অসন্তোষে ৯ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী

মুরাদ হুসাইন
মুরাদ হুসাইন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৩৬ এএম, ২০ জানুয়ারি ২০১৮ | আপডেট: ১২:০৯ পিএম, ২০ জানুয়ারি ২০১৮

প্রাথমিক থেকে কলেজ পর্যায়ে শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। বৈষম্য দূরীকরণের দাবিতে প্রায় সব স্তরের শিক্ষকরা ফুঁসে উঠছেন। এ কারণে গত কয়েক মাস ধরেই তারা কঠোর আন্দোলনে নেমেছেন। অনেকে আবার নতুনভাবে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কোন স্তরের শিক্ষকরা কঠিন আন্দোলনে নেমে শুধু দাবি পূরণের আশ্বাস নিয়ে ক্লাসে ফিরে গেছেন।

শিক্ষকদের অসন্তোষের মূলে রয়েছে অতিমাত্রায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও বহুমাত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠা। এ কারণে শিক্ষকদের মধ্যে নানা ধরনের স্তর ও বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী শিক্ষকদের মর্যাদা দেয়া হলেই অসন্তোষ কমে যাবে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা।

সারাদেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজসহ প্রায় ২৬টি সংগঠনের ৯ লাখের মতো শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে এক ধরনের অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এদের কেউ আন্দোলন করছেন অথবা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি রয়েছে। বর্তমান সরকারের আগের মেয়াদে গৃহীত জাতীয় শিক্ষানীতিতে সব শিক্ষকের জন্য পৃথক বেতনকাঠামো করার কথা বলা হলেও তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে। আর সেখান থেকে নানা বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। এর আওতায় শুধু বেসরকারি শিক্ষকই নয়, সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকরাও।

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য ও জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) সাবেক পরিচালক মো. একরামুল করিম জাগো নিউজকে বলেন, শিক্ষকদের আন্দোলনের ফলে শিক্ষা ব্যবস্থা বড় ধরনের হুমকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা আর বহুমাত্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাওয়ায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে শিক্ষকরা যোগ্যতা ও ডিগ্রির ভিত্তিতে সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন না। প্রতিষ্ঠাতারা প্রতিষ্ঠান থেকে নানাভাবে বাণিজ্য করে যাচ্ছেন।

এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে এই শিক্ষাবিদ বলেন, অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের অনুপাতে শিক্ষার্থী কম। সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে। দেশে একমাত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তবেই দেশে মানসম্মত শিক্ষা দেয়া সম্ভব হবে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একই প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে বেতন, সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদার দিক থেকে বড় ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। সহকারী শিক্ষকদের আগের পদ প্রধান শিক্ষক হলেও তিন ধাপে পার্থক্য তৈরি হয়েছে। প্রধান শিক্ষকদের দশম বেতন গ্রেড বাস্তবায়ন হলে আরও এক ধাপ বেড়ে যাবে। এ কারণে প্রাথমিক স্কুলের সহকারী শিক্ষকরা এক জোট হয়ে রাজধানীর শহীদ মিনারে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলেন।
নতুন বছরের শুরুতে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকরা আন্দোলনে নামায় শিক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই আন্দোলন নিয়ে সরকারের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি হয়। অবশেষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাসে শিক্ষকরা আন্দোলন ছেড়ে বাড়ি ফিরে গেলেও তাদের মধ্যে বড় ধরনের ক্ষোভ বিরাজ করছে বলে জানা গেছে।

এমপিওভুক্তির দাবি
প্রাথমিক শিক্ষকরা আন্দোলন ছেড়ে ক্লাসে ফিরলেও দেশের নন-এমপিও স্কুল-কলেজ ও মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারীরা রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এমপিওভুক্তির দাবিতে অবস্থান ধর্মঘট পালন করেন। এরপর তারা আমরণ অনশনের ডাক দেন। টানা ছয়দিন আমরণ অনশন পালনের পর প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে এসব শিক্ষক বাড়ি ফিরে যান। শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতিসত্বর শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি করা না হলে তারা আবারও আন্দোলনে নামবেন। সারাদেশে নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৫ হাজার ২৪২টি। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ৭৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার।

জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১০ সালে ১ হাজার ৬২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়। এরপর থেকে এমপিওভুক্তি বন্ধ রয়েছে। সরকারি দলের সাংসদদের অনেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি চান। কিন্তু অপরিকল্পিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠায় এবং বছরের পর বছর রাজনৈতিক কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করায় শিক্ষা বাজেটের ওপর চাপ পড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, এমপিওভুক্তি হতে হবে প্রয়োজনের ভিত্তিতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়। যদি সরকার চাপে পড়ে এমপিওভুক্ত করে তবে যোগ্য ব্যক্তিরা এমপিওভুক্তি থেকে বঞ্চিত হবেন। সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ভালোমানের শিক্ষা পাওয়ার আশা করা যাবে না।

জাতীয়করণের দাবি
পহেলা জানুয়ারি থেকে জাতীয়করণের দাবিতে শুরু হয় স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষকদের আন্দোলন। টানা নয় দিন অবস্থান ধর্মঘট পালনের পর আট দিন আমরণ অনশন পালন করেন। শিক্ষামন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদসারা বিভাগের প্রতিমন্ত্রী কাজী কেরামত আলীর প্রতিনিধি হিসেবে এই মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সোহবার হোসেন জানিয়েছেন, শিক্ষকদের দাবির বিষয়টি বিশেষভাবে দেখা হবে। এই আশ্বাসে অনশন ভাঙেন শিক্ষকরা।

বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষক সমিতির সভাপতি কারী রুহুল আমীন জাগো নিউজকে বলেন, আমরা সরকারের প্রতি আস্থা রেখে আন্দোলন থেকে সরে এসেছি। তবে আগামী পাক-বাজেটে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসাগুলোকে জাতীয়করণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা না হলে আবারও সকলে এক হয়ে আন্দোলনে নামব।

অন্যদিকে, দেশে মাধ্যমিক থেকে কলেজ পর্যন্ত ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় বেসরকারিভাবে। বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ৩৭ হাজার। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারী প্রায় ৫ লাখ। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে সাড়ে ২৬ হাজার। এগুলোর ৪ লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী সরকার থেকে মূল বেতন ও কিছু ভাতা পান। তাদের এমপিওভুক্ত শিক্ষক বলা হয়। গত ১০ জানুয়ারি থেকে জাতীয়করণের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করছেন এমপিভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। প্রথমে অবস্থান ধর্মঘট ও গত চার দিন ধরে পালিত হচ্ছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আমরণ অনশন। ছয়টি সংগঠন একজোট হয়ে বেসরকারি শিক্ষা লিয়াঁজো ফোরামের নেতৃত্বে চলছে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর আন্দোলন।

এ ফোরামের আহ্বায়ক মো. আব্দুল খালেক জাগো নিউজকে বলেন, দেশের বেশির ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত। অথচ আমাদের জাতীয়করণের আওতাভুক্ত না করে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এটি আমরা মেনে নেব না। এ কারণে বাধ্য হয়ে শীতের মধ্যে রাস্তায় বসে খোলা আকাশের নিচে আমরণ অনশন চালিয়ে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান সব বৈষম্য দূর করার একমাত্র সমাধান শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ। এর মাধ্যমে শুধু শিক্ষকদের দাবিই পূরণ নয়, আপামর জনগণও এর সুফল পাবেন। সর্বস্তরে শিক্ষা ব্যয় কমবে, দেশে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হবে। শিক্ষক-কর্মচারীরা জাতীয়করণের ঘোষণার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলেও তিনি জানান।

ক্ষুব্ধ প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা
দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ৬৩ হাজার ৬০১টি। মোট শিক্ষক প্রায় সোয়া ৩ লাখ। ২০১৪ সালের ৯ মার্চ সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণি ঘোষণা করে। কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল করা হয় ১১তম গ্রেডে। আর প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হয় ১২তম গ্রেড। অন্যদিকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল হয় ১৪তম গ্রেডে এবং প্রশিক্ষণবিহীন সহকারী শিক্ষকদের স্কেল নির্ধারণ হয় ১৫তম গ্রেডে।

তখন থেকেই সহকারী শিক্ষকরা বেতন স্কেল প্রধান শিক্ষকের এক ধাপ নিচে রাখার দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। অন্যদিকে প্রধান শিক্ষকরা বলছেন, তাদের চাকরি দ্বিতীয় শ্রেণি হলেও বেতন স্কেল করা হয়েছে তৃতীয় শ্রেণির। এজন্য তারা দাবি করে আসছেন, বেতন স্কেল এক ধাপ বাড়িয়ে দশম গ্রেড করতে হবে।

সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের দাবি
টাইম স্কেল ও পদোন্নতির দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির ব্যানারে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন তারা। সারাদেশে ৩৩৬টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১০ হাজার শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও আছেন প্রায় ৮ হাজার। শিক্ষকদের দাবি আদায়ে তারা নতুনভাবে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানা গেছে।

কলেজ শিক্ষকদের ক্যাডার ও নন-ক্যাডার আন্দোলন
দেশে ৩৩৫টি সরকারি কলেজ আছে। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যেসব উপজেলায় সরকারি কলেজ নেই সেখানে একটি করে বেসরকারি কলেজকে সরকারি করা হবে। নতুন করে আরও ২৮৩টি বেসরকারি কলেজ জাতীয়করণের জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে। কিন্তু আগে থেকে নীতিমালা ছাড়াই এতগুলো বেসরকারি কলেজকে জাতীয়করণ করায় সংকট তৈরি হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ঘোষিত মানদণ্ড না থাকায় ভালো ও পুরনো কলেজ বাদ দিয়ে যেন-তেন কিছু কলেজ জাতীয়করণের জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে। এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনও হয়েছে।

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সভাপতি আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার জাগো নিউজকে বলেন, জাতীয়করণ হওয়া কলেজের শিক্ষকদের ক্যাডারভুক্ত করার উদ্যোগ তারা মানবেন না। তাদের নন-ক্যাডার রাখতে হবে। এই দাবিতে গত ডিসেম্বর থেকে তারা আন্দোলন করছেন। গত ২৬ ও ২৭ নভেম্বর সারাদেশে কর্মবিরতি পালন করেন তারা।

এমএইচএম/ওআর/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :