সানজিদার অলরাউন্ডার হয়ে ওঠার গল্প

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:১৪ পিএম, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১

পড়াশোনার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে, পার্ট টাইম বা ফুল টাইম কাজ করেও ভালো ফলাফল করা যায়। এমনই একজন শিক্ষার্থী সানজিদা মূনীর। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের চার বছরে তার অর্জনের শেষ নেই! মাঘের শেষ বিকেলে জাগো নিউজের সঙ্গে এক আড্ডায় তিনি জানিয়েছেন তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আদ্যোপান্ত। বিস্তারিত জানাচ্ছেন এস কে শাওন-

ভিকারুননিসা থেকে স্কুল-কলেজের গণ্ডি পার হয়ে সুযোগ পেয়ে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানকার শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তিনি। প্রথম বর্ষে ভালো না হলেও পরের তিন বর্ষে ফলাফল ছিল চোখ ধাঁধানো। পরের তিন বছরের সিজিপিএ ছিল ৩.৫৬, ৩.৭০ ও ৩.৯০। প্রথম বর্ষের ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে খাপ খাওয়াতে না পারা। সব মিলিয়ে তিনি অনার্সে প্রথম বিভাগ পেয়েছিলেন।

স্কুল জীবনে তিনি বিতর্ক করতেন। সেটা ছিল বাংলায়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তার ইংরেজিতে বিতর্ক করার ইচ্ছা জাগে। যখন প্রথম বর্ষে পড়েন; তখন টিউশনির ৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। সেখানে তার কাজ ছিল নরওয়েকে রিপ্রেজেন্ট করা। সেখানে তিনি ইংরেজিতে বক্তব্য দেন। এভাবে তার ইংরেজিতে কথা বলার সাহস জাগে। এ আত্মবিশ্বাস নিয়ে কিছুদিন মেন্টসে শিক্ষকতা করেন। এখন ভালো বক্তব্য দিতে জানেন। তিনি এখন ভালো অনুবাদও করতে জানেন। তিনি ‘আগামী একাডেমি ফাউন্ডেশনে’ শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করার সময় ইংরেজিতে গণিতের অনুবাদ করতেন।

jagonews24

পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি সহশিক্ষা কার্যক্রমেও অংশ নিয়ে জিতেছেন অসংখ্য পুরস্কার। ২০১৫ সালে প্রথমবার এটিএম কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। সাধারণ জ্ঞানের ওপর এ কুইজ প্রতিযোগিতায় ১২টি এপিসোডে চ্যাম্পিয়ন হন। একই বছর ৩৫০ জনের হাল্ক প্রাইজ প্রতিযোগিতার ফাইনালে ৭ জনের দলে মনোনীত হন। ২০১৫ সালে ২১ ডিসেম্বর ইউপিপিডি ই-কমার্স ফেয়ার প্রতিযোগিতায় তৃতীয় পুরস্কার জেতেন। দিনটিকে তার জীবনের বিশেষ দিন বলে মনে করেন। পুরস্কার হিসেবে ১০ হাজার টাকা পান।

এ প্রতিযোগিতায় তার সতীর্থ ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ শিক্ষার্থী সাদমান সাকিব ইফতি। প্রতিযোগিতায় তারা দুজন বাংলাদেশে উবার সিস্টেম কেমন হওয়া উচিত- এ ব্যাপারে আইডিয়া দেন। আইডিয়াটি এমন ছিল- ড্রাইভার ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্ণায়ক সেট করা। ড্রাইভারের জাতীয় পরিচয়পত্র থাকার পাশাপাশি তিনি কোথায় বসবাস করেন, সে তথ্যও উবার কর্তৃপক্ষের কাছে থাকবে।

তার অর্জনের গল্প এখানেই শেষ নয়। ২০১৬ সালে স্যোশাল বিজনেস ক্যাম্পেইনে ফাইনালিস্ট ছিলেন। প্রতিযোগিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল শহরের ময়লা দূরীকরণে আইডিয়া দেওয়া। এ প্রতিযোগিতায় তার সতীর্থ ছিলেন বিইউপি শিক্ষার্থী দিশা।

২০১৬ সালে তিনি ডিইউএইটওয়াই ইনফোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। সে প্রতিযোগিতায় কাজ ছিল সরকারি প্রজেক্ট ইনফোগ্রাফি করে দেখানো। তিনি সেখানে ট্যুরিজম নিয়ে ইনফোগ্রাফি করেন। স্থান হিসেবে বেছে নেন রাঙ্গামাটি, সাজেক, সেন্টমার্টিন ও বান্দরবান। ইনফোগ্রাফিতে স্থানগুলোর বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন। বিশেষ করে অসচেতনতার অভাবে পর্যটকদের ময়লা ফেলে আসার বিষয়টি তুলে ধরেন। এ ছাড়াও বিদেশিদের কাছে পর্যটন এলাকাগুলো আকর্ষণীয় করে তোলার বিষয়টিও ঠাঁই পায়। এর ফলে পর্যটন এলাকা সুন্দর রাখতে পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে নিয়মিত সভা, সেমিনার ও অনলাইন ক্যাম্পেইন করার প্রস্তাব আসে।

এ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের হাত থেকে পুরস্কার নেন। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে মেলে সরকারি প্রজেক্টে কাজ করার সুযোগ। তিনি কাজ করেন জমি নামজারি প্রজেক্টে। এ প্রজেক্টে তার কাজ ছিল নামজারি কী, কেন নামজারি করতে হয়, কিভাবে করতে হয়- এর ওপর ইনফোগ্রাফি করা।

jagonews24

তাছাড়া তিনি কাজ করেছেন সরকারি শিক্ষক বাতায়নে। সেখানে তার কাজ ছিল ওয়েবসাইট ডিজাইন করা এবং ওয়েবসাইট সম্পর্কে মানুষকে ধারণা দেওয়া। শিক্ষক বাতায়নের ওপর একটি বইয়েরও ডিজাইন করেন সানজিদা। এ ছাড়া টেন মিনিটস স্কুলের ফেসবুক পেজের কমিউনিটি ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেছেন।

২০১৬ সালে স্যোশাল বিজনেস কেস স্টাডি অ্যানালাইসিস প্রতিযোগিতায়ও চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। এ প্রতিযোগিতায় তার অন্যরকম একটি অভিজ্ঞতা হয়। বিচারক তাকে অনেক প্রশ্ন করার কারণে ভেবেছিলেন পরাজয় নিশ্চিত। কিন্তু বাসার পথে রওনা হওয়ার পর অর্ধেক রাস্তায় গিয়ে জানতে পারেন, তিনি চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। এখানে তার অতৃপ্তির জায়গা ছিল স্টেজ থেকে পুরস্কার নিতে না পারা।

২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভয়েস অব বিজনেস প্রতিযোগিতায় তিনি ফাইনালিস্ট ছিলেন। ২০১৭ সালে ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সিতে কাজ করার সুযোগ পান। তখন এ চাকরির জন্য তিনি ভার্সিটির ক্লাস শেষ করে নিয়মিত গুলশান যাতায়াত করতেন। যখন পরীক্ষা থাকতো; তখন বাসায় বসে এ এজেন্সির কাজ করতেন। এখানে তাকে স্থায়ী করতে চাইলে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। কারণ নিয়মিত ক্লাস করে ৮ ঘণ্টা কাজ করা সম্ভব ছিল না।

এ শিক্ষার্থী কিছুদিন স্বাস্থ্য বিষয়ক ব্লগ লিখেছেন। ১০০টির বেশি ব্লগ লেখা সানজিদার চিকুনগুনিয়া নিয়ে লেখা ব্লগটি সফল হয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নতুন আরেকটি অভিজ্ঞতার স্বাদ নেন। সেটি হলো- সপ্তম সেমিস্টারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা উদয়ন স্কুলে ইন্টার্নশিপ করেন। সেখানে তিনি জীববিজ্ঞান পড়িয়েছেন। এ সেমিস্টারে তার সিজিপিএ ছিল ৪.০০।

jagonews24

২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে এশিয়া প্যাসিফিক ইয়ূথ সামিটে দেশের হয়ে নেপালে প্রতিনিধিত্ব করেন। সেখানে শান্তি সম্পর্কে বক্তব্য দেন। এমনকি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ৬৩তম কমনওয়েলথ সম্মেলনে তিনি দোভাষি হিসেবে কাজ করেন। সেখানে অস্ট্রেলিয়া ও কঙ্গোর হয়ে কাজ করেন।

এত ব্যস্ততার পরও নিজের বন্ধুদের সময় দিতেন। ফেসবুকে বন্ধুদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন। শেষ সেমিস্টারে তিনি ইন্টার্নশিপ করেন ব্র্যাকে। সেখানে কমিউনিকেশন অফিসার হিসেবে কাজ করেন। অনেক শিক্ষার্থী তাকে আইকন মনে করেন। অনেকে তার মতো হতে চান।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রাপ্তি ছাড়া স্কুল-কলেজ জীবনের প্রাপ্তির খাতায়ও তার নাম ছিল। ২০০৯ সালে আন্তঃস্কুল হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতায় তার দল চ্যাম্পিয়ন হয়। তা ছাড়াও ২০১২ সালে নটর ডেম কলেজের সাথে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় তার দল চ্যাম্পিয়ন হয়। অলরাউন্ডার সানজিদা মূনীর এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকোলোজিতে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি এখন বাগান করেন এবং গিটার বাজানো শেখেন।

জীবনের সফলতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ আমাকে বিনয়ী হতে শিখিয়েছে। ডিপার্টমেন্টের সব শিক্ষক, সহপাঠী, সিনিয়র, জুনিয়রের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক। আসলে ভালো বক্তব্য দিতে চাইলে আগে ভালো শ্রোতা হতে হবে। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় লোগো তৈরি করতে গিয়েই গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ শিখেছি। মূলত কাজ করতে গিয়েই যা কিছু শিখেছি; তা কাজে লাগিয়েছি।’

বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় গ্রুপ মেম্বার পরিবর্তন করার কারণে কোন সমস্যা হয় কি-না? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন মানুষের সাথে কাজ করায় মানুষের সাথে খুব সহজেই মানিয়ে নিতে পারি। এতে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা মোকবিলা করার সক্ষমতা বেড়েছে। সেজন্য গ্রুপ মেম্বার পরিবর্তন করলেও আমার কোনো সমস্যা হয় না।’

এসইউ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]