চোরাই মসলায় সয়লাব বাজার, দাম নাগালে
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে চোরাই পথে আসা মসলায় সয়লাব চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ বাজার। ভোগপণ্যে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ এ পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সীমান্ত দিয়ে অবাধে মসলা ঢুকছে বাংলাদেশে। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছেন বৈধ পথে আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা। সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব।
খাতুনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, চোরাই পথে আসা মসলা কম দামে বিক্রির সুযোগ তৈরি হওয়ায় আমদানি করা মসলা বাজার হারাচ্ছে। তবে ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, চাহিদার চেয়ে জোগান বেশি থাকায় বাজারে মসলার দাম কমছে। চোরাই পথে মসলা আগেও বাংলাদেশের বাজারে আসতো।
মাংসসহ বিভিন্ন রান্নার উপকরণ উপাদেয় করতে মরিচ, হলুদ, ধনিয়ার মতো সাধারণ মসলার পাশাপাশি ব্যবহৃত চিকন জিরা, লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি, গোলমরিচসহ নানান মসলাকে গরম মসলা হিসেবে ধরা হয়। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় কোরবানিতে গরম মসলার চাহিদা থাকে বেশি।
খাতুনগঞ্জের ইলিয়াছ মার্কেট ও জাফর মার্কেট ঘিরে মসলার পাইকারি বাজার। কথা হলে মসলা ব্যবসায়ীরা জানান, দেশে মোট চাহিদার গরম মসলার ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। চিকন জিরা, লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি, গোলমরিচ- এ পাঁচ ধরনের গরম মসলা বেশি ব্যবহৃত হয়।
বিভিন্ন ধরনের মসলা
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিমাণে কম হলেও সাধারণভাবে ব্যবহৃত মসলার মধ্যে এলাচের দাম সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি এলাচ আমদানি হয় গুয়েতেমালা থেকে। স্থলবন্দরগুলো দিয়ে ভারত থেকেও ব্যবহৃত এলাচের একটি অংশ বাংলাদেশে আসে।
দেশের সীমান্তগুলো দিয়ে প্রতিদিন অবৈধভাবে মসলা দেশে ঢুকছে। বিশেষ করে সিলেট, কুমিল্লা, ফেনী এলাকার সীমান্ত দিয়ে জিরা, এলাচ, কিশমিশ, কাজুসহ সব ধরনের মসলা ঢুকছে। এতে খাতুনগঞ্জে মসলা বেচাকেনা বন্ধ হয়ে গেছে। জিরা কেজিতে ২২০-২৫০ টাকা শুল্ক, এলাচে কেজিপ্রতি ৫৫০-৬০০ টাকা শুল্ক হারাচ্ছে সরকার। বৈধ আমদানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।-আমদানিকারক ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাক
বাংলাদেশে চায়না ও ভিয়েতনাম থেকে দারুচিনি আমদানি হয়। আগের বছরগুলোতে ইন্দোনেশিয়া ও মাদাগাস্কার থেকে আমদানি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকেও কিছু লবঙ্গ আমদানি হচ্ছে।
ভিয়েতনাম থেকে গোলমরিচ আমদানি হয়। তবে চলতি বছর ভারত থেকে বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে অল্প গোলমরিচ এসেছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হওয়া গরম মসলার মধ্যে চিকন জিরার বেশিরভাগ আমদানি হচ্ছে ভারত থেকে। পাশাপাশি আফগানিস্তান, চায়না থেকেও সামান্য পরিমাণে চিকন জিরা আমদানি হয়।
আরও পড়ুন
গরম মসলার দামে শীতল হাওয়া
ইউরোপ-আমেরিকায় বন্ধের পথে বাংলাদেশের মসলা রপ্তানি
মসলা কেনার সময় যেভাবে সতর্ক থাকবেন
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ভারত থেকে চোরাই পথে সীমান্ত দিয়ে জিরা, এলাচ, লবঙ্গ, কিশমিশ, কাজুবাদামসহ বিভিন্ন ধরনের মসলাজাতীয় পণ্য বাংলাদেশে আসছে। নানান কৌশলে এসব পণ্য নিয়ে আসছে চোরাকারবারিরা। অভিযোগ রয়েছে, খাতুনগঞ্জ ও ঢাকার মৌলভীবাজারের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত।
আমদানিকারক ব্যবসায়ী মেসার্স গুলিস্তান ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী আবদুর রাজ্জাক জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশের সীমান্তগুলো দিয়ে প্রতিদিন অবৈধভাবে মসলা দেশে ঢুকছে। বিশেষ করে সিলেট, কুমিল্লা, ফেনী এলাকার সীমান্ত দিয়ে জিরা, এলাচ, কিশমিশ, কাজুসহ সব ধরনের মসলা ঢুকছে। এতে খাতুনগঞ্জে মসলা বেচাকেনা বন্ধ হয়ে গেছে। জিরা কেজিতে ২২০-২৫০ টাকা শুল্ক, এলাচে কেজিপ্রতি ৫৫০-৬০০ টাকা শুল্ক হারাচ্ছে সরকার। বৈধ আমদানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’

খাতুনগঞ্জের গরম মসলা ব্যবসায়ী মো. বাদশা জাগো নিউজকে বলেন, ‘সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে জিরা, এলাচ ঢুকছে। বিশেষ করে ডিউটি দিয়ে আমদানি করা জিরা কস্টিং হচ্ছে কেজি ৫৩০ টাকা, সেই জিরা কিছু সিন্ডিকেট বিক্রি করছে কেজি ৫শ টাকা। আবার এলাচ ডিউটি দিয়ে এলে (আমদানি হলে) প্রতি কেজি কস্টিং হচ্ছে ৪১০০-৪২০০ টাকা। যারা চোরাই পথে আনছে, তারা ওই এলাচ বিক্রি করছে কেজি ৪০০০-৪০৫০ টাকায়। প্রতি কেজি ২শ টাকা কমে বিক্রি করছে অনেকে। এতে বৈধ আমদানিকারকরা মার খাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘গত এক মাস আগের তুলনায় সব ধরনের মসলার দাম কমেছে। প্রতি কেজি জিরা এক মাস আগে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৫২০-৫৩০ টাকা। একমাস আগে এলএমজি এলাচ ছিল ৩৯০০ টাকা, মঙ্গলবার বিক্রি হয়েছে ৩৭০০ টাকা। আগে লবঙ্গ ছিল ১৩০০ টাকা। এখন বিক্রি হচ্ছে ১২৬০ টাকা। একইভাবে ৪৪০ টাকার দারুচিনি বিক্রি হচ্ছে ৪২০ টাকায়।’
আমাদের দেশের চেয়ে বাজারদর কম থাকলে সীমান্ত দিয়ে সব সময় মসলাজাতীয় পণ্য চোরাই পথে বাংলাদেশে আসে। এবার খাতুনগঞ্জসহ পাইকারি বাজারে চাহিদার চেয়ে জোগান বেশি হওয়ায় মসলার দাম কমেছে। তবে চোরাই পথে পণ্য আসা বন্ধ করতে হবে। বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাজস্ব ফাঁকি রোধেও প্রশাসনকে পদক্ষেপ নিতে হবে।-ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন
খাতুনগঞ্জের ইলিয়াছ-বশর মার্কেট মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাজল পালিত বলেন, ‘সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে মসলা আসার কারণে আমদানিকারকরা লোকসানের শিকার হচ্ছেন। খাতুনগঞ্জের বাজারে মসলা আমদানিকারক ২৫ থেকে ৩০ জন। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে মসলাজাতীয় পণ্য আমদানি হয়েছে। কিন্তু বাজারে চোরাই পথে আসা মসলায় সয়লাব হয়ে গেছে। এতে অবৈধ সিন্ডিকেটের কাছে বৈধ ব্যবসা এখন হুমকিতে।’
খাতুনগঞ্জের মসলা ব্যবসায়ী মেসার্স হাজি ইসহাক সওদাগরের স্বত্বাধিকারী মো. সেকান্দার জাগো নিউজকে বলেন, ‘সব সময় চোরাই পথে দেশে মসলা আসতো। তবে আমাদের দেশের চেয়ে সীমান্তের ওপারে মসলার দাম কিছুটা কম। এখন ডিউটি ফাঁকি দিয়ে মসলা দেশে আসছে। আমদানিকারকরা ডিউটি দিয়ে মসলা আনছে, কিন্তু সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে আসা মসলার ডিউটি দিতে হচ্ছে না। যে কারণে এসব মসলা কম দামে বিক্রি করে অনেকে লাভবান হচ্ছে। এতে বৈধ আমদানিকারকদের কিছু ক্ষতি হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘জিরা ভারতে উৎপাদন হয়। কিন্তু এলাচ, গোলমরিচ, পেস্তা বাদাম তারা আমদানি করে। দাম ভালো পাওয়ায় তারা এসব পণ্য বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে।’
রাষ্ট্রীয় ভোগ্যপণ্য বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাজারগুলোতে পাইকারিতে বর্তমানে জিরা বিক্রি হচ্ছে ৫৬০ থেকে ৬৮০ টাকায়। এক মাস আগেও এসব জিরা বিক্রি হয়েছিল ৫৭০ থেকে ৫৮০ টাকায়।
বাজারে পাইকারিতে দারুচিনি বিক্রি হচ্ছে ৩৭০-৪০০ টাকা কেজিতে। গত মাসে এসব দারুচিনি বিক্রি হয়েছিল ৩৭০-৪৫০ টাকা। একইভাবে লবঙ্গ বিক্রি হচ্ছে ১২০০-১৩২০ টাকায়। গত মাসে এসব দারুচিনি বিক্রি হয়েছিল ১২৭০-১২৮০ টাকায়।
একইভাবে বাজারে পাইকারিতে এবার এলাচ বিক্রি হচ্ছে ৪০০০-৪৮০০ টাকায়। এক মাস আগেও দর একই ছিল। পাইকারিতে গোলমরিচ বিক্রি হচ্ছে ১০২০-১০৬০ টাকায়। গত মাসে এসব গোলমরিচ বিক্রি হয়েছিল ১০৭০-১১৫০ টাকায়।
কথা হলে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের দেশের চেয়ে বাজারদর কম থাকলে সীমান্ত দিয়ে সব সময় মসলাজাতীয় পণ্য চোরাই পথে বাংলাদেশে আসে। এবার খাতুনগঞ্জসহ পাইকারি বাজারে চাহিদার চেয়ে জোগান বেশি হওয়ায় মসলার দাম কমেছে। তবে চোরাই পথে পণ্য আসা বন্ধ করতে হবে। বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাজস্ব ফাঁকি রোধেও প্রশাসনকে পদক্ষেপ নিতে হবে।’
এমডিআইএইচ/এএসএ/এমএফএ