প্রিমিয়ার ব্যাংকের অনিয়মে ক্ষতিগ্রস্ত ২৬ পোশাক কারখানা, তদন্তের দাবি

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:০৩ পিএম, ১৬ মে ২০২৬
রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীরা, ছবি: জাগো নিউজ

 

প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেডের নারায়ণগঞ্জ শাখার বিরুদ্ধে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি জালিয়াতি, অবৈধ বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং গ্রাহকদের নামে ভুয়া ঋণ সৃষ্টির অভিযোগ তুলেছেন ২৬টি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার মালিকরা। তাদের দাবি, ব্যাংকের এসব অনিয়মের কারণে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলো বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে।

শনিবার (১৬ মে) রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তারা এসব অভিযোগ উপস্থাপন করেন। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ডয়েস ল্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফুর রহমান।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, ২০১৭ সাল থেকে ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা ভুয়া আইডি ব্যবহার করে জাল সেলস কন্ট্রাক্ট তৈরি করেন। পরে এসব কৃত্রিম কন্ট্রাক্টের বিপরীতে একাধিক ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়, যদিও বাস্তবে কোনো কাঁচামাল সরবরাহ হয়নি। এলসির দায় নিষ্পত্তির নামে চলতি হিসাব ব্যবহার করে অবৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা বাজার থেকে ডলার কেনা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা।

তাদের দাবি, বাজারদরের তুলনায় প্রতি ডলারে ১২ থেকে ১৫ টাকা বেশি দামে ডলার কিনতে বাধ্য করা হয়, ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে রপ্তানি আয়ের বিপরীতে চলতি হিসাবে অর্থ জমা দেখিয়ে পরে সেই অর্থ দিয়ে কথিত এলসির দায় সমন্বয় করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক গ্রাহকদের অজান্তে ফোর্সড লোন ও ডিমান্ড লোন সৃষ্টি করে বিপুল সুদ আরোপ করেছে বলেও অভিযোগ ওঠে।

ব্যবসায়ীরা আরও অভিযোগ করেন, bb.org.bd⁠-এর ফরেন এক্সচেঞ্জ গাইডলাইন লঙ্ঘন করে চলতি হিসাব, নগদ জমা ও ঋণের মাধ্যমে এলসি সমন্বয় করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ হিসাব চাওয়া হলেও ব্যাংক তা দেয়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে ফাঁকা চেক ব্যবহার করে অর্থঋণ আদালতে মামলাও করা হয়েছে বলে দাবি করেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পুনঃতফসিলের শর্তে স্বাক্ষর না করলে এলসি ও অন্যান্য ঋণ সুবিধা বাতিলের হুমকি দেওয়া হতো। এতে কারখানার কার্যক্রম, শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ এবং সামগ্রিক উৎপাদন কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়ে। পরে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে পুনঃতফসিলে রাজি হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তা বাতিল করে দেয়। এর ফলে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ করা হয়।

ব্যবসায়ীদের দাবি, ব্যাংকের চাপ ও ঋণসংক্রান্ত মানসিক উদ্বেগে দুই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মারা গেছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, টোটাল ফ্যাশন লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসিবউদ্দিন মিয়াকে ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর একদিনে ৩৭ বার ফোন করে স্বাক্ষরের জন্য চাপ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে মানসিক চাপে তিনি ২৭ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এছাড়া ওয়েস্ট অ্যাপারেল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকও দুদকে অভিযোগ ও ঋণচাপজনিত মানসিক অস্থিরতায় ২০২৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বলে দাবি করেন তারা। আরও একটি প্রতিষ্ঠানের এমডি স্ট্রোক করে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়।

ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, ব্যাংকের দেখানো ঋণের পরিমাণ প্রকৃত দায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের মতে, ২০২৩ সাল পর্যন্ত কোনো বড় অস্বাভাবিক দায় না থাকলেও ২০২৪ সালে হঠাৎ করেই বিপুল অঙ্কের ঋণ দেখানো হয়, যা অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক।

সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীরা বলেন, কারখানার কার্যক্রম বন্ধ করে দিলে ঋণ পরিশোধের পথও বন্ধ হয়ে যাবে। এতে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে এবং দেশের রপ্তানি আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই ব্যবসা সচল রেখে প্রকৃত দায় পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

একই সঙ্গে bb.org.bd⁠, অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত এবং স্বনামধন্য অডিট ফার্মের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিরীক্ষার দাবি জানান ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে গত ৬ এপ্রিল গভর্নরের কাছে লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তারা।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টোটাল ফ্যাশন লিমিটেড-এর বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহরাব বিন হাসিব এবং জননী ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গৌতম পোদ্দারসহ।

ইএআর/এমএএইচ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।