বিনিয়োগ বাড়াতে প্রথমে ব্যবসার খরচ কমাতে হবে

ইব্রাহীম হুসাইন অভি
ইব্রাহীম হুসাইন অভি ইব্রাহীম হুসাইন অভি
প্রকাশিত: ০৮:০২ এএম, ১৯ মে ২০২৬

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরাতে আগামী বাজেটে কার্যকর নীতির মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্যবসার খরচ কমানো ও জ্বালানির মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা জরুরি। একই সঙ্গে সুদের হারও এক অঙ্কে নামিয়ে আনার পদক্ষেপ থাকতে হবে। কারণ বর্তমানে খেলাপিঋণের চাপের কারণে ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে ঋণ দিচ্ছে, যা ব্যবসার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমাচ্ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আসন্ন বাজেট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এ মন্তব্য করেন।

তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কী কী করা উচিত সে বিষয়ে কথা বলেন জাগো নিউজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি ইব্রাহীম হুসাইন অভি

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এবারের বাজেটে কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

সাধারণভাবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বলতে আমরা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেই বুঝি। এখানে মূল তিনটি সূচক গুরুত্বপূর্ণ—বিনিময় হার, সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি। এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি।

কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায়, মূল্যস্ফীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বিনিময় হার কিছুটা কৃত্রিমভাবে স্থির রাখা হয়েছে। সুদের হারও তুলনামূলক অনেক বেশি। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য এখনো তৈরি হয়নি।

বর্তমানে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি অনেক নিচে নেমে এসেছে। এই পরিস্থিতি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য ইতিবাচক নয়। তাই সরকারের উচিত অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া

পাশাপাশি উচ্চ সুদের হার ও সরকারের সম্ভাব্য ঋণনির্ভর বাজেট বাস্তবায়নও বড় উদ্বেগের বিষয়। আগামী অর্থবছরে সরকার যে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়েছে, তা বাস্তবায়নে রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে সরকার যদি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। এটিকে ‘ক্রাউডিং আউট’ বলা হয়।

বর্তমানে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি অনেক নিচে নেমে এসেছে। এই পরিস্থিতি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য ইতিবাচক নয়। তাই সরকারের উচিত অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া। এজন্য কর ফাঁকি রোধ, করজাল সম্প্রসারণ ও সম্পদকর বা উত্তরাধিকার করের মতো ন্যায্য কর ব্যবস্থা নিয়ে ভাবা যেতে পারে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে কোন ধরনের নীতি প্রয়োজন বলে মনে করেন?

আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সরকার মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। বিশেষ করে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্যে পড়বে।

বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য প্রথমেই ব্যবসার খরচ কমাতে হবে। জ্বালানির মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা জরুরি, কারণ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। একইভাবে সুদের হারও এক অঙ্কের মধ্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে

এ অবস্থায় সরকারের প্রধান কাজ হওয়া উচিত অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। টিসিবির মাধ্যমে চাল, গম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে, যাতে নিম্ন আয় ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ কিছুটা স্বস্তি পায়। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে সার ও জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।

বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন ও বেসরকারি খাত সক্রিয় করতে কোন ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন?

বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য প্রথমেই ব্যবসার খরচ কমাতে হবে। জ্বালানির মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা জরুরি, কারণ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। একইভাবে সুদের হারও এক অঙ্কের মধ্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। বর্তমানে খেলাপিঋণের চাপের কারণে ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে ঋণ দিচ্ছে, যা ব্যবসার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।

আরও পড়ুন

বাস্তবসম্মত বাজেট না হলে অর্থনীতি আরও চাপে পড়বে: দেবপ্রিয়
রাজস্ব আদায়ের যে জায়গাগুলো বাইরে ছিল সেগুলো আওতার মধ্যে এনেছি
তিন লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট পাস, শিক্ষা-স্বাস্থ্যে গুরুত্ব
১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকরের নীতিগত সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশ যেমন ভারত বা ভিয়েতনামে সুদের হার অনেক কম। সেখানে বাংলাদেশের দুই অঙ্কের সুদ নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক থাকা কঠিন।

বর্তমানে নতুন করে বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের যে আলোচনা চলছে, সেটিও বাস্তবসম্মত কি না, তা বিবেচনা করা দরকার। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির তুলনায় সরকারি ব্যয় দ্রুত বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়

এছাড়া ব্যবসা পরিচালনায় লাইসেন্স, নিবন্ধন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, পরিবেশ ছাড়পত্রসহ নানা সেবা ডিজিটাল ও সহজ করতে হবে। এসব জায়গায় দুর্নীতি ও ঘুসের সুযোগ কমাতে অনলাইনভিত্তিক সেবা চালু করা জরুরি।

রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করণীয় কী?

কর ব্যবস্থায়ও সংস্কার দরকার। বর্তমানে সরকার মূলত বড় করদাতাদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ের উচ্চ আয়ের মানুষদেরও করজালের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ভ্যাট ব্যবস্থা সহজ ও একীভূত করা প্রয়োজন।

সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে কী করা উচিত বলে মনে করেন?

সরকারের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি দুটি ভাগে দেখা দরকার—একটি হলো পরিচালন ব্যয়, অন্যটি প্রকল্প ব্যয়। পরিচালন ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ও কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে একই পদে অপ্রয়োজনীয় জনবল রয়েছে। সরকারি অফিসগুলোকে ডিজিটালাইজ করা গেলে জনবলের প্রয়োজনও কমে আসবে।

বর্তমানে নতুন করে বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের যে আলোচনা চলছে, সেটিও বাস্তবসম্মত কি না, তা বিবেচনা করা দরকার। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির তুলনায় সরকারি ব্যয় দ্রুত বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

দেশের ভেতরেও প্রত্যাশিত বিনিয়োগ বাড়ছে না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এলেও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদ, জ্বালানি সংকট ও ব্যাংকঋণের সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না

প্রকল্প ব্যয়ের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের আগে যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ঠিকাদার বা অর্থদাতারাই প্রকল্প নকশা তৈরিতে প্রভাব ফেলছে। ফলে ব্যয় বাড়ছে, সময় বাড়ছে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত হচ্ছে না।

এখানে সংসদের আর্থিক তদারকি কমিটিগুলোর ভূমিকা আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংসদীয় নজরদারি বাড়াতে হবে।

কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি আগামী অর্থবছরে কেমন হতে পারে বলে মনে করেন?

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আগামী বছর বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে বিদেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ কমছে। আবার দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি খারাপ হলে প্রবাসীদের একটি অংশ দেশে ফিরে আসার ঝুঁকিও রয়েছে।

দেশের ভেতরেও প্রত্যাশিত বিনিয়োগ বাড়ছে না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এলেও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদ, জ্বালানি সংকট ও ব্যাংকঋণের সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না।

বিশেষ করে এসএমই খাত বড় ধরনের চাপের মধ্যে আছে। অনেক ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান নীরবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান কমছে এবং আনুষ্ঠানিক চাকরির বদলে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়ছে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো জরুরি। বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা অন্য উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় স্বল্পসুদে তহবিল এনে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

আইএইচও/এএসএ/এমএফএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।