পাবজি-সিওডি খেলতেও দিতে হবে কর

সাইফুল হক মিঠু
সাইফুল হক মিঠু সাইফুল হক মিঠু
প্রকাশিত: ১২:২৯ পিএম, ১৪ মে ২০২৬
অনলাইন গেমসে কর বসানোর কথা ভাবছে সরকার/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

দেশের বহু মানুষের অবসরের সঙ্গী অনলাইন মোবাইল গেমস। লাইভ স্ট্রিমিং করে মোবাইলের এসব গেমস কেন্দ্র করে আয়ও করছেন অনেকে। অনলাইনে জনপ্রিয় সব গেমস খেলতে গেলেও দিতে হবে কর।

বাংলাদেশে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় পাবজি মোবাইল, কল অব ডিউটি (সিওডি), ইএ স্পোর্টস সকার (ফুটবল) প্রভৃতি গেমসে কর বসানোর কথা ভাবছে সরকার।

আগামী অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। উচ্চাভিলাষী এ লক্ষ্য পূরণে দেশের দ্রুত বর্ধনশীল অনলাইন গেমিং খাতকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এ উদ্যোগের মাধ্যমে ডিজিটাল অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আনা, অনলাইন লেনদেনের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি ও অনিয়ন্ত্রিত বিদেশি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্থপাচার রোধ করতে চায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ বলছে, বর্তমানে দেশের ৭০ শতাংশ বা দুই–তৃতীয়াংশের বেশি পরিবার অন্তত একটি স্মার্টফোন ব্যবহার করে। বিভিন্ন সুবিধার কারণে দেশে স্মার্টফোনের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। শহর-গ্রাম নির্বিশেষে খানা (পরিবার) পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার এখন ৫০ দশমিক ৪ শতাংশ।

অনলাইন গেমসের ওপর কর বসিয়ে কত টাকার রাজস্ব পাওয়া যাবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমরা একটা ডিজিটাল সমাজ তৈরি করার চেষ্টা করছি। সেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারে মাধ্যমে সরকার বিভিন্ন খাত থেকে রাজস্ব আদায় করছে। কন্টেন্ট থেকে কর আদায়ের প্রচেষ্টা সঠিক হবে না।-বেসিসের সাবেক সভাপতি ও প্রযুক্তিবিদ সৈয়দ আলমাস কবীর

এনবিআর সূত্র জানায়, কিশোর-তরুণদের বড় অংশ মোবাইল গেমস খেলে নিয়মিত। বর্তমানে বাংলাদেশের অনলাইন গেমিং বাজারের আকার দুই হাজার কোটি টাকার বেশি।

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টার তথ্য অনুযায়ী, এ খাতের বড় অংশের লেনদেন এখনো কর ব্যবস্থার বাইরে।

বাংলাদেশ ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইলেকট্রনিক স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের (বিওয়াইডিইএসএ) সভাপতি ড. ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মুনিরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটা অবশ্যই ইতিবাচক হবে। দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে। আরও আগেই এ খাতকে করের আওতায় আনা উচিত ছিল।’

পাবজিপাবজি গেমস/এআই দিয়ে বানানো

‘অনলাইন গেমসের ওপর কর বসিয়ে কত টাকার রাজস্ব পাওয়া যাবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমরা একটা ডিজিটাল সমাজ তৈরি করার চেষ্টা করছি। সেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারে মাধ্যমে সরকার বিভিন্ন খাত থেকে রাজস্ব আদায় করছে। কন্টেন্ট থেকে কর আদায়ের প্রচেষ্টা সঠিক হবে না।’ বলছিলেন বেসিসের সাবেক সভাপতি ও প্রযুক্তিবিদ সৈয়দ আলমাস কবীর।

তিনি বলেন, এখানে কর বসালে হয়তো গ্রাহক ভিপিএন বা অন্যভাবে খেলবে। সরকারে উচিত প্যাসিভ রেভিনিউয়ের দিকে মনোযোগ দেওয়া।

আরও পড়ুন

‘ফ্রি ফায়ার-পাবজি আমাদের প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে’
প্রযুক্তির যুগে পাবজি-ফ্রি ফায়ার, অভিভাবকদের করণীয়
‘পাবজি’ নিষিদ্ধের দাবিতে হাইকোর্টে আবেদন
পাবজি-ফ্রি ফায়ারে ডুবে ছিল ৭ কিশোর, আটক করলো পুলিশ


এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মে ইন-অ্যাপ পারচেজ, সাবস্ক্রিপশন ফি, ভার্চুয়াল গেমিং কারেন্সি ও ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও সম্পূরক শুল্ক আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

বর্তমানে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি ব্যবহারকারী আন্তর্জাতিক গেমিং প্ল্যাটফর্মে স্কিন, চরিত্র, ভার্চুয়াল কয়েন ও প্রিমিয়াম ফিচার কিনতে অর্থ ব্যয় করছেন। এসব লেনদেনের বেশিরভাগই করের আওতার বাইরে থাকছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, এসব লেনদেনকে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আনতে পারলে একদিকে যেমন রাজস্ব আদায় বাড়বে, অন্যদিকে সীমান্তপারের ডিজিটাল পেমেন্টের ওপর নজরদারিও শক্তিশালী হবে।

এ ধরনের লেনদেনে অন্তত ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হলে বছরে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব হতে পারে বলেও জানান তিনি।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরাও সরকারকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। ফলে নীতিনির্ধারকরা এখন ডিজিটাল অর্থনীতিকে নতুন রাজস্ব উৎস হিসেবে দেখছেন।

সরকারকে আগে পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করতে হবে কোন গেম দক্ষতাভিত্তিক এবং কোনটি জুয়া বা বেটিং কার্যক্রমের আওতায় পড়ে। আইনি সংজ্ঞা স্পষ্ট না থাকলে কর আরোপ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে।-অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন

এনবিআর সূত্র জানায়, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ব্যাংক কার্ড ও অ্যাপ স্টোরের মাধ্যমে হওয়া পেমেন্টে স্বয়ংক্রিয় ভ্যাট কর্তনের ব্যবস্থাও চালুর আলোচনা চলছে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলে গেমিং প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি উপস্থাপনাও করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এনবিআর কর্মকর্তারা। তিনি এ প্রস্তাবের প্রতি ইতিবাচক সমর্থন জানিয়েছেন বলেও জানা যায়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনলাইন গেমসে কর

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে অনলাইন গেমিং ও ডিজিটাল সেবার ওপর কর আরোপ করেছে। ভারত অনলাইন গেমিংয়ে ২৮ শতাংশ জিএসটি চালু করেছে, যা সরকারের রাজস্ব বাড়ালেও গেমিং কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়িয়েছে।

পাকিস্তান ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স ও ভ্যাট আরোপ করেছে। ইন্দোনেশিয়া ডিজিটাল পণ্যে ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপের পাশাপাশি বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করেছে।

সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে কী আছে

সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২০ অনুযায়ী অনলাইন জুয়া খেলা, জুয়া সংক্রান্ত অ্যাপ বা পোর্টাল তৈরি ও প্রচারণা চালানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আবার ২০২১ সালে আদালতের আদেশে পাবজি, ফ্রি ফায়ারের মতো ইন্টারনেট গেমসের লিংক বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক কমিশন (বিটিআরসি)। তবে বুধবার (১৩ মে) বিটিআরসির এক কর্মকর্তা জানান, ২০২৩ সালে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পাবজি খুলে দেওয়া হয়। ফ্রি ফায়ার বন্ধ রয়েছে।

সিওডি গেমস
সিওডি গেমস/এআই দিয়ে তৈরি

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ফ্রি ফায়ার বন্ধ রয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশের আলোকে ২০২১ সালের ২৪ আগস্ট পাবজি, ফ্রি ফায়ারসহ ক্ষতিকর অনলাইন গেম বন্ধের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন। পরবর্তীসময়ে ২০২৫ সালের ১১ মার্চ হাইকোর্ট অর্ডার দেয় পাবজি খুলে দেওয়ার জন্য, সে অনুযায়ী তা খুলে দেওয়া হয়।’

সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন, স্পষ্ট আইনি কাঠামো ছাড়া এ ধরনের কর ব্যবস্থা বাস্তবায়ন জটিল হয়ে উঠতে পারে। সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, জুয়া বা নিষিদ্ধ গেমস থেকে সরকার কর আদায় করতে পারে না আইনত। সেক্ষেত্রে সরকারকে পৃথকীকরণ করতে হবে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারকে আগে পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করতে হবে কোন গেম দক্ষতাভিত্তিক এবং কোনটি জুয়া বা বেটিং কার্যক্রমের আওতায় পড়ে। আইনি সংজ্ঞা স্পষ্ট না থাকলে কর আরোপ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের ডিজিটাল ডাটা মনিটরিং ব্যবস্থা এখনো ততটা শক্তিশালী নয়। ফলে টেনসেন্ট বা ই এ স্পোর্টস, ইউনিটির মতো বিদেশি গেমিং প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কার্যকরভাবে কর আদায় করাও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। জুয়া বা নিষিদ্ধ গেমস এতে সম্পৃক্ত হবে না।

গেমস নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অফিস বাংলাদেশে নেই বিধায় কর আদায় পদ্ধতি কী হবে সেটা নিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। কর আদায়ের ব্যবস্থাটি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ দেখবে বলে জানান বাংলাদেশ ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইলেকট্রনিক স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের (বিওয়াইডিইএসএ) সভাপতি ড. ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মুনিরুল ইসলাম।

মেটা, গুগল বাংলাদেশে লোকাল এজেন্টদের মাধ্যমে কর দেয়। একই পদ্ধতিতে গেমস নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কর আদায় করার পরামর্শ দেন সৈয়দ আলমাস কবীর।

তিনি বলেন, ‘সময় লাগলে এসব প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে লোকাল অফিস প্রতিষ্ঠায় বাধ্য করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে ভালো সেবাও পাওয়া যাবে। রাতারাতি কিছু হবে না। অনলাইন গেমস থেকে কোটি কোটি টাকা কর আদায় সহজ হবে না।’

এসএম/এএসএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।