খুনি ধরতে যেভাবে খুলি থেকে চেহারা উদ্ধার করা হয়

শেখ আনোয়ার
শেখ আনোয়ার শেখ আনোয়ার , বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ০২:০২ পিএম, ২৭ অক্টোবর ২০২১

অপরাধ তদন্তকালে প্রাপ্ত মাথার খুলি নিয়ে প্রায়শই বিপাকে পড়েন পুলিশ। খুলির পুরো মুখ বা আদল না জানলে পুলিশের কী বা করার আছে?

তবে উন্নত দেশের পুলিশ কিন্তু উদ্বারকৃত মাথার খুলি ধরেই মৃত্যু রহস্য উদঘাটন করেন। এজন্য তারা ধারণা নেন ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে।

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা খুলি থেকে বের করেন মৃতের আসল চেহারা। পুলিশ ওই চেহারার ছবি পত্রিকায় ছাপায়। ছড়িয়ে দেয় অনলাইনে।

তারপর দেখা যায় ছবি দেখে মৃতের পরিচিত বা আত্মীয়রা খোঁজ করছেন। মৃতের পরিচিতদের মাধ্যমেই পুলিশ উদ্ধার করছেন হত্যার কারণ সংক্রান্ত তথ্য। এমনকি নিহতের নিখোঁজের সময়কাল ও খুনিদের পরিচিতিও উদ্ঘাটন করছেন পুলিশ।

মানুষের খুলি একটি অস্থিনির্মিত কাঠামো, যা মানব-কঙ্কালের মস্তক গঠন করে। খুলি মুখের কাঠামো ধরে রাখে ও মস্তিষ্কের জন্য একটি গহ্বর তৈরি করে। এটি মস্তিষ্ককে বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা করে।

খুনি ধরতে যেভাবে খুলি থেকে চেহারা উদ্ধার করা হয়

গবেষকরা জানিয়েছেন, খুলি থেকে একটি মানুষের ত্রিমাত্রিক মুখাকৃতি গড়ার কাজটা কিন্তু অতোটাও সহজ কাজ নয়।

বিভিন্ন পরিমাপের পদ্ধতি ছাড়াও সচল ও অচল টিস্যু সমস্যা কাজ করে। খুলিতে মৃতের চেহারা ফিরিয়ে আনতে মুখের বিভিন্ন পয়েন্টে বিভিন্ন পুরুত্বে নরম টিস্যুগুলোর বিন্যাস করা হয়।

কেবল বিশেষজ্ঞরাই জানেন খুলির হাড়ের কোন পয়েন্টে মুখের চামড়ার পুরুত্ব কতো? তবুও এ বিষয়ে খুব ঝক্কি পোহাতে হয়। কারণ নাক, কান শুধু হাড় দিয়ে তৈরি নয়। নরম তরুণাস্থি দিয়ে গঠিত।

তবে একেক জনের নাক, কান একেক রকম হয়ে থাকে। চুলের ভঙ্গিমা বা হেয়ার স্টাইল থাকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। রং দৈর্ঘ্য আচঁড়ানোর ভঙ্গি ইত্যাদি পার্থক্য তো আছেই।

কাজেই মুখের চেহারা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে হেয়ার স্টাইল খুব কমই নিখুঁত হয়। শিশুদের মুখের আদল পুনর্গঠনেও বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয় বিশেষজ্ঞদের।

খুনি ধরতে যেভাবে খুলি থেকে চেহারা উদ্ধার করা হয়

ফরেনসিক পাঠ্য বইয়ে সফট টিস্যুর পুরুত্ব বিষয়ক যেসব তথ্য আছে, তা মূলত পূর্ণবয়স্কদের বিষয়। এক্ষেত্রে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ হডসন আল্ট্রা সাউন্ড পদ্ধতি প্রয়োগ করে কয়েকটি শিশুর সফট টিস্যু মেপে দেখেছেন। তারপর নিশ্চিত হয়েছেন, বয়স অনুপাতে এ পুরুত্বের হ্রাস বৃদ্ধি ঘটে।

এক্ষেত্রে ম্যাগনেটিক রেজন্যান্স ও আল্ট্রা সাউন্ডের মতো নতুন কৌশল প্রয়োগ করে মুখের আদল পুর্নগঠন করা হয়েছে। কঙ্কাল বা মৃতের খুলিতে চেহারা ফুটিয়ে তোলার আগে কাঠ বা প্লাস্টিকের তৈরি নকল খুলিতে তা চিহ্নিত করা হয়। পরে আসল খুলির নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে টিস্যু জুড়ে দিতে হয়।

তারপর আসল খুলির ওপর পাতলা লেইয়ের একটি প্রলেপ দিয়ে তাতে রঙিন প্লাস্টিক কাঠি বসিয়ে দেওয়া হয়। এবার নির্দিষ্ট একটি পদ্ধতি অনুসরণ করে মুখের বিভিন্ন পয়েন্টে নরম টিস্যু আঠা দিয়ে লাগিয়ে দেওয়া হয়।

তবে মৃতের গলার মাংসপেশির স্ফীতির ব্যাপারে বইপত্রে যেসব তথ্য আছে, তাতে গলা তৈরিতে অসুবিধা হয় না ফরেনসিক আর্টিষ্টদের। মৃতের দু’চোখের মণির মধ্যবর্তী দূরত্ব আন্দাজে মেপে ঠোঁটের বিস্তৃতিও দেওয়া হয়।

খুনি ধরতে যেভাবে খুলি থেকে চেহারা উদ্ধার করা হয়

প্রাপ্তবয়স্ক তরুণদের বেলায় ঠোঁটের বিস্তৃতি ওপরের দাঁত পর্যন্ত পুরোপুরি যায় না। বৃদ্ধদের দাঁত ক্ষয় হওয়ার কারণে ঠোঁটের বিস্তৃতি বেড়ে যায়। ঠোঁট গঠনের ক্ষেত্রে নাকের ডগার নিচের দিকটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই নাক তৈরির বিষয়টি তাই বেশ জটিল।

কারণ নাকে মূল শক্ত হাড় সবারই এক রকম। নাক পূণর্গঠনের বিষয়ে রাশিয়ান ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ জেরা সিমভের পরামর্শ হলো, ‘খুলির মধ্যলাইন থেকে বেরিয়ে আসা দু’টো লাইনের ওপর নির্ভর করে মৃতের নাকের গঠন তৈরি করাই ভালো।

নাকের হাড়ের বাঁকে গোল করে গড়ে তোলা হয় পূর্ণ চেহারা। খুলিতে নাকের যে ছিদ্র আছে, তা নাকের বাইরের চেহারার চেয়ে দেড় গুণেরও বেশি প্রশস্ত থাকে।’

খুনি ধরতে যেভাবে খুলি থেকে চেহারা উদ্ধার করা হয়

এভাবে হাড় ও গর্তের নানা মাপ, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োগের পর নাক পূনর্গঠন করা হলেই কেবল তখন নকল পেশী জুড়ে দিয়ে ফুঁটিয়ে তোলা হয় খুলির আসল চেহারার ত্রিমাত্রিক মডেল।

এভাবে ফরেনসিক গবেষকরা মৃত মানুষের শরীরের হাড়-গোড় নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে গবেষণাগারে ও মাঠে কাজ করে চলেছেন। তাদের গবেষণায় প্রকৃত ঘটনা উদ্ধারের প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হচ্ছে।

অনেক গোপনীয় সত্যি ঘটনা উন্মোচিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে আসল অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে। আর তাই উন্নত রাষ্ট্রের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আধুনিক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের অবদান অতুলনীয়।

লেখক: বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

জেএমএস/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]