২০২৭ সালেই বিদ্যুৎ মিলবে রূপসাকেন্দ্রে, প্রতি ইউনিটে খরচ ৫ টাকা
ইরানে হামলা-পাল্টা হামলার জেরে বিশ্বের বিদ্যুৎ সংকটের আঁচ বাংলাদেশেও লেগেছে। ফলে অসমাপ্ত বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়েছে। ঠিক এ সময়ে খুলনার খালিশপুরের ‘রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র’ প্রকল্প নিয়ে আশাবাদী বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিষ্ঠান নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি (নওপাজেকো)।
২০১৮ সালে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস লিমিটেডের ৫০ একর পরিত্যক্ত জমিতে ‘রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পটির নির্মাণ কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৯৪ শতাংশ। বর্তমানে চলছে কমিশনিংয়ের কাজ। সব ঠিক থাকলে ২০২৭ সালেই এই কেন্দ্র থেকে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ মিলবে।
আরও পড়ুন
দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৩৬টি, উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সরছে না লালন শাহ সেতু
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় কমছে, বাড়ছে সুদ
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির (নওপাজেকো) অধীনে প্রকল্পটি ২০২২ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গ্যাসের অভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদন পিছিয়েছে ২০২৭ সাল পর্যন্ত। ৮ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পে ২১ শতাংশ ব্যয় সাশ্রয় হয়েছে।
রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দেওয়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ ২৫ বছরে পরিশোধ করতে হবে। উৎপাদন পিছিয়ে যাওয়ায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত গ্যাস না পাওয়া গেলে আংশিকভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু রাখা যাবে। সেক্ষেত্রে ১৮০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করতে প্রতিদিন প্রয়োজন হবে ১২৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হলে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট থেকে সর্বোচ্চ ৮৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়বে মাত্র ৫ থেকে সাড়ে ৫ টাকা।
নওপাজেকো জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে জ্বালানি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ও হাই-স্পিড ডিজেল (এইচএসডি) ব্যবহার করা যাবে।
আরও পড়ুন
এবার নিলামে উঠছে এস আলমের স্টিল ও তেল মিল, বিদ্যুৎকেন্দ্র
সিদ্ধিরগঞ্জ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নতুন ট্যারিফ অনুমোদন
বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ৬ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা অর্থায়ন করেছে। অবশিষ্ট অর্থ জোগান দেয় সরকার।
নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির (নওপাজেকো) নির্বাহী পরিচালক (পিঅ্যান্ডডি) মো. সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। বর্তমানে কমিশনিংয়ের কাজ চলমান। আমরা আশা করছি, ২০২৭ সালে এখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে পারবো। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে মাত্র ৫ থেকে সাড়ে ৫ টাকা খরচ হবে। তবে ডিজেল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ বেশি হবে।’
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, প্রকল্প গ্রহণের সময় ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে রূপসায় গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না করে ২০১৯ সালে বেসরকারি খাতে গড়ে ওঠা প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকার।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখার সিদ্ধান্তের ফলে এডিবির ৫০০ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা) ঋণ এখন দেশবাসীর জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে সুদসহ কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ শুরু হওয়ায় চাপে পড়েছে নওপাজেকো।

অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি)।
পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্পের কিছু কাজ এখন বাকি আছে। সে কারণে ‘রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র’ প্রকল্পটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সমাপ্ত প্রকল্পের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন
জ্বালানি-সংকটে চট্টগ্রামে বন্ধ ১০ বিদ্যুৎকেন্দ্র, নগরজুড়ে ভোগান্তি
বিবিয়ানা বিদ্যুৎকেন্দ্র মেরামত করবে সরকার, ব্যয় ৯০২ কোটি টাকা
বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) ১৬তম সভায় জানানো হয়, নানাবিধ কারণে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করার পাশাপাশি ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) সংশোধনের সুপারিশ করা হয়। তবে এখনো চূড়ান্তভাবে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়নি।
তবে রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে এ ব্যাপারে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প শক্তি বিভাগের প্রধান মো. কামাল আতাহার হোসেন, বিদ্যুৎ উইংয়ের যুগ্ম প্রধান মোল্লা মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান, উপ-প্রধান মোহাম্মদ রফিকুল আলম কেউ কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।
এমওএস/এসএনআর/এমএমএআর