গতি আসছে পিপিপির প্রকল্প বাস্তবায়নে

মেসবাহুল হক
মেসবাহুল হক মেসবাহুল হক , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৫৫ পিএম, ১৮ আগস্ট ২০১৮

সরকারের রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১-এর অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে দেশের ভৌত অবকাঠামো ও সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশেষ জোর দেয়া হচ্ছে। এ জন্য প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে উন্নয়ন প্রকল্পের অন্তত ৩০ ভাগ পিপিপিতে নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া ৪৭টি প্রকল্প পিপিপির ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পে মোট আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।

পিপিপি কর্তৃপক্ষের বোর্ড অব গভর্নরসের সিদ্ধান্তে ইতোমধ্যে ১০টি প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বেসরকারি অংশীদারদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এছাড়া জিটুজি (সরকার টু সরকার) পদ্ধতিতে পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়েও উদ্যোগ গ্রহণ করেছে পিপিপি কর্তৃপক্ষ।

এদিকে চারটি প্রকল্পের ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফাইন্যান্সিং (ভিজিএফ) বরাদ্দও রাখা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নেয়া ৪৭টি প্রকল্পের মধ্যে দুটি প্রকল্প ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। এগুলো হলো- হেমোডায়ালাইসিসি সেন্টার অ্যাট চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হসপিটাল, হেমোডায়ালাইসিসি সেন্টার অ্যাট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড উইরোলজি (এনআইকেডিইউ)।

১০টি প্রকল্প বাস্তবায়নে বেসরকারি অংশীদারদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এসব প্রকল্পে কোনো ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফাইন্যান্সিং (ভিজিএফ) দেয়া লাগবে না। এগুলো হলো- ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক, মংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন প্রকল্প, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল-২ স্থাপন প্রকল্প, মোংলা বন্দরের দুটি জেটি নির্মাণ প্রকল্প, রাজউকের আওতায় মধ্যবিত্তদের জন্য বহুতল ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্প, ঢাকার মিরপুর-৯ এ মাল্টি-স্টোরেড ফ্লাট বিল্ডিং, পর্যটন কর্পোরেশনের অধীনে কক্সবাজারে একটি ট্যুরিজম কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প, সিলেটের শ্রীমঙ্গলে বয়স্কদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল অবসর নির্মাণ প্রকল্প এবং নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকদের জন্য ওয়েলফেয়ার সেন্টার ও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প।

সূত্র জানায়, ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফাইন্যান্সিং এর সম্মতি দেয়া হয়েছে তিনটি প্রকল্পে। এগুলো হচ্ছে- ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্য ছয় হাজার কোটি টাকা; রাজউকের অধীনে শান্তিনগর হতে মাওয়া সড়ক পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা চতুর্থ সেতুসহ ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পে ৬০০ কোটি টাকা। এছাড়া ঢাকা বাইপাস রোডের জন্যও ভিজিএফ রাখা হয়েছে। ভিজিএফ এর পরিমাণ মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৩০ শতাংশের মধ্যে হতে হবে।

পিপিপি প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল দুই হাজার ১১৩ কোটি টাকা। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত হারে খরচ হয়নি অর্থ। তাই বরাদ্দ ব্যয়ে হতাশা থাকলেও এবার নেয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। এবার আশা করা হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে গতি আসবে। এছাড়া চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) রেকর্ডসংখ্যক ৭৮টি প্রকল্প যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, পাঁচ বছরের মধ্যে এবারই এডিপিতে যুক্ত হওয়া পিপিপি প্রকল্পের সংখ্যা সর্বোচ্চ। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে পিপিপি কর্তৃপক্ষ, অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগ রয়েছে। পিপিপিতে প্রকল্প গ্রহণ নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগে গঠন করা হচ্ছে পিপিপি সেল বা ইউনিট। সেই সঙ্গে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে একজন পিপিপি ফোকাল পয়েন্ট এবং একজন বিকল্প ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, গত অর্থবছরে এডিপিতে পিপিপির প্রকল্প রাখা হয় ৩৬টি। পরে মার্চ মাসে এসে সংশোধিত এডিপিতে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৩০টিতে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এডিপিতে পিপিপি প্রকল্পের সংখ্যা ছিল ৩২টি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের এডিপিতে ছিল ৪০টি, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের এডিপিতে ৪০ এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে পিপিপি প্রকল্পের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ৪৬টি। কিন্তু আগামী অর্থবছরের (২০১৮-১৯) এডিপিতে প্রায় দিগুণ ৭৮টি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি প্রকল্পের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পিপিপি কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে অনুমোদন দিয়েছে।

বাকি ৩১টি প্রকল্প বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে পাওয়া গেছে। এর আগে পিপিপি প্রকল্পের ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার নির্দেশ দেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে মোট বিনিয়োগ প্রকল্পের ৩০ শতাংশ পিপিপির আওতায় বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেয়া হয়। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে এডিপি প্রণয়নের নীতিমালায় অন্তর্ভুক্তির জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানানো হয় পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগকে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত চিঠিটি পাঠায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

চিঠিতে বলা হয়, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার হিসাব মতে, সরকারের রূপকল্প-২০২১ ও ২০৪১-এর অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে দেশের ভৌত অবকাঠামো ও সেবা সেক্টরে প্রতি বছর বিনিয়োগ প্রয়োজন মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ছয় ভাগ। অর্থাৎ প্রতি বছর কমপক্ষে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। যেখানে পিপিপির মাধ্যমে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ দশমিক ৮ ভাগ। অর্থাৎ প্রতি বছর পিপিপি প্রকল্পে বিনিয়োগ হতে হবে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা অবকাঠামো ও সেবা সেক্টরের মোট বিনিয়োগের শতকরা ৩০ ভাগ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর পিপিপি প্রকল্পে গতি আসবে। কারণ তার নির্দেশনা হলো অনুশাসন যা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে মেনে চলতে হয়। উন্নয়ন প্রকল্পে ৩০ ভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশ থাকলে উন্নয়ন প্রক্রিয়া আরও দ্রুততর হবে।

তিনি বলেন, পিপিপিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয়েছে। কয়েকটি দৃশ্যমান অগ্রগতি হলে এ খাতে আরও অনেকেই এগিয়ে আসবেন, তখন এর বাস্তবায়ন দ্রুত হারে বাড়বে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অনেক দিন থেকেই পিপিপিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা শোনা যাচ্ছে। তবে এর বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। যদি পিপিপিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয় তাহলে এডিপি বাস্তবায়নে সরকারের দায়ের পরিমাণ কমবে। এটা দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য সুখকর হবে।

এদিকে লাভজনক প্রকল্প বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) না করে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারের (পিপিপি) মাধ্যমে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি আবুল কাসেম খান। তিনি বলেন, মুনাফা করা সহজ হবে না- এমন প্রকল্পগুলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) রাখতে। আর দ্রুত সময়ে বিনিয়োগ উঠে আসার সম্ভাবনা থাকা অবকাঠামো প্রকল্পগুলো পিপিপিতে বাস্তবায়ন করা উচিত। এর মাধ্যমে অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে বেসরকারি বিনিয়োগ আসবে বলেও মনে করেন তিনি।

এমইউএইচ/এমএআর/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :