকবেন

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]