চীনের বিভিন্ন শহরে হবে ৩০টি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ আউটলেট
- আন্তর্জাতিক ক্রেতা হারানোর ভয়ে চীনে পণ্য প্রদর্শনে অনীহা
- গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট বিরূপ প্রভাব ফেলছে ব্যবসা-বাণিজ্যে
- বাংলাদেশ ভালো পোশাক তৈরি করলেও নেই নিজস্ব ব্র্যান্ড
- চীন বাংলাদেশকে ১০০টির বেশি পণ্যে ডিউটি ফ্রি সুবিধা দিয়েছে
বিশ্বের সবাই জানে বাংলাদেশ ভালো পোশাক তৈরি করে। কিন্তু এতদিনেও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামে আমরা কোনো ব্র্যান্ড দাঁড় করাতে পারিনি, যা দেশের পোশাকশিল্প খাতের বড় ব্যর্থতা। এছাড়া চীনের বাজারে পণ্য রপ্তানিতে দেশের উদ্যোক্তাদের অনীহা রয়েছে। চীনে বাজার হারানোর ভয়ে বিদেশি ক্রেতারাও চান না আমরা সেখানে সরাসরি পোশাক পণ্য রপ্তানি করি।
দেশের পোশাক মালিকরাও আন্তর্জাতিক ক্রেতা হারানোর শঙ্কায় থাকেন। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট বিরূপ প্রভাব ফেলছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে। চীনসহ বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না। পাশাপাশি দেশে পাল্টে গেছে চাঁদাবাজির ধরনও। সরাসরি চাঁদা দাবি না করে ট্রেড লাইসেন্স খুলে বলা হয় আমিও ব্যবসায়ী, আমাকে ব্যবসা দিন।
তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করছেন নারী শ্রমিকরা/ফাইল ছবি
জাগো নিউজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি ও বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পরিচালক মোহা. খোরশেদ আলম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এমদাদুল হক তুহিন।
জাগো নিউজ: চীন ও বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবসায়িক সম্পর্ককে আপনি কীভাবে দেখছেন?
খোরশেদ আলম: বাংলাদেশ ও চীনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক অনেক পুরোনো। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি। গত বছর বাংলাদেশ চীন থেকে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে আমরা রপ্তানি করেছি মাত্র ৬৯০ থেকে ৭০০ মিলিয়ন ডলারের মতো। এটা অত্যন্ত বড় একটা গ্যাপ। এই পরিস্থিতির কারণ হলো চীনের পণ্যের দাম কম, মান ভালো ও তাদের প্রযুক্তি উন্নত। মেশিনারি, বস্ত্র, ইলেকট্রনিকস—সব ক্ষেত্রেই তারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই তারা এ কারণে বাজার তৈরি করেছে।
আরও পড়ুন
গত ৩ বছরে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ: বিজিএমইএ
টেক্সটাইল খাত নিয়ে ১৮ জুন শুরু হচ্ছে ‘ইনটেক্স বাংলাদেশ’ প্রদর্শনী
কমছে পোশাক রপ্তানি, ঝুঁকিতে কর্মসংস্থান
পোশাক খাতের উৎপাদন খরচ ২০% বেড়েছে: বিকেএমইএ সভাপতি
পোশাক খাতে বেড়েছে নতুন বিনিয়োগ, রপ্তানি কমেছে প্রধান বাজারে
‘দেশের পোশাক খাত এক বছর ধরে আইসিইউতে’
জাগো নিউজ: বাংলাদেশ কেন চীনের বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না?
খোরশেদ আলম: চীন বাংলাদেশকে ১০০টির বেশি পণ্যে ডিউটি ফ্রি (শুল্কমুক্ত) সুবিধা দিয়েছে। তারা বাংলাদেশি পণ্য নিতে আগ্রহী। কিন্তু আমাদের উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কম। আমরা গার্মেন্টসের কথা বলি। কিন্তু আমাদের নিজেদের কোনো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড নেই। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামে আমরা কোনো ব্র্যান্ড দাঁড় করাতে পারিনি। বিদেশি বায়াররা (ক্রেতা) বাংলাদেশে পোশাক তৈরি করিয়ে নিজেদের ব্র্যান্ডে চীনের বাজারে বিক্রি করছে। লাভটা তারাই নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্বে পরিচিত। সবাই জানে বাংলাদেশ ভালো পোশাক তৈরি করে। কিন্তু আমাদের নিজস্ব ব্র্যান্ড নেই—এটাই বড় ব্যর্থতা।
কিছু মানুষ শুধু চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ট্রেড লাইসেন্স করে নিজেদের ব্যবসায়ী পরিচয় দিচ্ছে। ২০০ টাকা দিয়ে একটা ট্রেড লাইসেন্স করে বলছে আমি ব্যবসায়ী, আমাকে ব্যবসা দেন। আমাকে কন্টাক্ট করেন, আমাকে এই ব্যবসা দিতে হবে। এ ধরনের কাজকর্ম চলছে। সরকার যদি এগুলো সত্যিকার অর্থে কন্ট্রোল করতে না পারে, আমার মনে হয় এই দেশের শিল্প টেকা কষ্ট হবে
জাগো নিউজ: চীনের বাজারে প্রবেশের জন্য কি নতুন কোনো উদ্যোগ আছে?
খোরশেদ আলম: আগামী ১১ থেকে ১৬ জুন চীনের কুনমিংয়ে একটি বড় এক্সিবিশন (প্রদর্শনী) হবে। চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে ফ্রি স্টল দেওয়া হচ্ছে। তারা বলেছে, বাংলাদেশের পণ্য বিমানবন্দর থেকে তারা নিজেদের খরচে ওয়্যারহাউজে নিয়ে যাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশ থেকে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ খুব কম। আমি ২০টি স্টল চেয়েছিলাম, তারা দিয়েছে। কিন্তু অংশগ্রহণ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে মাত্র নয়জন। আমার মনে হয়, অনেক উদ্যোক্তা ভয় পান—যদি সরাসরি চীনে বিক্রি করতে যান, তাহলে বর্তমান বিদেশি বায়াররা হয়তো তাদের কাছ থেকে পণ্য নেওয়া বন্ধ করে দেবে।
জাগো নিউজ: কোন শক্তি চীনকে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রেখেছে বলে মনে করেন?
খোরশেদ আলম: চীন এমন একটা দেশ, যেখানে সুই থেকে শুরু করে ফাইটার বিমান পর্যন্ত তৈরি হয়। তাদের সব ধরনের পণ্য নিজস্বভাবে উৎপাদন করার সক্ষমতা আছে। তাদের মূল শক্তি হলো—কম দামে ভালো মানের পণ্য। এ কারণেই তারা সারা বিশ্বের বাজার দখল করেছে। বাংলাদেশ যদি কোনো পণ্য কম দামে ও ভালো মানে দিতে পারে, তাহলে অবশ্যই বাজার পাবে।
জাগো নিউজ: নতুন সরকার আসার পর চীনের নতুন বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা দেখছেন?
খোরশেদ আলম: চীন অবশ্যই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চায়। বিশেষ করে টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন শিল্পে তাদের আগ্রহ আছে। তবে তারা সবচেয়ে আগে জানতে চায়—গ্যাস ও বিদ্যুতের নিশ্চয়তা আছে কি না। আমার কাছে অভিযোগ এসেছে, এক চীনা বিনিয়োগকারী শিল্পের জন্য প্লট নিয়ে ছয় বছর ধরে বসে আছেন, কিন্তু গ্যাস পাননি। তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারী কেন আসবে? চীনের প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ছিল টেক্সটাইল খাতে। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তার কারণে সেটা এখন স্থগিত।
ছবি: জেমিনি দিয়ে তৈরি
জাগো নিউজ: আর কোনো বাধা আছে?
খোরশেদ আলম: আরেকটা বড় সমস্যা হলো দক্ষ জনবল। চীনের আধুনিক প্রযুক্তির মেশিন চালানোর মতো পর্যাপ্ত টেকনিশিয়ান, কারিগর বা দক্ষ ম্যানেজার বাংলাদেশে এখনো কম। তাই তারা দুটি বিষয় দেখছে—এক. জ্বালানির নিশ্চয়তা দুই. দক্ষ জনবল।
জাগো নিউজ: বর্তমান ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
খোরশেদ আলম: ব্যবসায় লাভ-লোকসান থাকবেই। কিন্তু মানুষ খুব আতঙ্কের ভেতরে আছে। প্রতিটি ব্যবসায়ী আতঙ্কে আছে যে তার কখন কী হবে। যে হারে চাঁদাবাজির স্টাইল চেঞ্জ হয়েছে এখন। কয়েকজন চীনা ব্যবসায়ীও আমাদের কাছে অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন মহল থেকে চাপ আসছে, আমরা এখানে ইন্ডাস্ট্রি রাখতে পারবো কি না সন্দেহ।
জাগো নিউজ: অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এ ধরনের অভিযোগ বেশি শোনা যেত। নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পরও কী একই অবস্থা?
খোরশেদ আলম: আমার কাছে যত তথ্য আছে, তাতে মনে হয়-চাঁদাবাজি আরও বেড়েছে। বেড়েছে এবং এটা নাকি কন্ট্রোল করা যাচ্ছে না। পুলিশকে কমপ্লেন (অভিযোগ) করেও কোনো কাজ হচ্ছে না। একই দলের ভেতরে কয়েকটি গ্রুপ তৈরি হয়ে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত হচ্ছে। এমনকি কিছু মানুষ শুধু চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ট্রেড লাইসেন্স করে নিজেদের ব্যবসায়ী পরিচয় দিচ্ছে। ২০০ টাকা দিয়ে একটা ট্রেড লাইসেন্স করে বলছে আমি ব্যবসায়ী, আমাকে ব্যবসা দেন। আমাকে কন্ট্রাক্ট করেন, আমাকে এই ব্যবসা দিতে হবে। এ ধরনের কাজকর্ম চলছে। আমি মনে করি যে কোনো শিল্পের জন্য সামনে একটা বড় ধরনের হুমকি আসছে। সরকার যদি এগুলো সত্যিকার অর্থে কন্ট্রোল করতে না পারে, আমার মনে হয় এই দেশের শিল্প টেকা কষ্ট হবে।
আরেকটা বড় সমস্যা হলো দক্ষ জনবল। চীনের আধুনিক প্রযুক্তির মেশিন চালানোর মতো পর্যাপ্ত টেকনিশিয়ান, কারিগর বা দক্ষ ম্যানেজার বাংলাদেশে এখনো কম। তাই তারা দুটি বিষয় দেখছে—এক. জ্বালানির নিশ্চয়তা; দুই. দক্ষ জনবল
জাগো নিউজ: বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
খোরশেদ আলম: আমরা কয়েকটি বড় পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। প্রথমত, বাংলাদেশে একটি চীনা কমার্শিয়াল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে চীনা বিনিয়োগ আনার চেষ্টা। তৃতীয়ত, চীনের বিভিন্ন শহরে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামে ৩০টি আউটলেট চালু করা। সেখানে পোশাক, কৃষিপণ্য, সিরামিক, ওষুধ, দুগ্ধজাত পণ্য—সব ধরনের বাংলাদেশি পণ্য থাকবে।
আরও পড়ুন
চীনকে টপকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয়
টেক্সটাইল খাতে চীনা বিনিয়োগ-প্রযুক্তি চায় বিজিএমইএ
বাংলাদেশ-চীন কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারে অঙ্গীকার
তৈরি পোশাক রপ্তানি দ্রুত ও সহজতর করার আশ্বাস কাস্টমসের
জাগো নিউজ: এই ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ আউটলেট বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব?
খোরশেদ আলম: এটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তবে বাধা আছে। কিছু আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী চান না বাংলাদেশ সরাসরি চীনের বাজারে প্রবেশ করুক। কারণ তাহলে তাদের লাভ কমে যাবে। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ যদি সরাসরি চীনের বাজারে যেতে পারে, তাহলে বড় সুযোগ তৈরি হবে।
পোশাক তৈরিতে শ্রমিকদের ব্যস্ততা/ফাইল ছবি
জাগো নিউজ: দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়ে কি কোনো উদ্যোগ আছে?
খোরশেদ আলম: আমি চীন সরকারের কাছে বাংলাদেশে ২০টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছি। চীন প্রযুক্তিগত শিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা শেখায়। মাছ চাষ, গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরি, আধুনিক প্রযুক্তি—এসব ক্ষেত্রে তারা আমাদের তরুণদের প্রশিক্ষণ দিতে পারে।
জাগো নিউজ: চীনের বাজার নিয়ে আপনার বার্তা কী?
খোরশেদ আলম: আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—আমরা নিজেরাই বিশ্বাস করি না যে আমরা পারবো। চীন দরজা খুলে বলছে, ‘আসুন’। কিন্তু আমরা সেই সুযোগ নিতে ভয় পাচ্ছি। আমি মনে করি, এখনই সময় ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে বিশ্ববাজারে শক্তভাবে তুলে ধরার।
ইএইচটি/এমএমকে/এমএফএ