তাজহাটের প্রতিটি ইটে লুকিয়ে আছে কোনো গোপন গল্প
রংপুরের বুকজুড়ে আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে শত বছরের পুরোনো স্থাপত্যকীর্তি তাজহাট জমিদার বাড়ি। উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান এই পর্যটনকেন্দ্রটি বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় ‘রংপুর জাদুঘর’ হিসেবেও পরিচিত। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখরিত থাকে জাদুঘরের প্রাঙ্গণ।
জাদুঘরে রয়েছে ছোট কোরআন শরিফ, মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের লেখা খুতবা, মহাকবি শেখ সাদির লেখা কবিতা, শিবলিঙ্গ, উল্কাপিণ্ড, কষ্টিপাথরের মূর্তি, শিলামূর্তি, দশম ও একাদশ শতাব্দীর অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক, সংস্কৃত ও আরবি ভাষায় লেখা প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, কালো পাথরের তৈরি বিষ্ণুমূর্তি, প্রাচীন বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র, রাজা গোপাল রায়ের ব্যবহৃত দাঁড়িপাল্লা, পুরোনো দিনের টেবিল-আসবাবপত্র, হাতে লেখা মহাভারত, মহাস্থানগড়ের পোড়ামাটির ফলক, সরলা দেবীর মূর্তি, সাঁওতালদের ব্যবহার করা তির-ধনুক ও প্রাচীন মুদ্রাসহ শতাধিক বিরল প্রত্নতত্ত্ব নির্দশন।
আধুনিক পর্যটন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই স্থাপনাটি থেকে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আয় বর্তমানের তুলনায় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে ঐতিহ্যবাহী এ জমিদার বাড়িটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে ৫৫ একর জমিসহ এগ্রিকালচার ইনস্টিটিউটকে দেওয়া হয়। এরপর ১৯৮৪ সালের ১৮ মার্চ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাড়িটিকে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন হিসেবে উদ্বোধন করেন।
১৯৯১ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে হাইকোর্ট ডিভিশন উঠে গেলে ১৯৯৫ সালে রাজবাড়িটি ১৫ একর জমিসহ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২০০৫ সালে তাজহাট জমিদার বাড়িটিকে জাদুঘরে রূপান্তর করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।
গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা ও শীতকালে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারেন দর্শনার্থীরা। এরমধ্যে সপ্তাহের প্রতি রোববার পূর্ণ দিবস এবং সোমবার প্রথমার্ধে জাদুঘর বন্ধ থাকে।

রংপুর জাদুঘরের সহকারী কাস্টডিয়ান সিয়াম চৌধুরী জাগো নিউজকে জানান, সাধারণত শীতকালে (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) প্রতিমাসে ২৫-৩০ হাজার এবং অন্য সময় প্রতিমাসে ২০ হাজারের মতো দর্শনার্থীর আগমন ঘটে এখানে। বর্তমানে ১৫ জন দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে ও একজন কাস্টডিয়ানসহ ১৮ জন স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন।
জাদুঘর ও জমিদার বাড়ির মূল অবকাঠামো পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই জানিয়ে সিয়াম চৌধুরী বলেন, ‘সেটা ঠিক রেখে আরও আকর্ষণীয় হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান। এরইমধ্যে সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ ফি ৩০ টাকা, পরিচয়পত্র প্রদান সাপেক্ষে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ টাকা, সার্কভুক্ত দেশের দর্শনার্থীদের জন্য ২০০ টাকা এবং এর বাইরে অন্য দেশের দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ ফি ৪০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।’
সম্ভাবনার তুলনায় প্রাপ্তি এখনো সামান্য বলে মন্তব্য করলেন মাহিগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা আহসান খান। পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘পর্যটকদের জন্য উন্নত আবাসন, ক্যাফেটেরিয়া এবং যাতায়াত ব্যবস্থার আরও আধুনিকায়ন করা গেলে এটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এটা হলে সরকারের রাজস্ব আয় অনেকাংশে বাড়বে।’
আরও পড়ুন:
খাতা-কলমে লিজ, বাস্তবে জবরদখল
হারিয়ে গেছে মহাস্থান জাদুঘরের একটি মূর্তি, জানা গেলো ১৯ বছর পর
কড়ি থেকে কাগুজে নোটের সমাহার ‘টাকা জাদুঘর’
বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাদুঘর চালু মিশরে, কী আছে সেখানে?
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রংপুর অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানাতে তাজহাট জমিদার বাড়ির সঙ্গে যুক্ত জাদুঘরটি বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি রংপুরের সদস্যসচিব, লেখক ও সংগঠক জাকির আহমদ।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই অঞ্চলে অসংখ্য প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন রয়েছে। সেগুলো নিয়ে এসে জাদুঘরের সংগ্রহ আরও বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি উন্নতমানের পিকনিক স্পট ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে।’
তাজহাট জমিদার বাড়িটি কোলাহলমুক্ত ছায়াঘেরা সবুজ সমারোহে পরিবেষ্টিত আকর্ষণীয় পরিবেশে অবস্থিত। যার চারদিকে রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ শোভা, ফুলের বাগান, উত্তর ও দক্ষিণে কামিনী, মেহগনি, কাঁঠাল ও আমবাগান। রয়েছে লাইব্রেরি ও সমসাময়িককালে খনন করা বিশালাকৃতির চারটি পুকুর।
রংপুর জাদুঘরের অপার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে কবি রেজাউল করিম জীবন জাগো নিউজকে বলেন, ‘তাজহাট জমিদার বাড়ি ও জাদুঘর বর্তমানে রংপুরের পর্যটন খাতের অন্যতম একটি কেন্দ্র। স্থানীয় দর্শনার্থীদের পাশাপাশি বিদেশি গবেষকরাও এখানে ইতিহাস অন্বেষণে আসেন। এটি কেবল একটি দালান নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্যের স্মারক। এই স্থাপত্যের প্রতিটি ইটে জড়িয়ে আছে উত্তরবঙ্গের সমৃদ্ধ ইতিহাস। এই বাড়ি ও বিশাল এলাকা ঘিরে পর্যটনকেন্দ্রের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার এ বিষয়ে নজর দিলে একদিকে যেমন রাজস্ব আয় বাড়বে, অন্যদিকে আরও সমৃদ্ধ হবে রংপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য।’
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, “রংপুরের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম রংপুর জাদুঘর। এটি আরও আকর্ষণীয় হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে নির্দিষ্ট সময় অন্তর লোকজ মেলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে পর্যটকদের আগ্রহ বহুগুণ বাড়বে। তাজহাট জমিদার বাড়িকে একটি ‘কমপ্লিট ট্যুরিজম প্যাকেজ’-এর আওতায় আনতে পারলে রাজস্ব আয়ের গ্রাফ দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হবে বলে মনে করি।”
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সোহাগ আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রথমেই তাজহাট জমিদার বাড়ি বা রংপুর জাদুঘরকে প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমে ভবনের মূল কাঠামো, ছাদ, দেওয়াল, বারান্দা, মেহমানখানা এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক অংশের সংরক্ষণ জরুরি, যাতে ঐতিহাসিক মান অক্ষুণ্ন থাকে। প্রাচীন স্থাপত্য ও নকশা অনুযায়ী পুনর্নির্মাণ বা সংস্কারের সময় উপকরণ ও কারিগরি পদ্ধতি প্রাচীন ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।’
আরও পড়ুন:
প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামে কীভাবে হলো দুঃসাহসী চুরি, ধাপে ধাপে বর্ণনা
গিলা-চামড়াতেই মাংসের স্বাদ খুঁজছেন নিম্নবিত্তরা
চরাঞ্চলের ত্রাস ‘ভূমিদস্যু বাহিনী’, নেতৃত্বে বিএনপির দুই নেতা
ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যে তাদের পরিবারের ইতিহাস সংরক্ষণ করলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ে উল্লেখ করে এই সহকারী অধ্যাপক বলেন, ‘প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য প্রদর্শনের জন্য ডিজিটাল টাচস্ক্রিন, কিউআর কোড বা অডিও-ভিডিও গাইড ব্যবহার করা যেতে পারে। এটা করা গেলে দর্শকরা বাড়ির ইতিহাস, জমিদার পরিবারের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং স্থানীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন।’

সোহাগ আলী বলেন, ‘রাজস্ব বাড়ানোর জন্য গবেষণা প্রমাণ করে যে, টিকিট ফি, ফটো পারমিট ফি এবং স্থানীয় হস্তশিল্প বিক্রি কার্যকর। এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রচারণা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার উপস্থিতি বাড়ালে বিদেশি পর্যটকের আগমনও বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও আধুনিক প্রদর্শনী ব্যবস্থার সমন্বয়ে তাজহাট জমিদার বাড়ি একটি আন্তর্জাতিক মানের ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।’
প্রাচীন রঙ্গপুরের (বর্তমান রংপুর) ইতিহাস থেকে জানা যায়, জমিদার বাড়িটির ইতিহাস ঠিক যেন রূপকথার গল্পের মতোই। একসময় জমিদার বাড়ির এই এলাকায় হীরা, মানিক ও জহরতের ব্যবসা হতো। বিক্রি হতো নামিদামি হীরা, মানিক ও জহরতখচিত তাজ বা টুপি। আর এই ব্যবসা শুরু করেছিলেন মান্না লাল রায় নামের একজন। তিনি সুদূর পাঞ্জাব থেকে রঙ্গপুরের মাহিগঞ্জে এসেছিলেন ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে। সেসময় মাহীগঞ্জ ছিল রংপুরের জেলা সদর।

শিক ধর্ম থেকে হিন্দু ধর্মে রূপান্তরিত মান্না লাল রায়ের হাত ধরেই মাহিগঞ্জে বসতো জমজমাট তাজের হাট। সেখানে পাওয়া যেত রাজা-বাদশাহর চাহিদানুযায়ী অনেক মূল্যবান তাজ। এই তাজ বিক্রির হাটই সময়ের পরিক্রমায় প্রসিদ্ধি লাভ করে ‘তাজহাট’ নামে, যা বর্তমান রংপুর মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে।
মান্না লাল রায় ছিলেন তাজহাট জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তাজহাট এলাকায় এই জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন মান্না লাল রায়ের বংশধর রাজা গোবিন্দ লালের পুত্র গোপাল লাল রায় (জি এল রায়)।

গোবিন্দ লাল ১৮৭৯ সালে এই জমিদারির উত্তরাধিকারী হন। তিনি ছিলেন খুবই স্বাধীনচেতা ও জনপ্রিয়। ফলে তিনি ১৮৮৫ সালে ‘রাজা’, ১৮৯২ সালে ‘রাজা বাহাদুর’ এবং ১৮৯৬ সালে ‘মহারাজা’ উপাধি লাভ করেন। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে নিজ বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে তার মৃত্যু হয়। ১৯০৮ সালে তার ছেলে গোপাল লাল রায় জমিদারির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি পরাক্রমশালী শাসক হিসেবে ঊনবিংশ শতাব্দীতে বৃহত্তর রংপুর শাসন করেন। তার শাসনামলেই ১০ বছর (১৯০৮-১৯১৭) সময় ধরে বিভিন্ন নকশা ও কারুকাজ খচিত ভবনটি নির্মাণ করেন প্রায় দুই হাজার নির্মাণশিল্পী।
বর্তমানে রংপুর মহানগরীতে হাতেগোনা যে কয়টি বিনোদনকেন্দ্র রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম তাজহাট জমিদার বাড়ি। ৭৬ দশমিক ২০ মিটার দৈর্ঘ্যের ভবনটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে উন্নতমানের লাল ইট, শ্বেতপাথর ও চুনাপাথর।
প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশের প্রধান আকর্ষণ হলো শ্বেতপাথরের তৈরি বিশাল একটি সিঁড়ি। প্রশস্ত এই সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় দোতলায়। সেখানেই দুটি বড় কক্ষে গড়ে তোলা হয়েছে প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘরটি।
জিতু কবীর/এসআর/এএইচ/জেআইএম