বিক্রি কমেছে নীলক্ষেতে

বই-কাগজ-ফটোকপিতে বেড়েছে খরচ, বাড়তি চাপে শিক্ষার্থীরা

আল সাদী ভূঁইয়া
আল সাদী ভূঁইয়া আল সাদী ভূঁইয়া , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:৩৩ পিএম, ২০ ডিসেম্বর ২০২২
নীলক্ষেতের স্টেশনারির দোকান/মাহবুব আলম

গত কয়েক মাসে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় অন্য সবার মতো খাবারের খরচ বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও মেসে থাকা শিক্ষার্থীদের। এর মধ্যে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে বাড়তি সব ধরনের শিক্ষা উপকরণের দাম। এতে মাসিক ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম শিক্ষার্থীরা।

চারুকলা কিংবা গণিতের শিক্ষার্থীরা বলছেন, তারা চর্চা কমিয়েছেন। তুলনামূলক সস্তায় শিক্ষা উপকরণ কিনতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ইডেন, বুয়েটসহ শিক্ষার্থীদের প্রধান ভরসার জায়গা নীলক্ষেত মার্কেট। স্বস্তি নেই সেখানেও। ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের বিক্রিও কমেছে আশঙ্কাজনক হারে।

সরেজমিনে রাজধানীর নীলক্ষেত মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের কাগজের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ৫০ শতাংশের মতো। শিক্ষার্থীরা অ্যাসাইনমেন্টসহ বিভিন্ন কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে এ-৪ সাইজের কাগজ। ৮০ গ্রামের এ কাগজের ৫শ পিসের দাম ছিল আগে ২১০-২৫০ টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৪২০ টাকা। এ সাইজের ১০০ গ্রামের কাগজের প্যাকেটের দাম আগে ছিল ৩২০ টাকা, এখন তা বেড়ে ৫২০ টাকা।

দিস্তা কাগজের দাম ছিল ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা, এখন দাম বেড়ে হয়েছে ৫শ টাকা। বাঁধাই করা ইউনিভার্সিটি খাতার দাম ছিল ৫০ টাকা, এখন বেড়ে হয়েছে ৮০ টাকা। পিন, স্ট্যাপলারের দামও ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কলম ও পেন্সিলের দাম না বাড়লেও বেড়েছে কলমদানির দাম। সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ফাইলের দামও বাড়তি। কাগজের প্যাকেট ও আর্ট কাগজের দামও বেড়েছে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত।

jagonews24

ফটোকপির দোকান ঘুরে দেখা যায়, প্রিন্ট ও ফটোকপির কাগজের দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ভিজিটিং কার্ডের ১০০ পিস কাগজের দাম আগে ছিল ১২শ টাকা। এখন ১৮শ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়েছে। ৮০ গ্রাম রিম কাগজের দাম আগে ছিল ১৬শ টাকা, এখন বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৩শ টাকা। আর্ট পেপার ১০০ গ্রামের দাম আগে ছিল ২ হাজার ৮শ থেকে ৩ হাজার ২শ টাকা, এখন বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৪শ টাকা পর্যন্ত। ফটোকপি কাগজের ৫০শ পিসের একটি প্যাকেটের দাম ছিল ২শ টাকা, এখন বেড়ে ৩শ ৫০ টাকা। ফটোকপির কালির দাম ছিল আগে ৪২০ টাকা, বেড়ে হয়েছে ৬৮০ টাকা।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে এক রিম কাগজ কিনতে খরচ হতো ৩২০ টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৬শ টাকার বেশি। এ-৪ সাইজের কাগজের দাম আগে ছিল ৫০ পয়সা এখন তা বেড়ে হয়েছে ১ টাকা ৫০ পয়সা। নিউজপ্রিন্ট, কার্টিজ পেপার, ব্রাউন পেপার, মাউন্ট বোর্ড, মেটালিক পেপার, হ্যান্ডমেইড পেপার, ফটো পেপার, ক্যালেন্ডার পেপারসহ সব ধরনের দেশি-বিদেশি কাগজের দাম বেড়েছে। প্রতিটি কাগজের দাম খুচরায় বেড়েছে ১০ থেকে ৫০ শতাংশের মতো।

jagonews24

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক্স ডিজাইন বিভাগের শিক্ষার্থী অনিক কর্মকার জাগো নিউজকে বলেন, চারুকলার শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের অনেক চর্চা করতে হয়। আগে একশ টাকায় আমরা ১০টি কাগজ কিনতে পারতাম। এখন ৬-৭টি কাগজ কিনতে পারি। আমাদের সবার আর্থিক অবস্থা খুব ভালো নয়। হিসাব করে চলতে হয়। কাগজের দাম বাড়ায় আমরা কাগজ না কিনে আমাদের চর্চা সীমিত করছি। শিল্পী হিসেবে এটা আমাদের জন্য খুবই নেতিবাচক। এটা সামগ্রিকভাবে আমাদের শিল্পের ওপর প্রভাব পড়বে।

গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী রিজওয়ান ইসলাম হৃদয় বলেন, পরীক্ষার সময় আমাদের দৈনিক দুই থেকে তিন দিস্তা কাগজ লাগে। পুরো পরীক্ষার সময় এক রিমের মতো কাগজ দরকার হয়। এখন তাতে আগের চেয়ে প্রায় ৩শ টাকা বেড়ে গেছে। এদিকে আগে আমাদের খাবারের খরচ ছিল তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা হয়েছে। এত সব মিলিয়ে আমরা খুব বেশি দরকার না হলে চর্চা করি না।

jagonews24

নীলক্ষেতের এন ইসলাম এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার শরীফের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। তিনি বলেন, আগের চেয়ে কাগজের মূল্য অনেক বেশি বাড়ায় আমাদের বিক্রি কমেছে অনেক। নতুন বছর উপলক্ষে কাগজের অনেক চাহিদা থাকায় সামনের এক মাস দাম এমন থাকবে। জানুয়ারির শেষ দিকে দাম কমতে পারে।

ভিজিটিং কার্ড ও পোস্টারের কাজ করেন নীলক্ষেতের রাসেল। তিনি বলেন, ভিজিটিং কার্ড, ক্যালেন্ডার, প্যাড, পোস্টার কাগজের দাম অনেক বেড়েছে। অনেকগুলোর দাম দ্বিগুণ হয়েছে। দাম বাড়ায় চাহিদা কমেছে মার্কেটে। আমাদের কাজের চাপও তেমন নেই এখন।

জাহান ট্রেডার্স নামে এটিক ফটোকপি দোকানের দোকানি ইমরান হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, আগে আমরা দশ পিস ফটোকপি করে নিতাম ১০ থেকে ১৫ টাকা। এখন একই কাজে আমাদের চাওয়া লাগে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। আগে অনেক কাজে মানুষ আমাদের কাছে ফটোকপি করাতে আসতো। এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছাড়া ফটোকপি করাতে তেমন লোকজন আসে না। এই সময়ে অন্য বছর কাজের চাপ থাকলেও এখন আমাদের কাজের তেমন চাপ নেই। দোকানেও ভিড় কম।

তবে কাগজের মূল্যবৃদ্ধি শিক্ষার্থীদের চর্চার ওপর খুব প্রভাব ফেলতে পারে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন। তিনি বলেন, দাম বাড়ায় শিক্ষার্থীদের চর্চা কমে আসার বিষয়টা আমি সত্যি মনে করি না। শিক্ষার্থীরা চাইলেই তাদের কাজগুলো করে যেতে পারেন। কাগজের মূল্যবৃদ্ধি বা সংকট শিক্ষার্থীদের চর্চা বন্ধ করতে পারবে না। দুর্ভিক্ষের সময়ের বিভিন্ন চিত্র সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়েছিল। শিক্ষার্থীরা কাজ করে না তাই তারা কাগজের দাম বাড়ার বিষয়টি বলছে।

এএসএ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।