রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় কমছে, বাড়ছে সুদ
মফিজুল সাদিক মফিজুল সাদিক , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৪৪ পিএম, ০৩ মে ২০২৬
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরু হয়েছে ২৯ এপ্রিল। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ। জাতীয় গ্রিডে এখান থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস। এর আগেই প্রকল্পে কিছু কাটছাঁট হচ্ছে। সার্বিকভাবে ব্যয় কমেছে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি। পাশাপাশি বাড়ছে সুদ।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ ইভাকুয়েশনের (নিরাপদে গ্রিডে স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া) জন্য সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প সংশোধন করা হচ্ছে। এখন একনেকে পাস হওয়ার অপেক্ষা।
ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার জন্য নেওয়া এ প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণে সুদ বাড়ছে ৮২৬ কোটি টাকা। কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। আবার কমানো হয়েছে কিছু ক্ষেত্রে। তবে সব মিলিয়ে প্রকল্পে সামগ্রিক ব্যয় কমছে দুই হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের অবকাঠামোগত অগ্রগতি ৯৮ দশমিক ৮০ শতাংশ।
দফায় দফায় বেড়েছে মেয়াদ
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মূল প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে। ডিসেম্বর ২০২২ নাগাদ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। তবে নানা কারণে ধাপে ধাপে বেড়েছে প্রকল্পের সময় ও ব্যয়। প্রথমে ডিসেম্বর ২০২৩, পরে ডিসেম্বর ২০২৪, ডিসেম্বর ২০২৫ এবং সবশেষ জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
ডলারের দাম বাড়ার কারণে বৈদেশিক ঋণে সুদ পরিশোধে ৮২৬ কোটি টাকা বাড়ছে। তবে সামগ্রিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় কমছে ২ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের কাজ ৯৮ শতাংশের ওপর শেষ। ব্যয় সমন্বয় করার জন্যই মূলত প্রকল্পটি সংশোধন করা হবে।-প্রকল্প পরিচালক মো. মাসুদুল ইসলাম
সব মিলিয়ে পাঁচ বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ৮ বছরের বেশি সময় লাগছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ১০ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভারতীয় ঋণ ৮ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। নতুন করে প্রকল্পের ব্যয় কমে ৮ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা হচ্ছে। ফলে প্রকল্পের ব্যয় কমছে ২ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র/সংগৃহীত
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিএলসি) প্রধান প্রকৌশলী (বাড়তি দায়িত্ব) ও প্রকল্পের পরিচালক মো. মাসুদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডলারের দাম বাড়ার কারণে বৈদেশিক ঋণে সুদ পরিশোধে ৮২৬ কোটি টাকা বাড়ছে। তবে সামগ্রিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় কমছে ২ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের কাজ ৯৮ শতাংশের ওপরে শেষ। ব্যয় সমন্বয় করার জন্যই মূলত প্রকল্পটি সংশোধন করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রকল্পটি এখন পরিকল্পনা কমিশনে আছে। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভাও হয়েছে। সামনে একনেক সভায় এটা সংশোধনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।’
আপনারা রূপপুরের বিদ্যুৎ ঘরে ঘরে পৌঁছাতে প্রস্তুত কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে মো. মাসুদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এগিয়ে রয়েছি। যে কোনো মুহূর্তে রূপপুরের বিদ্যুৎ ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে প্রস্তুত।’
কোন খাতে ব্যয় কমলো, কোন খাতে বাড়লো
প্রকল্প সমন্বয় করতে কোন কোন খাতে ব্যয় বাড়লো, কোন কোন খাতে কমলো জানতে চাইলে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিএলসি) সূত্র জানায়, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম খাতে ১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা, বৈদেশিক ঋণের ওপর সুদ খাতে ৮২৬ কোটি এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা ব্যয় অঙ্গে ৬১ কোটি টাকাসহ কতিপয় খাতে মোট ২ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে।
আরও পড়ুন
রূপপুরে দেওয়া হলো ইউরেনিয়াম, অপেক্ষা পারমাণবিক বিদ্যুতের
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি লোডিং ঘিরে সাজ সাজ রব
জ্বালানি লোডিং লাইসেন্স পেলো রূপপুর, ডিসেম্বরে বিদ্যুৎ সরবরাহ
রূপপুরে অস্বাভাবিক ব্যয়: শাস্তি পেলেন দুই উপ-সহকারী প্রকৌশলী
ব্যয় কমেছে কর খাতে ২১৩ কোটি টাকা, পরামর্শক অঙ্গে বৈদ্যুতিক স্থাপনা অংশে ১৯৭৫ কোটি টাকা, সিডি-ভ্যাট খাতে ১৩৮৫ কোটি টাকা, প্রাইস কন্টিনজেন্সি খাতে ১৬৮ কোটি এবং ফিজিক্যাল কন্টিনজেন্সি খাতে ১৬৮ কোটি টাকাসহ কতিপয় খাতে মোট পাঁচ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। তবে যোগ-বিয়োগ করলে সামগ্রিকভাবে প্রকল্প ব্যয় কমছে ২ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা।
বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তন
প্রকল্পটি সংশোধনের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তন অন্যতম কারণ। অনুমোদিত প্রকল্পে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ছিল ১ মার্কিন ডলার সমান ৮০ টাকা ৮৩ পয়সা। এর আগে ব্যয়ের ক্ষেত্রে এপ্রিল ২০১৮ থেকে নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজের চুক্তির আওতায় পরিশোধিত অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিনিময় হার দাঁড়ায় ১ মার্কিন ডলার সমান ৯৭ টাকা ৬৫ পয়সা। প্রস্তাবিত প্রথম সংশোধিত প্রকল্পটি ভবিষ্যতে ব্যয় করা খরচের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ১ মার্কিন ডলার সমান ১২২ টাকা ৩০ পয়সা ধরে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই ব্যয় মেটানোর জন্য প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণের সুদ মেটাতে ব্যয় বাড়ছে।
কার্যপরিধির পরিবর্তন
প্রকল্পের রিভার ক্রসিং লাইন নির্মাণ (২০ কিলোমিটার) প্যাকেজ-৬ এর টেন্ডারে সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দর প্রকল্পের নির্দিষ্ট দরের চেয়ে বেশি। ফলে এটা এলওসি থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব পাওয়ার গ্রিডের বোর্ড সভায় অনুমোদন করা হয়। পরবর্তীসময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাক্চার ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের অর্থায়নে আলাদা প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বিদ্যমান গ্রিড সিস্টেমের মানোন্নয়ন কাজের টেন্ডার ডকুমেন্ট প্রণয়নে খাত চূড়ান্তকরণ এবং ধামরাই মূল উপকেন্দ্রের জমি অধিগ্রহণ ও নির্মাণে বিলম্বের কারণে বৈদেশিক সহায়তাকারী সংস্থা এক্সিম ব্যাংক অব ইন্ডয়া থেকে প্রকল্পের প্যাকেজ-৮ ও প্যাকেজ-৭ এর আওতাধীন ধামরাই উপকেন্দ্রের বে-সম্প্রসারণ কাজ বাদ দেওয়া হয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
এছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশক্রমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ডিজাইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ৪০০ কেভি রূপপুর-গোপালগঞ্জ ও রূপপুর-বগুড়া ডাবল সার্কিট লাইনের পরিবর্তে সিঙ্গেল সার্কিট লাইন এবং ৪০০ কেভি রূপপুর-ধামরাই লাইনের পরিবর্তে ২৩০ কেভি রূপপুর-ধামরাই লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। সার্বিকভাবে প্রকল্পের বর্ণিত খাত পরিবর্তনের ফলে প্রকল্পের প্রথম সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাস্তবায়ন এলাকা
প্রকল্পটি ১৩ জেলায় বাস্তবায়িত হবে। জেলাগুলো হলো- ঢাকা, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, কুষ্টিয়া ও মাগুরা।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঞ্চালন নিশ্চিত করা এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংযুক্তি ও নিরাপদ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার গুণগত মানোন্নয়ন সংক্রান্ত সমীক্ষা পরিচালনা করা।
প্রকল্পের মূল কার্যক্রম
রূপপুর-ঢাকা (আমিনবাজার-কালিয়াকৈর) ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণ, যার দৈর্ঘ্য ১৫০ কিলোমিটার। আমিনবাজার-কালিয়াকৈর ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণ, দৈর্ঘ্য ৫০ দশমিক ৮১ কিলোমিটার। রূপপুর-গোপালগঞ্জ ৪০০ কেভি সিঙ্গেল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণ, দৈর্ঘ্য ১৫৫ দশমিক ৯৯ কিলোমিটার।
রূপপুর-বগুড়া ৪০০ কেভি সিঙ্গেল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণ, দৈর্ঘ্য ৬৯ দশমিক ৯২ কিলোমিটার; রূপপুর-ধামরাই ২৩০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণ, দৈর্ঘ্য ১৫৭ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার; রূপপুর-বাঘাবাড়ি ২৩০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণ, দৈর্ঘ্য ৬৫ দশমিক ৩১ কিলোমিটার। এছাড়া বিদ্যমান আমিনবাজার, কালিয়াকৈর ও গোপালগঞ্জ গ্রিড উপকেন্দ্রে ৪০০ কেভি বে-সম্প্রসারণ এবং বিদ্যমান বাঘাবাড়ী উপকেন্দ্রে দুটি ২৩০ কেভি বে-সম্প্রসারণ।
এমওএস/এএসএ