ফাঁকা শিক্ষাভবন, ‘বদলি আতঙ্কে’ নতুন এমপিদের কাছে দৌড়ঝাঁপ
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রধান কার্যালয়টি শিক্ষাভবন নামে পরিচিতি। শিক্ষাপ্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র এ ভবনের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে অফিস করেন একজন সহকারী পরিচালক। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে কক্ষটি তালাবদ্ধ দেখা যায়।
মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে ওই কর্মকর্তা জাগো নিউজকে জানান, তিনি শাহবাগে ফুল কিনতে গেছেন। এলাকার নতুন এমপি শপথ নিতে ঢাকায় এসেছেন। তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন, শুভেচ্ছা জানাবেন।
অফিস রেখে নবনির্বাচিত এমপির জন্য ফুল কেনার এ তোড়জোড় কেন—এমন প্রশ্নে তার স্পষ্ট জবাব, ‘পদ তো টিকিয়ে রাখতে হবে ভাই! এমপি ঠিক থাকলে তো পরে মন্ত্রীকেও (শিক্ষামন্ত্রী) ম্যানেজ করা যাবে!’

শুধু মাউশির এ কর্মকর্তা নন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সব দপ্তর-অধিদপ্তরে এখন একই চিত্র। বদলি আতঙ্কে দিন কাটছে কর্মকর্তাদের। কেউ কেউ রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করার চেষ্টায় ব্যস্ত। সবার উদ্দেশ্য ‘লাভজনক’ বিবেচিত মাউশির পদ টিকিয়ে রাখা।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে শিক্ষাপ্রশাসনে চেইন অব কমান্ড ছিল না। ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। লাগামছাড়া দুর্নীতিতে যে, যেমন পেরেছেন দুই হাতে আয় করেছেন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকার এসে মাউশিতে আমূল পরিবর্তন আনবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।-অধ্যাপক কাজী মো. আবু কাইয়ুম শিশির
শিক্ষা ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তার চাকরির বয়স শেষ দিকে। এখন প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে তাদের বদলি করা হলে তা ‘অপমানজনক’ হবে মনে করছেন তারা। এজন্য যে কোনো মাধ্যমে তদবির করে টিকে থাকার পথ খুঁজছেন জ্যেষ্ঠ অনেক কর্মকর্তা।
ফাঁকা শিক্ষাভবন, তদবিরে ব্যস্ত কর্মকর্তারা
নির্বাচনের ছুটির পর রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) ছিল প্রথম কর্মদিবস। এদিন সকালে শিক্ষাভবনে গিয়ে দেখা যায়, দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে সেবাপ্রত্যাশী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আনাগোনা। কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। দপ্তরের বিভিন্ন শাখায় কর্মকর্তাদের চেয়ার ফাঁকা। কর্মচারীদেরও উপস্থিতিও কম।
আরও পড়ুন
পুরো রমজানে মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশ হাইকোর্টের
রমজানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছুটি নিয়ে ‘ধোঁয়াশা’
নিয়োগ-পদোন্নতি ‘গণহারে’, শিক্ষার সংস্কারে ছিল না আগ্রহ!
কয়েকজন কর্মচারী জানান, নতুন সরকার আসার আগেই সবার মধ্যে বদলি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। চেয়ার ও পদায়ন ঠিক রাখতে সদ্য নির্বাচিত বিভিন্ন সংসদ সদস্যের বাড়িতে ছুটছেন তারা। বিএনপিপন্থি শিক্ষকরা কে, কোন পদে বসবেন, কাকে বাদ দেওয়া হবে, তা নিয়ে তালিকা তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। সবমিলিয়ে সবাই আতঙ্কিত।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার, এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও রাজনৈতিক মতাদর্শ দেখে উপাচার্য বা গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন দেওয়া হয়েছে বলে জোর অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের কাজ হলো যোগ্য লোককে খুঁজে বের করা। নতুন সরকারের কাছে আহ্বান থাকবে যেন যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন করা হয়। দলীয় ভিত্তিতে পদায়ন করলে হিতে-বিপরীত হতে পারে।-ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ
শিক্ষাভবনের দ্বিতীয় তলায় পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। দপ্তরের উপ-পরিচালকের কক্ষে দুজনকে দেখা গেলেও তারা ব্যস্ত সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সকালের পরিকল্পনা নিয়ে।
পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডিআইএ ভালো জায়গা। এখানে আসার জন্য সবাই মরিয়া। নতুন সরকার এলে এখানে সব রদবদল করা হবে শুনছি। এখন বাধ্য হয়ে টিকে থাকার জন্য চেষ্টা করছি। পলিটিক্যাল যে কানেকশন রয়েছে, সেখানে যোগাযোগ রাখতে হচ্ছে। তারপরও যদি বদলি করে দেয়, তাহলে তো কিছু করার নেই।’

দুপুরে দুই দফা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ে গিয়েও তাকে অফিসে পাওয়া যায়নি। তার দপ্তরের কর্মচারীরা জানান, স্যার বেরিয়ে গেছেন। কিন্তু কোথায় গেছেন, তা জানেন না। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। এদিন দুই তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কক্ষে গিয়েও তাদের পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে তারা জানান, বিশেষ কাজে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আছেন।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি নিজেও জাতীয়তাবাদী আদর্শের লোক। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দায়িত্ব পাওয়ায় এখন কেউ বিশ্বাস করতে চাইছে না। অনেকে আমাকে জামায়াত বানিয়ে দিচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে যা মনে হচ্ছে, আমাকে দ্রুত সরিয়ে দেওয়া হবে। আমি মানসিকভাবে বদলির প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।’
মাউশির ডিজিসহ আমূল পরিবর্তন দাবি
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শিক্ষাপ্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বারবার রদবদল করা হয়েছে। দেড় বছরে শুধু মাউশির মহাপরিচালক (ডিজি) পদে চারবার পরিবর্তন আনা হয়। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), ব্যানবেইস, নায়েম, মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় নতুন কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে— বিএনপির চেয়ে জামায়াতপন্থি কর্মকর্তারা শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন পদে বেশি জায়গা পেয়েছেন। এমনকি আওয়ামী লীগের আমলে সুবিধাভোগী এবং জুলাই আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থানে থাকা আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তারাও ব্যাপকভাবে পদায়ন পেয়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপিপন্থি কর্মকর্তারা মাউশিতে আমূল পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন।

বিসিএস ১৪তম ব্যাচের শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা অধ্যাপক কাজী মো. আবু কাইয়ুম শিশির। তিনি বর্তমানে মাউশির মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন বিভাগের পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
রোববার দুপুরে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে শিক্ষাপ্রশাসনে চেইন অব কমান্ড ছিল না। ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। লাগামছাড়া দুর্নীতিতে যে, যেমন পেরেছেন দুই হাতে আয় করেছেন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকার এসে মাউশিতে আমূল পরিবর্তন আনবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি। তা না করা হলে শিক্ষাপ্রশাসন গতিশীল হবে না।’
শিক্ষাপ্রশাসন স্থিতিশীল রাখতে যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন করার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘শিক্ষায় রাজনৈতিক প্রভাব চললে পুরো খাতই বাধাগ্রস্ত হয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার, এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও রাজনৈতিক মতাদর্শ দেখে উপাচার্য বা গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন দেওয়া হয়েছে বলে জোর অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের কাজ হলো যোগ্য লোককে খুঁজে বের করা। নতুন সরকারের কাছে আহ্বান থাকবে যেন যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন করা হয়। দলীয় ভিত্তিতে পদায়ন করলে হিতে-বিপরীত হতে পারে।’
এএএইচ/এএসএ