ব্যাংকগুলোতে অলস টাকার পাহাড়


প্রকাশিত: ০১:৫৪ পিএম, ২০ মে ২০১৫

দেশের ব্যাংকিং খাতে অলস টাকার পাহাড় কমছে না। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও শিল্প উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না। এপ্রিল মাসে ব্যাংকে অলস টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ সাত হাজার ৪২০ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময় এর পরিমাণ ছিলো ৯০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বছর ব্যবধানে অলস টাকার পরিমাণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৪২০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্র বলছে, ৫৬টি ব্যাংক মিলিয়ে এই বড় অংক দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে পুরোপুরি অব্যবহৃত আছে তিন হাজার ২০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক প্রায় ১৮ শতাংশ টাকা জমার পর এ অলস টাকা পড়ে আছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বুধবার বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলেও বিনিয়োগ যেন প্রাণ পাচ্ছে না। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা সত্যিকার অর্থে আস্থা ফিরে পাচ্ছেন না। বিএনপি যেকোনো সময় আন্দোলনে যেতে পারেন বলে তারা মনে করছেন। গত তিন মাসের অবরোধে ব্যবসায়ীদের আস্থার চিড় ধরিয়ে দিয়েছে।

এ ছাড়া ব্যাংক ঋণের চড়া সুদের হারও এর জন্য দায়ী বলে মনে করেন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। এদিকে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড। এ পরিমাণ রিজার্ভ দিয়ে অন্তত আট মাসের আমদানি ব্যয় পরিশোধ করা সম্ভব। অথচ যেকোনো এক দিনের দেশের স্থিতিশীল অর্থনেতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তিন মাসের আমদানির দায় মেটানোর মতো রিজার্ভ থাকতে হয়। নানা প্রতিকূলতার কারণে রেকর্ড পরিমাণ এ রিজার্ভ কাজে লাগাতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এদিকে, অর্থনীতির এমন পরিস্থিতিতে বেড়ে যাচ্ছে মূল্যস্ফীতি। যদিও তা সরকারের বাজেট ঘোষণার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু টানা চার মাস মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্ববধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, আস্থার সংকটের কারেণ উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলেও এটাকে বেশির ভাগ মানুষই সাময়িক অবস্থা মনে করছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না কেউই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ ফেরাতে সরকার এখনো লক্ষণীয় কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে একদিকে বিনিয়োগ বাড়ছে না অন্যদিকে ব্যাংকে অলস টাকার পাহাড় জমছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, ব্যাংক খাতে অলস টাকা জমা থাকলেও ঋণের সুদের হার এখনো ১৭ থেকে ১৮ শতাংশের কাছাকাছি। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক দাবি করেছে, দেশের সার্বিক ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশ। কিন্তু প্রকৃত হার আরো বেশি।

সূত্রগুলো বলছে, টাকা অলস পড়ে থাকলে কর্মসংস্থানও বাড়বে না। ফলে মানুষের জীবনযাত্রার সাধারণ গতি নষ্ট হবে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যা বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে।

অলস টাকার পরিমাণ বাড়ছেই। বর্তমানে ব্যাংকিং সেক্টরে অলস টাকার পরিমাণ প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। আমানত সংগ্রহ করে ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারছে না। এদিকে ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। ফলে বেশিরভাগ ব্যাংকেরই মুনাফা কমে গেছে। কমে গেছে তাদের লভ্যাংশ প্রদানের হার। এতে পুঁজিবাজারে ব্যাংকিং খাতের শেয়ারেও বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। লভ্যাংশ ঘোষণা করার পর দরপতন আরো তীব্র হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, গত বছরের জুলাইয়ে ব্যাংকিং সেক্টরে অলস টাকার পরিমাণ ছিল ৭০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এরপর রাজনৈতিক অস্থিরতা তীব্র হওয়ায় অলস টাকাও অনেক বেড়ে যায়। সূত্রগুলো বলছে, বাজারে সাধারণত মূলধন ও লেনদেনের দিক থেকে ব্যাংকের শেয়ারগুলোর প্রাধান্য থাকে সবচেয়ে বেশি। ২০০৯ ও ২০১০ এর শেয়ারবাজার উত্থানের পেছনেও এ শেয়ারগুলোর চাহিদা বৃদ্ধি ছিল অন্যতম কারণ। বর্তমানে এ শেয়ারগুলোর লেনদেন খুব সন্তোষজনক নয়।

ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক বছর আগেও ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহের জন্য অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। অনেক ব্যাংক আমানত টানতে সুদ গুনেছিল ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ঋণের চাহিদা কমে গেছে। ফলে আমানতের  জন্য ব্যাংকগুলোর প্রতিযোগিতা স্বাভাবিক গতিতে রয়েছে।

ব্যাংকে টাকা অলস পড়ে থাকার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাগো নিউজকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর সরকার স্থিতিশীল হলেও উদ্যোক্তারা এখনো ভরসা করতে পারছেন না। ফলে তারা বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। তাছাড়া ব্যাংকগুলোও ঋণ দিতে খুব সতর্ক থাকছে।

এসএ/বিএ/আরআই

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।