কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যেই উপকূল বিনির্মাণে ৬২ যানবাহনের আবদার

মফিজুল সাদিক
মফিজুল সাদিক মফিজুল সাদিক , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৩৭ এএম, ০৬ আগস্ট ২০২২

আন্তর্জাতিক বাজারে নানামুখী অস্থিরতার কারণে ডলার সংকটে দেশ। এই সংকট উত্তরণে কৃচ্ছ্রসাধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বন্ধ করা হয়েছে কম জরুরি বিদেশ ভ্রমণ। গাড়ি কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোর। এ অবস্থার মধ্যেও এক প্রকল্পেই আবদার করা হয়েছে ৬২টি যানবাহন কেনার। এর মধ্যে রয়েছে কোটি টাকার বিলাসবহুল জিপও। রয়েছে উচ্চমূল্যের মোটরসাইকেল। এই ৬২ যানবাহন কিনতে ব্যয় হবে ৩১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এছাড়া ওই প্রকল্পে পরামর্শক খাতে চাওয়া হয়েছে ১৪৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা।

‘উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহিষ্ণু’ প্রকল্পের আওতায় এমন প্রস্তাব করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ও উপকূলীয় ২২টি পৌরসভা। প্রকল্পে মোট ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ২ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হবে ৫১৬ কোটি টাকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ঋণ নেওয়া হচ্ছে ২১৫০ কোটি টাকা। কনসেনশনাল লোন ১ হাজার ২৯০ কোটি এবং রেগুলার লোন ৮২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এছাড়া প্রকল্পে এডিবি অনুদান দেবে ৩৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে জুলাই ২০২২ থেকে জুন ২০২৯ পর্যন্ত।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের আওতায় সাতটি জিপের আবদার করা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ কোটি টাকা। ফলে প্রতিটি জিপের দাম পড়বে এক কোটি করে। ২৯টি ডাবল কেবিন পিকআপ চাওয়া হয়েছে। যার প্রতিটির দাম পড়বে প্রায় ৭৭ লাখ টাকা। এছাড়া ২৪টি মোটরসাইকেল কেনার কথা বলা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। ফলে প্রতিটি মোটরসাইকেলের দাম পড়বে ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। দুটি মাইক্রোবাস কেনার কথা বলা হয়েছে, যাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

ওই প্রকল্পে পরামর্শক খাতে ১৪৩ কোটি ৪১ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। মোট পরামর্শক সংখ্যা ৪ হাজার ৫৪৪ জনমাস।

প্রকল্পের এসব ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় যানবাহনের সংখ্যা ও পরামর্শক ব্যয় কমানো হবে। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দিয়েছে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মামুন আল রশীদ জাগো নিউজকে বলেন, এখন আমাদের সব ক্ষেত্রেই খরচ কমাতে হবে। তারপরও এটা ঋণের টাকায় বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। সুতরাং সবকিছু বিবেচনা করে খরচ করতে হবে। একটি প্রকল্পের আওতায় এত যানবাহন থাকার কথা নয়। এটা কমিয়ে ফেলবো। পিইসি সভায় বিষয়গুলো তুলে ধরবো। পরামর্শকখাতে এত ব্যয় রাখা সম্ভব হবে না। যাচাই করা করে দেখবো কতটা কমানো যায়।

তিনি আরও বলেন, এক প্রকল্পে এতগুলো গাড়ি কী হবে, এটা কতটা দরকার তাও দেখবো। অবকাঠামো খাতে খরচ সঠিকভাবে দেবো। কিন্তু বিদেশ ভ্রমণ, যানবাহন কেনাকাটা ও পরামর্শকখাতের খরচ কমাবো। এগুলো ন্যূনতম যতটুকু দেওয়া যায় তাই দেবো।

এগুলো ছাড়াও প্রস্তাবিত প্রকল্পে নানা ধরনের অসঙ্গতি পেয়েছে কমিশন।

জানা যায়, প্রকল্পে ২১টি মাল্টিপারপাস মার্কেট নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো নকশা প্রকল্পে নেই। চারটি বাস টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে বাস টার্মিনাল নির্মাণের স্থান নির্বাচনের ভিত্তি ও নকশা নেই। প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনায় পণ্যের জন্য ১৫টি, সেবার জন্য ৪টি এবং কার্যের জন্য ২০৫টি অর্থাৎ মোট ২২৪টি প্যাকেজ প্রস্তাব করা হয়েছে, যা অত্যধিক।

প্রকল্পটিতে বিভিন্ন পদে মোট ২৫২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ডেপুটেশন ও আউটসোর্সিংয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ ডিপিপিতে সংযুক্ত নেই। প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ প্রস্তাব করা হয়েছে জুলাই ২০২২ থেকে জুন ২০২৯ পর্যন্ত, প্রায় সাত বছর। সময় কমিয়ে তিন বছরের মধ্যে আনার পরামর্শ দিয়েছে কমিশন।

প্রকল্পের আওতায় ৬৬ একর ভূমি অধিগ্রহণ, ২৯৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ, ৯২০ মিটার ব্রিজ নির্মাণ, ১৪০ কিলোমিটার ড্রেনেজ কাজ, ২৩টি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ, ২২টি বস্তি উন্নয়ন, চারটি বাস টার্মিনাল ও দুটি গ্রিন স্পেস নির্মাণ করা হবে।

বরগুনার পাথরঘাটা, বেতাগী, বরিশালের বানারীপাড়া, বাকেরগঞ্জ, মেহেন্দিগঞ্জ, মুলাদী, গৌরনদী, পটুয়াখালীর কুয়াকাটা, পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি, ঝালকাঠি ও নলছিটি, ভোলার লালমোহন, চরফ্যাশন ও বোরহানউদ্দিন পৌরসভায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়াও বাগেরহাটের বাগেরহাট, মোড়েলগঞ্জ; খুলনার চালনা, পাইকগাছা, সাতক্ষীরার কলারোয়া, শরীতয়তপুরের জাজিরা ও ভেদরগঞ্জ পৌরসভা রয়েছে প্রকল্পের আওতায়।

প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় শহরসমূহের জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীলতা শক্তিশালী করা হবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন করা হবে নারী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান। উপকূলীয় ১৯টি জেলার মধ্য ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ১১টি জেলাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মোট ৪৩টি পৌরসভার উন্নয়ন করা হবে। অগ্রাধিকারভিত্তিতে ২২টি পৌরসভাকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

এমওএস/এমএইচআর/এএসএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]