প্লাস্টিক দানার বদলে সিমেন্ট, প্রতারণা ও মিথ্যাচারের শিকার প্রাণ

আবু আজাদ
আবু আজাদ আবু আজাদ , নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৮:০০ পিএম, ১৩ জুন ২০১৯
কনটেইনারে মধ্যে পাওয়া সৌদি আরবের জেবল আলি ব্র্যান্ডের সিমেন্ট

সৌদি আরব থেকে ৫১০ মেট্রিক টন প্লাস্টিক রেজিন (প্লাস্টিক দানা) সরবরাহ পাওয়ার কথা ছিল প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান প্রাণ ডেইরি’র। কিন্তু ৩০টি কনটেইনারে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানো উচ্চ মূল্যের সেই প্লাস্টিক রেজিন বদলে গেল সাদামাটা সিমেন্টে!

প্রতারণার শিকার প্রাণ ডেইরি কাস্টম কর্তৃপক্ষকে সে তথ্য আগেই জানায় এবং পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে অর্থ পরিশোধ থেকে বিরত থাকে। এরপরও উল্টো প্রাণ ডেইরি’র বিরুদ্ধে আনা হয়েছে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ! অভিযোগ যাচাই-বাছাই ছাড়াই দেশসেরা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ক্রমাগত মিথ্যা ও ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশ করছে কিছু গণমাধ্যম।

চট্টগ্রাম কাস্টম জানায়, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান প্রাণ ডেইরি লিমিটেড সংযুক্ত আরব আমিরাতের জিপিজি মিডিল ইস্ট জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানির কাছ থেকে ৫১০ মেট্রিক টন প্লাস্টিক রেজিন আমদানির ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশি টাকায় যার মূল্য প্রায় পাঁচ কোটি ৫২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। পণ্যের চালানটি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর দায়িত্বে ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের এভারবেস্ট লজিস্টিকস লিমিটেড।

গত ২৬ মে সৌদি আরব থেকে দুবাই হয়ে প্রাণ ডেইরি লিমিটেডের নামে ৩০টি আমদানি পণ্যবোঝাই কনটেইনারের চালান চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। ওইদিনই চালান খালাসের জন্য নথিপত্র জমা দেয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান।

গত মঙ্গলবার (১১ জুন) চট্টগ্রাম বন্দরের একটি ইয়ার্ডে প্রাণ ডেইরি’র নামে আমদানি করা পণ্যবোঝাই ৩০টি কনটেইনারের কায়িক পরীক্ষা শেষে চট্টগ্রাম কাস্টম কর্তৃপক্ষ জানায়, প্লাস্টিকের দানা ঘোষণা দিয়ে সৌদি আরবের একটি ব্র্যান্ডের সিমেন্ট আমদানির মাধ্যমে প্রাণ ডেইরি প্রায় তিন কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করেছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম কর্তৃপক্ষের দেয়া বর্ণনা সাদামাটা চোখে দেখলে মনে হবে যে, প্লাস্টিক দানার বদলে সিমেন্ট এনে রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করেছে দেশসেরা প্রাণ গ্রুপ। কিন্তু ঘটনার পরম্পরা এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসে। জাগো নিউজ-এর অনুসন্ধানে জানা যায় যে, প্রতারণার শিকার প্রাণ ডেইরিকে উল্টো ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠারও চেষ্টা করা হয়েছে।

যেভাবে প্রতারণার শিকার প্রাণ ডেইরি

সৌদি আরব থেকে ৫১০ মেট্রিক টন প্লাস্টিক রেজিন (প্লাস্টিক দানা) আমদানির জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের জিপিজি মিডিল ইস্ট জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় প্রাণ ডেইরি লিমিটেড। ঘোষণা অনুযায়ী, ২৬ মে আমদানি পণ্যবোঝাই কনটেইনারের চালান চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছালে ওইদিনই চালান খালাসের জন্য নথিপত্র জমা দেয় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রাণ গ্রুপের আরেক সহযোগী প্রতিষ্ঠান প্রাণ বেভারেজ। পণ্য খালাসের লক্ষ্যে ২৭ মে এক কোটি ৪২ লাখ টাকা শুল্কও পরিশোধ করা হয়।

গত ১ জুন পণ্যের শুল্কায়ন পরবর্তী পণ্য খালাসের জন্য আমদানি পণ্যবোঝাই ৩০ কনটেইনারের মধ্যে নয়টি কনটেইনার কায়িক পরীক্ষার জন্য বন্দরের একটি ইয়ার্ডে আনা হয়। এ সময় দুটি কনটেইনার আনলক করা হলে সেখানে প্লাস্টিক দানার পরিবর্তে সিমেন্টের বস্তা দেখতে পাওয়া যায়। তাৎক্ষণিক প্রাণ বেভারেজের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম কাস্টম কর্তৃপক্ষকে জানানো হয় যে, কনটেইনারগুলোতে ভুল পণ্য এসেছে, তারা প্রতারিত হয়েছেন।

প্রাণ বেভারেজ-এর অ্যাসিসট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার মো. সোহরাব হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, প্রাণ ডেইরি’র আমদানি পণ্য নিয়ে চট্টগ্রামে আসা কনটেইনারগুলোতে প্লাস্টিক দানার পরিবর্তে সিমেন্ট পাওয়ার তথ্য আমরাই কাস্টম কর্তৃপক্ষকে প্রথমে জানাই। কারণ, এর মাধ্যমে আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। বর্তমান বাজারে এক কেজি প্লাস্টিক রেজিনের মূল্য যখন ১২০ টাকা, সেখানে প্রতারকরা আমাদের ২০ টাকা কেজি মূল্যের সিমেন্ট পাঠিয়েছে। প্লাস্টিক দানার পরিবর্তে অপেক্ষকৃত কম দামের সিমেন্ট পাঠানোর মধ্য দিয়ে এক বা একাধিক প্রতিষ্ঠান আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।

গত ১ জুন সৌদি আরব থেকে আসা কনটেইনারে প্লাস্টিক দানার পরিবর্তে সিমেন্ট পাওয়ার বিষয়টি প্রাণ ডেইরি’র পক্ষ থেকেই প্রথম চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে জানানো হয় বলে জাগো নিউজের কাছে স্বীকার করেন চট্টগ্রাম কাস্টমের যুগ্ম কমিশনার সাধন কুমার কুন্ডু।

সংবাদ মাধ্যমের মিথ্যাচার

সৌদি আরব থেকে আসা কনটেইনারে প্লাস্টিক দানার পরিবর্তে সিমেন্ট পাওয়ার বিষয়টি গত ১ জুনের ঘটনা হলেও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তা প্রকাশিত হয় ঘটনার প্রায় ১০ দিন পর অর্থাৎ ১১ জুন।

সংবাদ মাধ্যমগুলো চট্টগ্রাম কাস্টম কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানায় যে, গত ৬ জুন রাতে তারা (প্রাণ গ্রুপ) কনটেইনার খালাসের চেষ্টা করে। অথচ জাগো নিউজের নিজস্ব অনুসন্ধানে জানা যায়, ৬ জুন নয়, মূলত শুল্কায়ন পরবর্তী পণ্য খালাসের জন্য সময় নির্ধারিত হয় ১ জুন। ওইদিন ছিল কাস্টম হলিডে। তাই প্রাণ ডেইরিকে প্রাথমিকভাবে নয়টি কনটেইনারের পণ্য পরীক্ষার জন্য অনুমতি দেয়া হলেও সে সময় কাস্টম কর্তৃপক্ষের পক্ষে কোনো কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। ওইদিনই প্রাণ ডেইরি’র আমদানি পণ্যবোঝাই নয়টি কনটেইনার কায়িক পরীক্ষার জন্য বন্দরের একটি পয়েন্টে আনা হয়। প্রাথমিকভাবে দুটি কনটেইনার আনলক করা হলে সেখানে প্লাস্টিক দানার পরিবর্তে সিমেন্টের বস্তা দেখতে পাওয়া যায়। পরবর্তীতে বস্তার ভেতরে মাটিজাতীয় সিমেন্টের অস্তিত্ব মেলে। তাৎক্ষণিক প্রাণ বেভারেজ-এর পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম কাস্টম কর্তৃপক্ষকে জানানো হয় যে, কনটেইনারগুলোতে ভুল পণ্য এসেছে।

এ বিষয়ে প্রাণ বেভারেজ-এর অ্যাসিসট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার মো. সোহরাব হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ওইদিন (১ জুন) কনটেইনারগুলো খোলার অনুমতি দেয়ার পর কাস্টমের পক্ষ থেকে আমাদের জানানো হয়েছিল যে, তারা পরে এসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখে যাবেন। কিন্তু পরীক্ষার জন্য আনা নয়টি কনটেইনারের প্রথম দুটিতে আমরা সিমেন্টের বস্তা পাই, পরে আরও পাঁচটি কনটেইনার পরীক্ষা করে আমরা একই ধরনের পণ্য পাই। এ অবস্থায় আমরা কাস্টম কর্তৃপক্ষকে ডেলিভারি কার্যক্রম স্থগিত রাখাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাই। পণ্যগুলো সঙ্গে সঙ্গে কাস্টম কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরও করা হয়। এ কারণে গত ৬ জুন ‘প্রাণ পণ্য খালাসের চেষ্টা করেছে’ বলে যে সংবাদ প্রচার হচ্ছে, তা ডাহা মিথ্যা ছাড়া আর কিছু নয়। এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজ আমাদের কাছে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ১ জুনই প্রাণ বেভারেজ-এর পক্ষ থেকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জিপিজি মিডিল ইস্ট জেনারেল ট্রেডিং কোম্পনি, শিপিংলাইন, চট্টগ্রাম কাস্টম কর্তৃপক্ষ, বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগকে বিষয়টি লিখিতভাবে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয়

এছাড়া সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এলসির পেমেন্ট বাতিলের জন্য গত ৩ জুন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংককে অনুরোধও করা হয়। অথচ ঘটনার ১০ দিন পর অর্থাৎ ১১ জুন থেকে কাস্টম কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে আমাদের দোষী করে সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে।

কী বলছে চট্টগ্রাম কাস্টম

প্লাস্টিক দানার পরিবর্তে কনটেইনারে সিমেন্ট পাওয়ার ঘটনায় শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ এনে প্রাণ ডেইরি লিমিটেডের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করেছে কাস্টম কর্তৃপক্ষ। গতকাল বুধবার (১২ জুন) চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী শুল্ক কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান সজীব বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও প্রাণ ডেইরির বিরুদ্ধে কেন এ মামলা? এ বিষয়ে জাগো নিউজের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয় চট্টগ্রাম কাস্টমের যুগ্ম কমিশনার সাধন কুমার কুন্ডুর কাছে।

যুগ্ম কমিশনার সাধন কুমার কুন্ডু এ প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘বিদেশ থেকে আমদানির জন্য ঘোষিত পণ্যের বদলে ভিন্ন কোনো পণ্য যদি কনটেইনারে পাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে মামলা হবে, এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সৌদি আরব থেকে আসা ৩০টি কনটেইনার খুলে সবগুলোতেই সৌদি আরবের জেবল আলি ব্র্যান্ডের সিমেন্ট পাওয়া গেছে। এর মানে কিন্তু প্রাণ ডেইরি দোষী বা নির্দোষ, তা প্রমাণ করে না। তারা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দ্বারা প্রতারিতও হতে পারেন।’

তিনি বলেন, ‘কাস্টম তাদের নিয়ম অনুযায়ী মামলা করেছে। অভিযোগের বিষয়ে শুনানি হবে, যাচাই-বাছাই হবে; এরপরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পণ্যের প্যাকেটে সিমেন্ট লেখা থাকলেও এর রাসায়নিক পরীক্ষা হবে। সিমেন্ট হলে সেখানে ওভার কিংবা আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’

‘এ ঘটনায় প্রাণ ডেইরি একদিক দিয়ে এগিয়ে আছে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তারা (প্রাণ ডেইরি) ঘটনার পরপরই বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছে এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে অর্থ পরিশোধ থেকে বিরত থেকেছে। এছাড়া এ ধরনের ঘটনায় আমরা সাধারণত বিভিন্ন দিকের চাপে থাকি, কিন্তু প্রাণের পক্ষ থেকে আমাদের সঙ্গে সে ধরনের কোনো আচরণ করা হয়নি। তা-ই বিষয়টি এখনও তাদের ফেভারে (পক্ষে) আছে।’

‘তারা যদি সত্যিই নির্দোষ হন, তবে চিন্তার কোনো বিষয় নেই। তবে দোষী হলে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে’- বলেন সাধন কুমার কুন্ডু।

আবু আজাদ/এমএআর/পিআর