পুঁজিবাজার
করপোরেট গভর্নেন্সের খসড়া: স্বতন্ত্র পরিচালক থেকে অডিট সবখানে কড়াকড়ি
দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের সুশাসন সংকট, আর্থিক অনিয়ম ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার প্রেক্ষাপটে নতুন করপোরেট গভর্নেন্স বিধিমালা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
এ লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (করপোরেট গভর্নেন্স) বিধিমালা, ২০২৬’ এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এ বিধিমালায় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পরিচালনা কাঠামো, অডিট ব্যবস্থা, তথ্য প্রকাশ ও জবাবদিহিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে।
খসড়ার ওপর সংশ্লিষ্টদের মতামত, পরামর্শ বা আপত্তির বিষয়ে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মতামত পাঠাতে বলেছে বিএসইসি। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ মতামত চাওয়া হয়েছে।
স্বতন্ত্র পরিচালকের ভূমিকায় বাড়তি গুরুত্ব
খসড়া বিধিমালায় পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালকদের কার্যকর ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সংখ্যক স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার পাশাপাশি তাদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও স্বাধীনতার বিষয়ে বিস্তারিত মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বার্থের দ্বন্দ্ব রয়েছে এমন ব্যক্তিদের স্বতন্ত্র পরিচালক হওয়ার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।
একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত কোম্পানির বোর্ডে অন্তত একজন নারী স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব-সহকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কমিশনের মতে, বোর্ডে বৈচিত্র্য ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ।
চেয়ারম্যান ও সিইও আলাদা রাখার বাধ্যবাধকতা
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কমাতে কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক/প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) দায়িত্ব পৃথক রাখার বাধ্যবাধকতা বহাল রাখা হয়েছে। বিএসইসির মতে, এতে বোর্ডের স্বাধীনতা ও ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।
অডিট কমিটিতে কঠোর নজরদারি
নতুন বিধিমালায় অডিট কমিটিকে আর্থিক শৃঙ্খলার অন্যতম প্রধান কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অডিট কমিটির চেয়ারম্যানকে স্বতন্ত্র পরিচালক হতে হবে এবং কমিটিকে নিয়মিত সভার মাধ্যমে আর্থিক প্রতিবেদন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা তদারকি করতে হবে।
কোনো অনিয়ম বা জালিয়াতির আশঙ্কা দেখা দিলে তা বোর্ডকে অবহিত করার নির্দেশনাও রাখা হয়েছে।
নমিনেশন ও রেমুনারেশন কমিটি বাধ্যতামূলক
পরিচালক ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ, মূল্যায়ন ও পারিশ্রমিক নির্ধারণে নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটির (এনআরসি) ভূমিকা আরও কাঠামোবদ্ধ করা হয়েছে। এ কমিটিকে নিয়োগে স্বচ্ছতা, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং উত্তরসূরি পরিকল্পনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক প্রতিবেদন ও তথ্য প্রকাশে কড়াকড়ি
বিধিমালায় আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একাধিক নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও)-কে যৌথভাবে আর্থিক প্রতিবেদনের সত্যতা প্রত্যয়ন দিতে হবে।
এছাড়া বার্ষিক প্রতিবেদনে পরিচালকদের সভায় উপস্থিতি, কমিটির কার্যক্রম, সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও করপোরেট তথ্য বিস্তারিতভাবে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেনে নজরদারি
পরিচালক, উদ্যোক্তা বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নতুন বিধিমালায় কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্বজনপ্রীতি বা গোপন সুবিধা প্রতিরোধে এসব লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ
প্রতিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে কার্যকর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকি শনাক্তকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা, আর্থিক নিরাপত্তা ও জালিয়াতি প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
ডিজিটাল তথ্য প্রকাশে জোর
খসড়া বিধিমালায় কোম্পানির ওয়েবসাইটে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়মিত প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বার্ষিক প্রতিবেদন, শেয়ারহোল্ডিং তথ্য, করপোরেট ঘোষণা ও কমিটির তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করতে হবে।
কমিশনের নজরদারি ক্ষমতা বাড়লো
বিধিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কমিশনকে আরও কার্যকর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে বিএসইসি ব্যাখ্যা তলব, তদন্ত পরিচালনা, সংশোধনী নির্দেশনা কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে।
এমএএস/এমকেআর