নতুন ব্যাংক পেতে ভারতের লবিং!

মো. শফিকুল ইসলাম
মো. শফিকুল ইসলাম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:০৯ পিএম, ০১ এপ্রিল ২০১৮

দেশে বর্তমানে চালু রয়েছে ৫৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংক। তাই এখন আর নতুন ব্যাংক অনুমোদনের পক্ষে নয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপরও চলছে দৌড়ঝাঁপ, সরকারের উচ্চপর্যায়ে চলছে নানা দেন-দরবার। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশি লবিং শুরু করেছেন উদ্যোক্তারা। অনুমোদন দিতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের প্রভাবশালী নেতারা বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফোন দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়ম-দুর্নীতি আর নানা অব্যবস্থাপনায় বর্তমানে দুরবস্থার মধ্যে রয়েছে দেশের ব্যাংকিং খাত। বর্তমান সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে অনুমোদন পাওয়া নতুন ব্যাংকগুলোর অবস্থা আরও নাজুক। এমন অবস্থায় নতুন করে ব্যাংক অনুমোদন দেয়া অযৌক্তিক বলে জানিয়েছেন ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা। তবে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে আরও ব্যাংকের প্রয়োজন, বলছে সরকার। তাই রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রস্তাবিত তিনটি নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

প্রস্তাবিত নতুন ব্যাংকগুলো হচ্ছে- পিপলস ইসলামী ব্যাংক, বাংলা ব্যাংক ও পুলিশ ব্যাংক। এদের মধ্যে পিপলস ইসলামী ব্যাংকের নেতৃত্বে আছেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা এম এ কাশেম। বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান জসীম উদ্দিনের প্রস্তাবিত ব্যাংকের নাম ‘বাংলা ব্যাংক’। এ ছাড়া পুলিশ বাহিনীর জন্য আলাদা ‘পুলিশ ব্যাংক’।

কাগজে-কলমে ব্যাংক অনুমোদনের ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের হলেও নতুন ব্যাংকের সিদ্ধান্ত আসে সরকারের রাজনৈতিক বিবেচনায়। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থনীতিবিদদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও লাইসেন্স পাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমানে নতুন ব্যাংকের কোনো প্রয়োজন নেই। সরকারের রাজনৈতিক বিবেচনায় আবারও ব্যাংক দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এখন নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেয়া হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। সর্বশেষ অনুমোদন পাওয়া নতুন ব্যাংকগুলোর এখন করুণ অবস্থা। ফারমার্স ও এনআরবিসিসহ কয়েকটি ব্যাংকে হরিলুট চলছে। গ্রাহকের আমানতও খেয়ে ফেলা হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দিলে কী অবস্থা হয়- এ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। অতীত থেকে শিক্ষা না নিয়ে আবারও লাইসেন্স দিলে ভবিষতে এ অবস্থা ভয়াবহ হবে।

তিনি বলেন, ব্যাংকের লাইসেন্স দিতে লবিং চলছে। সরকারের এমন মহল থেকে ফোন আসে যা অবাক করার মতো। শুধু দেশ থেকে নয়, এখন বিদেশ থেকেও দেন-দরবার করা হচ্ছে। সম্প্রতি প্রস্তাবিত একটি ব্যাংকের (বাংলা ব্যাংক) উদ্যোক্তা ফোন দিয়ে আমাকে বলেন প্রণব মুখার্জির (ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি) ছেলের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি আমার কাছে খোঁজ-খবর জানতে চাইলেন। আমি শুধু বলেছি, হ্যাঁ ঠিক আছে।

এ বিষয়ে বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান জসীম উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলা ব্যাংক’ নামে ব্যাংক অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছি। এখন যাচাই-বাছাই চলছে। আশা করছি বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের প্রক্রিয়া শেষ করে অনুমোদন দেবে।

ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়ার জন্য দেশি-বিদেশি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দিয়ে লবিং করানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রস্তাবিত ব্যাংকের এ উদ্যোক্তা বলেন, নিয়মনীতি মেনে আমরা ব্যাংকের আবেদন করেছি। অনুমোদন দেয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের বিষয়। আমি এখন পর্যন্ত কোনো লবিং করিনি। ভারতের নেতাদের দিয়ে লবিংয়ের বিষয়টি এখন শুনলাম।

জানা গেছে, বেঙ্গল গ্রুপের চেয়ারম্যান নোয়াখালী-২ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মোরশেদ আলম। তিনি মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক ও সাবেক চেয়ারম্যান। এছাড়া জসীম উদ্দিন ২০১২ সালে অনুমোদন পাওয়া মেঘনা ব্যাংকের উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডার। অন্যদিকে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির স্ত্রী শুভ্রা মুখার্জির নামে নড়াইলে একটি হাসপাতাল হচ্ছে। ব্যাংকটির অর্থায়নে হাসপাতালটি পরিচালিত হবে বলে জানা গেছে।

নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, শুধু রাজনৈতিক ইচ্ছায় বাংলাদেশ ব্যাংক আগে নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছিল। এখন ব্যাংকগুলো অবস্থা কী তা সবাই জানে। নতুন করে আরও ব্যাংক দিলে এ খাতে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর হতে হবে।

এদিকে নতুন ব্যাংকের অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র দেবাশিস চক্রবর্তী জাগো নিউজকে বলেন, নতুন ব্যাংকের আবেদন জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়। তবে এটি অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। পর্ষদের চেয়ারম্যান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হলেও এখানে অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের একাধিক সদস্য রয়েছেন। তারা যদি মনে করেন এখন ব্যাংক প্রয়োজন তাহলে অনুমোদন দেবেন।

জানা গেছে, নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স পেতে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। প্রধানমন্ত্রী পুলিশের একটি অনুষ্ঠানে তাদের জন্য ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হবে বলেন জানান। এছাড়া দুটি ব্যাংকের লাইসেন্স দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, রীতি অনুযায়ী নতুন ব্যাংকের জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়। অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য ১০ লাখ টাকা জমা দিতে হয়। এছাড়া প্রাথমিকভাবে অনুমোদন দেয়া হলে উদ্যোক্তাদের প্রদর্শিত আয় থেকে মূলধনের জন্য ৪০০ কোটি টাকা জমা দিতে হয়। এরপরই নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয় পরিচালনা পর্ষদ।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনীতিবিদের দ্বিমত সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সরকারের আগের মেয়াদে ২০১২ সালে নয়টি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়। লাইসেন্স পাওয়া সব ব্যাংকই সরকার-সমর্থিত ব্যক্তিদের। ব্যাংকগুলো হলো- আয়কর উপদেষ্টা এস এম মনিরুজ্জামান খন্দকারের মিডল্যান্ড ব্যাংক, সংসদ সদস্য এইচ এন আশিকুর রহমানের মেঘনা ব্যাংক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের ফারমার্স ব্যাংক, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ইউনিয়ন ব্যাংক, সরকারদলীয় এমপি ফজলে নূর তাপসের মধুমতি ব্যাংক এবং এস এম আমজাদ হোসেনের সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা ফরাসত আলীর এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, ইকবাল আহমেদের এনআরবি ব্যাংক ও নিজাম চৌধুরীর এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক অনুমোদন পায়। ২০১৬ সালে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) দেয়া হয় সীমান্ত ব্যাংক।

এসআই/বিএ/এমএআর/আরএস/এমএস