মাসে ৭৫ হাজার টাকার চা বিক্রি করেন আনোয়ারা

ফয়সাল আহমেদ ফয়সাল আহমেদ , রাজশাহী
প্রকাশিত: ০১:০৯ পিএম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

রাজশাহী নগরীর শিরোইল কলোনির বাসিন্দা মো. আব্দুল খালেক (৪৫)। অন্যের অটোরিকশা চালিয়ে চলত তার পরিবার। তবে করোনায় কর্মহীন হয়ে পড়ায় তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।

ওয়ার্ড কাউন্সিলরের মাধ্যমে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (রাসিক) থেকে ২৫০০ টাকার প্রণোদনা পান আনোয়ারার পরিবার। সেই অর্থ স্বামীকে খরচ করতে দেননি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (৪০)।

প্রণোদনার সামান্য সেই অর্থ কাজে লাগিয়েই কেনেন চা বানানোর বড় পাতিল, একটি ফ্ল্যাক্স ও ব্যবসার অন্যান্য উপকরণ। এরপর থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তারা।

প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রণোদনার ২৫০০ টাকায় ঘুরে দাঁড়িয়েছেন আনোয়ারা। স্বামী আব্দুল খালেকের সঙ্গে মিলে তিনি শুরু করেন ব্যবসা। এ ব্যবসার মাধ্যমেই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন আনোয়ারা।

রাজশাহীতেই তার আদি নিবাস। যদিও আনোয়ারা ও তার স্বামীর পৈত্রিক ভিটেমাটি নেই। তাই থাকতে হয় ভাড়া বাসায়। তারপরও ছেলেমেয়েকে শিক্ষিত করেছেন তিনি। আনোয়ারার স্বপ্ন ছেলেমেয়ে লেখাপড়া শিখবে, বড় হয়ে করবে ভালো কোনো চাকরি।

jagonews24

তার বড় মেয়ে খালেদা আক্তারকে (১৯) পাস করিয়েছেন এসএসসি। সেও মায়ের মতোই স্বাবলম্বী হয়েছে। চাকরি করছেন হাই-ফাই প্লে জোন নামক একটি প্রতিষ্ঠানে। ছোট ছেলে সজীব (১২) নগরীর ইউসেফ স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র।

আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে গাড়ি-ঘোড়া সব বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে কর্মহীন হয় স্বামী। আমিও দু’টি বাড়িতে কাজ করতাম। তবে করোনাভাইরাসের কারণে আমাকেও তারা কাজে আসতে নিষেধ করে দেয়। এতে দু’জনই কর্মহীন হয়ে পড়ি। দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে কয়েকদিন খুব কষ্ট করতে হয়।’

‘এরপর ২০১৯ সালের এপ্রিলে আমাদের কাউন্সিলর সুমনের কাছে ত্রাণ সাহায্যের জন্য যায়। তিনি রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন থেকে আমাদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রদানকৃত ২৫০০ টাকার অনুদানের ব্যবস্থা করে দেন।’

‘আমার স্বামী টাকা নিয়ে বাড়িতে এলে তা খরচ করতে দেয়নি। তাকে সঙ্গে করে বাজারে গিয়ে একটি চায়ের ফ্ল্যাক্স ও চা বিক্রির অন্যান্য জিনিসপত্র কিনে আনি। তারপর থেকে আমি চা বানিয়ে দেয়, আর সে বাইরে গিয়ে হেঁটে হেঁটে বিক্রি করত।’

jagonews24

‘তবে একটা চায়ের ফ্ল্যাক্স দিয়ে চা বিক্রি করে খুব বেশি টাকা আয় হতো না। কিছুদিন পর আবার আরেকটা কিনি। দু’মাস পর আরও দুটি, এভাবে মোট ৪টি চায়ের ফ্ল্যাক্স ভরে আমরা দু’জনে চা বিক্রি শুরু করি। দুই ফ্ল্যাক্সের চা সে বাইরে বিক্রি করত, আর বাকি দুই ফ্ল্যাক্স নিয়ে আমি রেশম বোর্ডের পাশে বসে বিক্রি করতাম। এভাবেই আমাদের সুদিন ফিরে আসে।’

আনোয়ারা জানান, ‘রেল মার্কেটের মানুষের অনুরোধ ও রেশম ভবনের কিছু নিয়মিত ক্রেতা থাকায় রেশম বোর্ডের রাস্তার পাশেই চা, পান-সিগারেট নিয়ে ব্যবসা শুরু করি।’

প্রথমে একটি টেবিল থাকলেও এখন দু’টি টেবিল নিয়ে খোলা আকাশের নিচেই চলছে আনোয়ারার চায়ের দোকান। দীর্ঘদিন ধরে আনোয়ারার স্বামী শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। আর তাই বেশিরভাগ সময় তিনিই দোকানে সময় দেন।

রেশম বোর্ডের কর্মচারী আসাদ। অফিসের ফাঁকে চা খেতে এসেছেন আনোয়ারার চায়ের দোকানে। তিনি জানান, ‘অফিসের পাশে এই চায়ের দোকানটা হয়ে খুব ভালো হয়েছে। চা-বিস্কুটের জন্য এখন আগের মতো আর দূরে যাওয়া লাগে না।’

রেশম বোর্ডের বিপরীতে আছে অসংখ্যা রেলওয়ের মার্কেট। সেখান থেকেও আসে আনোয়ারার চায়ের দোকানের ক্রেতা। রেল মার্কেটের লোহা ও রড ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আনোয়ারা আপার দোকানটি প্রায় দু’বছর ধরে চলছে।’

‘রেল মার্কেট ও রেশম বোর্ডের আশপাশে তেমন চায়ের দোকান নেই। চা কিংবা পান-সিগারেট খেতে হলে যেতে হয় একেবারে ভদ্রামোড়ে। আপার দোকানটি হওয়ায় আমাদেরও সুবিধা হয়েছে। তাছাড়া আপার হাতের চা ও পান দু’টোই অত্যন্ত মজার।’

jagonews24

জীবন সংগ্রামী আনোয়ারা প্রতিবেদককে বলেন, ‘অনেক কষ্ট শেষে এখন ভালোই আছি ভাই। ছেলে-মেয়ে স্বামী নিয়ে বেশ ভালোই চলে যাচ্ছে। বুদ্ধি করে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ২৫০০ টাকা কাজে লাগিয়েছিলাম বলে আজ আমরা স্বাবলম্বী।’

‘তা না হলে আজও আমাকে মানুষের বাড়িতে কাজ করে খেতে হতো। আর আমার স্বামীকে অন্যের অটো চালাতে হতো। সব মিলিয়ে আল্লাহ এখন ভালোই রেখেছে ভাই।’

প্রতিদিন কেমন ব্যবসা হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার টাকার বেচা-বিক্রি হয়। এতে লাভ থাকে ৪০০-৫০০ টাকা। তাতে ছেলেমেয়ে নিয়ে ডাল-ভাত খেয়ে ভালোই চলে যাচ্ছে।’

আনোয়ারার বিষয়ে কথা হয় রাসিকের ১৯নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তৌহিদ হক সুমনের সাথে। প্রণোদনার সামান্য অর্থ দিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে উঠার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘করোনার শুরুতে তারা একবার এসেছিল আমার কাছে আর্থিক সহযোগিতার জন্য। তৎপ্রেক্ষিতে আমি তাদের রাসিকের প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনার তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভূক্ত করায়।’

তিনি বলেন, ‘ভেবেছিলাম সেটা দিয়ে অন্তত তারা কয়টা দিন খেয়ে পরে বাঁচতে পারবেন। তবে আনোয়ারা ওই সামান্য অর্থ নষ্ট না করে নিজের বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে এভাবে স্বাবলম্বী হতে পেরেছেন। এটি সত্যিই অনুপ্রেরণামূলক। তাদের দেখে সমাজের অন্যান্যদের শিক্ষা নেওয়া উচিত’ বলে মন্তব্য করেন ১৯নং ওয়ার্ডের এই জনপ্রতিনিধি।

জেএমএস/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]