কানাডা থেকে স্বাধীনতা চায় তেলসমৃদ্ধ আলবার্টা প্রদেশ, পেছনের কারণ কী?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:২৮ পিএম, ০৭ মে ২০২৬
সোমবার (৪ মে) আলবার্টায় সমাবেশ করেন বিচ্ছিন্নতাবাদী সমর্থকরা/ ছবি: এএফপি

কানাডার তেলসমৃদ্ধ পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ আলবার্টায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। সম্প্রতি সেখানকার স্বাধীনতাপন্থিরা ঘোষণা দিয়েছে, তারা দেশটির বাকি অংশ থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে গণভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাক্ষরের চেয়েও বেশি স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছেন।

বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রায় ৩ লাখ স্বাক্ষর নির্বাচন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছেন। অথচ গণভোট বিবেচনায় নেওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার স্বাক্ষর।

স্বাধীনতাপন্থি নেতা মিচ সিলভেস্ট্রে বলেন, আলবার্টা একটি ঐতিহাসিক সময় পার করছে। এটি পরবর্তী ধাপের প্রথম পদক্ষেপ। আমরা তৃতীয় রাউন্ড পেরিয়ে গেছি, এখন আমরা স্ট্যানলি কাপ ফাইনালে। এখানে তিনি বিখ্যাত আইস হকি চ্যাম্পিয়নশিপ টুর্নামেন্টের উদাহরণ টানেন।

তবে গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে ফল এলেও এরপর দীর্ঘ ও অনিশ্চিত একটি প্রক্রিয়া শুরু হবে। এর মধ্যে আইনি চ্যালেঞ্জ, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও সাংবিধানিক জটিলতা থাকতে পারে। তারপরও সম্ভাব্য এই গণভোট কানাডায় ফেডারেল ক্ষমতা নিয়ে আলবার্টার দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ বলেছেন, পর্যাপ্ত স্বাক্ষর পাওয়া গেলে তিনি গণভোট আয়োজনের দিকে এগোবেন। যদিও তিনি ব্যক্তিগতভাবে কানাডা থেকে আলবার্টার স্বাধীনতার পক্ষে নন।

গণভোটে ভোটারদের কী প্রশ্ন করা হবে?

যদি এই প্রস্তাব ব্যালটে যায়, তাহলে ভোটারদের জিজ্ঞেস করা হবে: আপনি কি একমত যে আলবার্টা প্রদেশ কানাডার অংশ থাকা বন্ধ করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া উচিত?

স্বাক্ষর জমা মানেই কি গণভোট নিশ্চিত?

না। প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর জমা পড়লেই গণভোট নিশ্চিত হয়ে যায় না। আলবার্টার নির্বাচন কর্তৃপক্ষ ‘ইলেকশনস আলবার্টা’কে এখনো আবেদনকারীদের নাম যাচাই করতে হবে। তবে আদালতের এক রায়ের কারণে সেই প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রয়েছে।

এদিকে, আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোও আইনি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। তাদের দাবি, আলবার্টা আলাদা হয়ে গেলে তা তাদের চুক্তিভিত্তিক অধিকার লঙ্ঘন করবে। এছাড়া ভোটারদের মধ্যে এই গণভোট আদৌ পর্যাপ্ত সমর্থন পাবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৩০ শতাংশ বাসিন্দা আলবার্টার স্বাধীনতাকে সমর্থন করেন।

আলবার্টায় বিচ্ছিন্নতাবাদের পেছনের কারণ কী?

আলবার্টায় স্বাধীনতার প্রশ্ন এতটা সামনে আগে কখনো না এলেও, প্রদেশটিতে বহু দশক ধরেই স্বাধীনতাপন্থি মনোভাব রয়েছে। প্রায় ৫০ লাখ মানুষের এই প্রদেশের অনেক বাসিন্দা মনে করেন, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা কানাডার বাকি অংশের চেয়ে আলাদা।

তেলসমৃদ্ধ এই পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ দীর্ঘদিন ধরেই রাজধানী অটোয়ার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে। তাদের অভিযোগ, জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের মাধ্যমে বড় অবদান রাখলেও কেন্দ্রীয় সরকার তাদের যথাযথ গুরুত্ব দেয় না।

পরিবেশগত বিধিনিষেধ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার উদ্যোগও এখন বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের অভিযোগ, আলবার্টার প্রধান শিল্পকে এমন আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে, যাদের প্রদেশটির বাস্তবতা সম্পর্কে খুব কম ধারণা আছে।

স্বাধীনতাপন্থি নেতা সিলভেস্ট্রে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, আমরা কানাডার অন্য অংশের মতো নই। আমরা শতভাগ রক্ষণশীল। অথচ আমাদের শাসন করছে এমন লিবারেলরা, যারা আমাদের মতো চিন্তা করে না। তারা আমাদের শিল্প বন্ধ করে দিতে চাইছে।

কানাডার অন্য কোনো প্রদেশও কি আলাদা হতে চেয়েছে?

আলবার্টাই একমাত্র অঞ্চল নয়, যার সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক জটিল। ফরাসিভাষী প্রদেশ কুইবেকে বহু দশক ধরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন রয়েছে। তাদের দাবি, কুইবেকের স্বতন্ত্র ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে স্বীকৃতি দিতে হবে ও এজন্য কানাডা থেকে আলাদা হওয়া প্রয়োজন।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে এই আন্দোলনের জনপ্রিয়তা কমেছে। মার্চ মাসের এক জরিপে দেখা গেছে, ১৯৯৫ সালের গণভোটে অল্প ব্যবধানে স্বাধীনতা প্রত্যাখ্যানের পর এবার সমর্থন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

তবে বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনৈতিক দল ‘পার্টি কুইবেকোয়া’ চলতি বছরের শেষদিকে অনুষ্ঠিতব্য প্রাদেশিক নির্বাচনের আগে ভালো অবস্থানে রয়েছে।

স্বাধীনতার দাবির সমালোচনাও হচ্ছে

অন্যান্য স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের মতোই আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদ নিয়েও তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। প্রদেশের সাবেক উপ-প্রিমিয়ার ও কানাডার ফেডারেল ব্যবস্থার সমর্থক থমাস লুকাজুক এএফপিকে বলেন, এটি এমন কিছুর প্রতিনিধিত্ব করে, যা অধিকাংশ আলবার্টাবাসী ও কানাডিয়ান সমর্থন করে না। এটি এক ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহিতা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু মন্তব্যও বিতর্ক তৈরি করেছে। ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যে পরিণত হওয়া উচিত। এতে অনেক কানাডিয়ান ক্ষুব্ধ হন।

জানুয়ারিতে আলবার্টার স্বাধীনতার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, আলবার্টা যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হতে পারে। প্রদেশটি প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। কিন্তু তাদেরকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি, তাদের যুক্তরাষ্ট্রের দিকে আসতে দেওয়া উচিত। আলবার্টা আমাদের জন্য স্বাভাবিক অংশীদার। তাদের দারুণ সম্পদ রয়েছে। আলবার্টার মানুষ খুবই স্বাধীনচেতা।

থমাস লুকাজুক বলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা নির্বাচিত প্রতিনিধি নন। তারা শুধু কানাডার নাগরিক, যারা আলবার্টায় বাস করেন। কিন্তু তারা প্রতিনিধি দল গঠন করে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সাক্ষাৎ পাচ্ছেন। এটি তাদের জন্য অবশ্যই উৎসাহব্যঞ্জক।

আন্দোলন কি থেমে যাবে?

স্বাধীনতাপন্থি ঐতিহাসিক ও গবেষক মাইকেল ওয়াগনার মনে করেন, গণভোট সফল হোক বা না হোক, এই ঘটনা আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করবে।

তিনি এএফপিকে বলেন, আমি মনে করি এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্থায়ী পরিবর্তন আনবে। এই আন্দোলন হঠাৎ করেই হারিয়ে যাবে না।

এখন কী হতে পারে?

আগামী অক্টোবরেই পুরো প্রদেশজুড়ে ভোট হতে পারে। ১৯ অক্টোবর সাংবিধানিক প্রশ্ন, অভিবাসনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বড় ধরনের গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে বিচারক শাইনা লিওনার্ড ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার আবেদন যাচাই প্রক্রিয়ায় এক মাসের স্থগিতাদেশ দেন। কয়েকটি ফার্স্ট নেশনস বা আদিবাসী গোষ্ঠীর আইনি চ্যালেঞ্জের পর তিনি এই আদেশ দেন।

আদিবাসী গোষ্ঠীদের দাবি, আলবার্টা আলাদা হয়ে গেলে তাদের ঐতিহাসিক চুক্তির অধিকার লঙ্ঘিত হবে। তবে আদালতের এই আদেশ স্বাক্ষর সংগ্রহে বাধা দেয়নি। আলবার্টার ফার্স্ট নেশনস গোষ্ঠীগুলোর আইনি চ্যালেঞ্জ নিয়ে চলতি সপ্তাহের শেষদিকে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। যদি আদালত আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে রায় দেয়, তাহলে পুরো গণভোট প্রক্রিয়াই অর্থহীন হয়ে যেতে পারে।

সূত্র: আল-জাজিরা

এসএএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।