ঐতিহ্যের রঙে, আভিজাত্যের ছোঁয়ায় সাশ্রয়ী ঈদ পোশাকের আয়োজন
ফ্যাশন জগৎ প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। মানুষের রুচি, পছন্দ ও জীবনধারা পরিবর্তিত হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের ঐতিহ্য, ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা, আবহাওয়া ও ঋতুভিত্তিক চাহিদা এবং স্বাচ্ছন্দ্য গুরুত্ব দিয়েই এবারের ঈদ আয়োজন আমাদের ক্রেতাদের জন্য।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার নিখুঁত সমন্বয়ে গড়া নতুন কালেকশন নিয়ে কথা বলেছেন ‘সারা লাইফস্টাইল’র পরিচালক শরীফুন রেবা। সাক্ষাৎকারে তিনি তুলে ধরেছেন বর্তমান বাজার বাস্তবতা, ক্রেতাদের রুচির পরিবর্তন এবং ঈদ সামনে রেখে ব্র্যান্ডটির বিশেষ প্রস্তুতির কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের বিশেষ প্রতিনিধি ইব্রাহীম হুসাইন অভি।
জাগো নিউজ: ফ্যাশন ব্র্যান্ডের জন্য ঈদুল ফিতর কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
শরীফুন রেবা: শুধু সারা লাইফস্টাইলের জন্য নয়, সব ফ্যাশন ব্র্যান্ডের জন্য ঈদুল ফিতর বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। বাংলাদেশের ফ্যাশন খাতে ঈদ ঘিরেই সাধারণত বার্ষিক বিক্রির প্রায় ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়, যা আমাদের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ক্রেতাদের ক্রয় প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এ সময় বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং নতুন ও পুরোনো ক্রেতাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। এটি শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যের প্রতিফলন নয়; বরং ব্র্যান্ডের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা ও ভালোবাসারও বড় প্রমাণ। ২০১৮ সালে যাত্রা শুরুর পর গত আট বছরে আমরা দেখেছি, ঈদ আমাদের বিকাশ ও গ্রাহক সম্পর্ক আরও শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।
জাগো নিউজ: এ বছরের ঈদ সামনে রেখে বাজারে কী ধরনের প্রবণতা (ট্রেন্ড) লক্ষ্য করছেন?
শরীফুন রেবা: ২০২৬ সালের ঈদ সামনে রেখে দেশের ফ্যাশন বাজারে আরাম, আভিজাত্য এবং চিরকালীন নকশার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। নরম ও আরামদায়ক কাপড়—যেমন সুতি, লিনেন ও রেশম—এখন বেশি জনপ্রিয়। ভারী কাজের বদলে হালকা সূচিশিল্প, মৃদু ঝিলিক এবং ঢিলেঢালা গড়নের পোশাকের চাহিদা বাড়ছে।
এ থেকে বোঝা যায়, ক্রেতারা এখন এমন পোশাক চান যা আরামদায়ক, সহজে পরিধানযোগ্য এবং দীর্ঘদিন ব্যবহার উপযোগী। দৈনন্দিন ব্যবহার ও স্থায়িত্ব—এই দুটি বিষয় এখন তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এ পরিবর্তিত চাহিদা সারা লাইফস্টাইলের জন্য নতুন ও বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
আরও পড়ুন
দর্জি দোকানে ভিড়, মজুরি বেড়ে দ্বিগুণ
নতুন পোশাকে সেজেছে মিরপুরের শপিংমল, ভিড় এড়াতে আগেই কেনাকাটা
নিউমার্কেটে ঈদ কেনাকাটায় বাড়ছে ভিড়, আশাবাদী বিক্রেতারা
জাগো নিউজ: ভোক্তাদের ক্রয় আচরণে কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন?
শরীফুন রেবা: ২০২৫ সালের তুলনায় এ বছর ক্রেতারা আরও সচেতন, পরিকল্পিত এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে সংযত হয়েছেন। তারা এখন পোশাক কেনার সময় গুণগত মান, পরিবেশবান্ধব উপাদান, বহুমুখী ব্যবহারযোগ্যতা এবং দীর্ঘস্থায়িত্বকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
অর্থনৈতিক চাপ এবং সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার প্রভাবে মানুষ এখন তাৎক্ষণিক আবেগের বশে কেনাকাটা না করে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। প্রয়োজন, ব্যবহার এবং টেকসই মান—এই বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
এ পরিবর্তন আমাদের নকশা-দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে গুণগত মান ও দীর্ঘস্থায়িত্ব সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে আমাদের পুরোনো ক্রেতাদের একটি বড় অংশ নিয়মিতভাবে ফিরে আসছেন এবং ব্র্যান্ডের প্রতি তাদের আস্থাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জাগো নিউজ: অর্থনৈতিক চাপের কারণে কি ক্রেতারা আরও বেশি মূল্য-সংবেদনশীল হয়ে উঠছেন?
শরীফুন রেবা: হ্যাঁ, বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ক্রেতারা আগের তুলনায় দামের বিষয়ে আরও সংবেদনশীল হয়েছেন। তবে তারা কেবল কম দাম নয়; বরং ন্যায্যমূল্যে উন্নত মানের পোশাককেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। অর্থাৎ সুলভ মূল্যের সঙ্গে মানের সমন্বয় থাকলেই তারা সেটিকে অধিক মূল্যবান বলে মনে করছেন।
এ প্রবণতা আমাদের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য একদিকে চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে মানের প্রতি আরও দৃঢ় থাকার প্রেরণা। গত ঈদের বিক্রিতে আমরা এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখেছি।
জাগো নিউজ: ক্রেতাদের অভিযোগ পণ্যের মূল্য বেশি। আপনারা কীভাবে গুণগত মান ও সাশ্রয়ী মূল্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখছেন?
শরীফুন রেবা: আমরা কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে দক্ষ পরিকল্পনা, সুসংগঠিত সরবরাহব্যবস্থা এবং উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পণ্যের মান নিশ্চিত করছি। পাশাপাশি কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুসরণ করা হচ্ছে।
ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিভিন্ন দামের স্তরে পণ্য রাখা হয়েছে, যাতে দুই হাজার টাকা থেকে শুরু করে দশ হাজার টাকার ঊর্ধ্বমূল্যের পোশাকও পাওয়া যায়। এতে বিভিন্ন শ্রেণির ক্রেতারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী পছন্দ করতে পারেন।
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও আমরা ক্রেতাবান্ধব মূল্যনীতিতে অটল রয়েছি। বিভিন্ন দামের স্তরে পণ্য রাখার মাধ্যমে সব শ্রেণির ক্রেতাদের জন্য বিকল্প নিশ্চিত করা হয়েছে, যাতে কেউ ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হন।

জাগো নিউজ: এ বছর ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কী ধরনের বিশেষ সংগ্রহ বাজারে এনেছেন?
শরীফুন রেবা: ২০২৬ সালের ঈদ উপলক্ষে আমরা পূর্ণাঙ্গ একটি সংগ্রহ উন্মোচন করেছি। এতে রয়েছে পুরুষদের পাঞ্জাবি, নারীদের ঐতিহ্যবাহী থ্রি-পিস, শাড়ি, লন কাপড়, সেলাইবিহীন লন, উৎসবের পোশাক ও কুর্তি।
পাশাপাশি পারিবারিক সেট, মা-মেয়ের মিল পোশাক এবং বিশেষ ‘অ্যাসপায়ার’ পাঞ্জাবি ধারা সংযোজন করা হয়েছে। এসব সংগ্রহ ক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আমাদের এবারের আয়োজন ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সুষম সমন্বয়।
জাগো নিউজ: ঈদ ডিজাইনের মূল ভাবনা বা অনুপ্রেরণা কী?
শরীফুন রেবা: আমাদের এবারের মূল ভাবনা এলিগ্যান্ট সিমপ্লিসিটি —‘সৌম্য সরলতা’। ঐতিহ্যের সৌন্দর্য আধুনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। হালকা সূচিকর্ম, পরিমিত নকশা, সূক্ষ্ম লেইসের কাজ এবং রুচিশীল রঙের ব্যবহারে পোশাকগুলো সাজানো হয়েছে।
এই অনুপ্রেরণা আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্য সম্মান জানায়, ক্রেতাদের সঙ্গে আবেগের বন্ধন তৈরি করে এবং প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা আরও উন্নত করে।

জাগো নিউজ: আপনাদের মূল ফোকাস কোন বিভাগ—পুরুষ, নারী, শিশু, নাকি পারিবারিক সংগ্রহ?
শরীফুন রেবা: আমরা সব বিভাগের প্রতি সমান গুরুত্ব দিচ্ছি। তবে পারিবারিক সংগ্রহে বিশেষ মনোযোগ রয়েছে। কারণ ঈদ মানেই পরিবারের মিলন ও একসঙ্গে উদ্যাপন।
পারিবারিক সেট এবং মা-মেয়ের মিল পোশাকের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এটি মিলপোশাকের চলমান প্রবণতার প্রতিফলন। আমাদের মোট বিক্রির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এ বিভাগ থেকেই আসে, যা প্রতিষ্ঠানকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলেছে।
জাগো নিউজ: ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক ধারার সমন্বয়ে কোনো সংমিশ্রিত পোশাক কি এনেছেন?
শরীফুন রেবা: হ্যাঁ, সংমিশ্রিত নকশায় আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। ঐতিহ্যবাহী কাট, নকশা ও সূচিকর্মের সঙ্গে আধুনিক ঢঙের গড়নের সমন্বয় করা হয়েছে। যেমন—আনারকলি ধাঁচের পাশখোলা সেট বা লম্বা রেশমি কুর্তি।
এ ধরনের পোশাক তরুণ প্রজন্মের রুচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সংগ্রহে বৈচিত্র্য আনে এবং বাজারে আমাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে।
আরও পড়ুন
অনলাইন কেনাকাটায় যা মনে রাখা উচিত
ঈদ ঘিরে কেরানীগঞ্জে পাইকারি কাপড় বাজারে ভিড়
জমজমাট ঈদের পাইকারি বাজার, খুচরা ব্যবসায়ীদের যা জানা জরুরি
জাগো নিউজ: ঈদ সংগ্রহে কোন রঙের প্রবণতা প্রাধান্য পাচ্ছে?
শরীফুন রেবা: ২০২৬ সালের ঈদে কোমল নীল, হালকা সবুজের মতো প্যাস্টেল রং; অফ-হোয়াইট, বেইজ ও ধূসর নিরপেক্ষ রং; মাটির আভাযুক্ত রং এবং সাদা, কালো, মেরুন ও গাঢ় নীলের মতো চিরায়ত রং প্রাধান্য পাচ্ছে।
এই রংগুলো আরাম ও আভিজাত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বসন্তকালের ঈদের আবহের জন্য উপযোগী। একই সঙ্গে এগুলো ক্রেতাদের পছন্দের প্রতিফলন।

জাগো নিউজ: ক্রেতাদের জন্য কোনো বিশেষ ছাড় বা প্যাকেজ সুবিধা দিচ্ছেন?
শরীফুন রেবা: হ্যাঁ, ডিজিটাল মাধ্যমে মূল্য পরিশোধে বিশেষ ছাড়, নির্দিষ্ট পণ্যে মূল্যছাড় এবং পারিবারিক প্যাকেজ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, যাতে একসঙ্গে কেনাকাটা আরও সাশ্রয়ী হয়।
আগাম অর্ডারে অতিরিক্ত সুবিধাও রাখা হয়েছে। এসব উদ্যোগ পরিবারগুলোর ঈদ উদ্যাপনকে আরও আনন্দময় করে এবং ক্রেতাদের আস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে সুদৃঢ় করে।
জাগো নিউজ: ঈদ বিক্রয় কৌশলে অনলাইন বাণিজ্য কী ভূমিকা রাখছে? সরাসরি বিক্রয়কেন্দ্রের তুলনায় অনলাইন বিক্রি কি বাড়ছে?
শরীফুন রেবা: ই-কমার্স তথা অনলাইন বাণিজ্য এখন আমাদের বিক্রয় কৌশলের অন্যতম প্রধান অংশ। আগাম অর্ডার গ্রহণ, দ্রুত সরবরাহ, সহজে পণ্য ফেরত সুবিধা এবং দেশের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থার মাধ্যমে এটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সরাসরি বিক্রয়কেন্দ্রের তুলনায় অনলাইন বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত কয়েক বছরে অনলাইন বিক্রি ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি আমাদের ডিজিটাল সম্প্রসারণের স্পষ্ট সাফল্য এবং বিশেষ করে তরুণ ক্রেতাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের বিস্তার বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।
আইএইচও/এমএমএআর/এমএফএ