কোটাব্যবস্থা ‘অন্যায্য’, টিভিতে বলেছিলেন সুমন, জানুন তার আদ্যোপান্ত

বিনোদন ডেস্ক
বিনোদন ডেস্ক বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:০৪ পিএম, ১৭ মার্চ ২০২৬
চলে গেলেন শামস সুমন

পর্দা থেকে রীতিমতো নির্বাসনে চলে গিয়েছিলেন মেধাবী শিল্পী শামস সুমন। বাচিক শিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করা সুমন পরিচিতি পেয়েছিলেন অভিনয়শিল্পী হিসেবে। তবে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় তাকে কাটাতে হয়েছে চাকরি করে! ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলনের সময় চাকরিতে কোটাব্যবস্থাকে ‘অন্যায্য’ বলেছিলেন তিনি।

১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন শামস সুমন। ২০২৪-এর কোটাবিরোধী আন্দোলন নিয়ে সোজাসাপ্টা কথা বলেছিলেন তিনি। চ্যানেল আইয়ে শাহরিয়ার নাজিম জয়ের ‘১৩টি প্রশ্ন’ অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয় শামস সুমনের সর্বশেষ সাক্ষাৎকার। ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই প্রচারিত ওই অনুষ্ঠানে এখনকার তরুণদের নিয়ে সুমন বলেছিলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম এরা ফেসবুক যুগে বসবাস করে, দেশ সম্পর্কে এদের কোনো ধারণা নেই, রাজনীতি সম্পর্কে এদের কোনো ধারণা নেই, দেশের ইতিহাস সম্পর্কে এদের কোনো ধারণা নেই। কিন্তু গত ২০ দিনে আমার সম্পূর্ণ ধারণা বদলে গেছে। এরা দেশ নিয়ে ভাবে, জাতি নিয়ে ভাবে, দেশ ও জাতির ইতিহাস অনেকখানি জানে। সেকারণেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও এই আন্দোলনে শরীক হয়েছে।’

সুমনের রক্তে মিশে ছিল অভিনয়। স্কুলে পড়াকালে রাজশাহী বেতারে অভিনয় শুরু করেন তিনি। একপর্যায়ে যুক্ত হন রেডিওর বড়দের নাটকে। সেখানে করেছেন উপস্থাপনা, সংবাদ পাঠ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে সেখানকার সংগঠন স্বনন-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ঢাকায় আসার পর যুক্ত হন চাকরিতে। একদিন টেলিভিশনে অডিশন দিয়ে শুরু করেন অভিনয়। নব্বইয়ের দশকের টিভি দর্শকদের পরিচিত ও প্রিয়মুখ ছিলেন সুমন। কীভাবে অভিনয়ে এলেন তিনি?

‘অনেক ছোটবেলায় খালা, মা, নানী গোল হয়ে বসে রেডিও শুনতেন। কলকাতার ‘আকাশবানী’র নাটক শুনতেন। আমাকে সেখান থেকে সরিয়ে দিতেন। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের আকর্ষণ থাকে। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে শুনতাম, কী হচ্ছে। সেখানেই প্রথম জগন্নাথ বসু, শাওলী মিত্রের নাম শুনি। একটু বড় হয়ে যখন রেডিও শোনার অধিকার পেলাম, তখন নাটক শোনা শুরু করলাম। দেখলাম একজন মানুষ শুধু কণ্ঠ দিয়ে অভিনয় করে কীভাবে মানুষের মন কাড়তে পারে। শাওলী মিত্রকে তখন মনে হতো কল্পজগতের রানি। ইউনিভার্সিটির শেষ দিকে, ৯২-এর দিকে, যখন তাকে প্রথম সামনে থেকে দেখি, আমি হতাশ হই। কণ্ঠ শুনে তাকে আমার মনে হতো সাদা শাড়ি পরা লম্বা একটা মেয়ে, যার চুল লম্বা, ছেড়ে দেওয়া। আমি যেমন কল্পনা করেছিলাম, তার কোনোটাই মেলেনি। আমি ওনাকে সরাসরি সেকথা বলেছিলামও, আমি আপনার কণ্ঠের প্রেমে পড়ে আছি অনেক বছর।’

কোটাব্যবস্থা ‘অন্যায্য’, টিভিতে বলেছিলেন সুমন, জানুন তার আদ্যোপান্ত

‘অহংকার’, ‘অনুরাগ’, ‘যদি ভালোবাসো’, ‘এইতো আমাদের বাড়ি’, ‘রাতের অতিথি’, ‘অতন্দ্র প্রহর’, ‘খোঁজ’সহ বহু টিভিনাটকে অভিনয় করেছিলেন সুমন। তৎকালীন জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল একুশে টিভিতে আফসানা মিমি পরিচালিত ধারাবাহিক নাটক ‘বন্ধন’-এ অভিনয় করেন তিনি। চলচ্চিত্রে তৌকীর আহমেদের ‘জয়যাত্রা’, বাদল খন্দকারের ‘বিদ্রোহী পদ্মা’, খালিদ মাহমুদ মিঠুর ‘জোনাকির আলো’, নায়করাজ রাজ্জাকের ‘আয়না কাহিনি’, গিতালি হাসানের ‘প্রিয়া তুমি সুখী হও’, পি এ কাজলের ‘চোখের দেখা’, মুশফিকুর রহমান গুলজারের ‘মন জানে না মনের ঠিকানা’ ছবিগুলোতে অভিনয় করেন তিনি। সর্বশেষ ‘মিশন এক্সট্রিম’ ছবিতে একটি ছোট্ট চরিত্রে তাকে দেখা যায়। শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘স্বপ্নপূরণ’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য পার্শ্বচরিত্রের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নেন সুমন। কিন্তু অভিনয় থেকে কেন সরে গেলেন তিনি?

আক্ষেপ নিয়ে সুমন বলেছিলেন, ‘বর্তমানে যে টিভি, ওটিটি ও ইউটিউবকেন্দ্রীক যে নাট্যচর্চা, সেগুলোর সঙ্গে আমি নিজেকে অ্যাডাপ্ট করতে পারছি না। না সংলাপ, না চরিত্র, না কাহিনি, না পোশাকে। এই কারণেই একটু পিছিয়ে আসা। তবে আমি চেষ্টা করছি, কীভাবে ফিরে আসা যায়। ক্যামেরাকে ভুলতে পারবো না। প্রায়ই মনে হয়, আবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়াই।’ এমনকি শিল্পীদের দেশ ছেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গেও তিনি বলেছেন একই কথা, ‘যারা সিস্টেমের সঙ্গে অ্যাডাপ্ট করতে পারছে না, তারা চলে যায়। পাশের দেশে বয়স্ক শিল্পীদের ওপর ভিত্তি করে গল্প হয় ওটিটিতে, আমাদের হয় না...।’

কোটাব্যবস্থা ‘অন্যায্য’, টিভিতে বলেছিলেন সুমন, জানুন তার আদ্যোপান্ত

শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন সুমন। মাত্র ২০ নম্বর কম ছিল বলে হতে পারেননি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত করতে চেয়েছিলেন অভিনয়, সেটাও পারেননি। রেডিও ভূমির প্রধান হিসেবে চাকরি করেছেন। আবৃত্তির সংগঠন স্বনন-এ থাকাকালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। আবৃত্তিকারও হয়ে ওঠা হয়নি তার। তবে নব্বইয়ের অভিনয়শিল্পী হিসেবে মানুষ তাকে মনে রাখবে আর মনে রাখবে তার ভরাট মায়াময় কণ্ঠস্বর।

আরএমডি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।