সবাই নিষেধ করেছিল, রেলকন্যা তানজিনা দমেননি
এ কাজ মেয়েদের জন্য নয়! নাইট শিফটের ধকল আর রেলস্টেশনের নিরাপত্তার কথা ভেবে সবসময় কথাটা বলতেন তানজিনার বাবা মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ। তিনি নিজেও একজন রেল কর্মকর্তা। মা চেয়েছিলেন, মেয়ে শিক্ষক হোক। চট্টগ্রাম জংশন কেবিনের প্যানেল বোর্ডের সামনে বসে তানজিনা শাহনাজের মনে পড়ে বাবা-মায়ের সেসব কথা। সবাই নিষেধ করেছিল, কিন্তু তানজিনা দমেননি।
বাবা মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ সহকারী স্টেশন মাস্টার (এএসএম) হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম স্টেশনের ম্যানেজার হিসেবে নেন অবসর। বাবার চাকরির সুবাদে তানজিনার শৈশব কাটে রেল কলোনিতে। ২০১৬ সালে তিনি নিজেও সহকারী স্টেশন মাস্টার হিসেবে রেলে যোগ দেন। বাবা ভেবেছিলেন, কাজের চাপে মেয়ে চাকরি ছেড়ে দেবে। বেশ কবছর পর রেলের লোকেরাই বাবাকে বলেছেন – তানজিনা খুবই দক্ষ। শুনে গর্বে বাবার বুকটা ভরে উঠেছিল।
ঈদ বা বার্ষিক পরীক্ষার পর ট্রেনে চড়ে গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাওয়ার স্মৃতি মনে পড়ে তানজিনার। রেলের জানালা দিয়ে তিনি দেখতেন আকাশে পাখির ওড়াউড়ি, মাঠের কৃষক। রেলের চাকার শব্দ ছাপিয়ে প্রিয় গান গুনগুন করতে করতে বাড়ি যাওয়া। এখন আর সেই দিন নেই তার। ভ্রমণের চেয়ে ট্রেনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করেই কাটে তানজিনার সময়। তিনি এখন চট্টগ্রাম জংশন কেবিনের স্টেশন মাস্টার।
‘রেল ভ্রমণের সময় সামনে কী আসবে, সেটা দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকি। শীতে কুয়াশার চাদর ভেদ করে ট্রেনের এগিয়ে যাওয়া আমি ভীষণ পছন্দ করি’, জাগো নিউজকে বলেন তানজিনা।
বাবা রাজি হচ্ছিলেন না। কাজের চাপে অনেক রাতে সেহেরি না খেয়ে রোজা থাকতে হতো তার বাবাকে!মোকাবেলা করতে হয়েছে নানান চ্যালেঞ্জ। সেসব জেনেও রেলে আবেদন করেন তানজিনা
উচ্চমাধ্যমিক শেষ হতে না হতেই অসুস্থতার কারণে পড়াশোনায় বিরতি নিতে হয়েছিল তানজিনাকে। একটি কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতার চাকরি নিয়েছিলেন। সহপাঠীদের থেকে পিছিয়ে পড়ায় কিছুটা হতাশও ছিলেন। পরে চট্টগ্রামে চলে যান। সেখানেই নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘মাস্টার্স চলাকালে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে এমবিএ ভর্তি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, ব্যাংকে জব করবো। ভবিষ্যৎ নিয়ে সিরিয়াস হয়ে উঠেছিলাম। পড়াশোনায় গ্যাপের কারণে হওয়া ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কঠোর পরিশ্রম করেছিলাম।’
বাংলাদেশ রেলওয়ে সহকারী স্টেশন মাস্টার পদের জন্য বিজ্ঞাপন দেয়। এক কাজিন তানজিনাকে উৎসাহ দেন, তিনি যেন সেখানে আবেদন করেন। কিন্তু বাবা রাজি হচ্ছিলেন না। কাজের চাপে অনেক রাতে সেহেরি না খেয়ে রোজা থাকতে হতো তার বাবাকে! মোকাবেলা করতে হয়েছে নানান চ্যালেঞ্জ। সেসব জেনেও রেলে আবেদন করেন তানজিনা। পরীক্ষায় টিকে চাকরিও পেয়ে যান।
তানজিনা বলেন, ‘কয়েক মাস পর মাস্টার্স আর এমবিএর রেজাল্ট বেরোয়। ভীষণ ভালো লাগছিল। একদিকে রেজাল্ট, আরেক দিকে চাকরি আমাকে নতুন পরিচয় দিয়েছিল। কয়েক বছর আগে পড়াশোনায় বিরতি নিয়ে যে হতাশায় ডুবে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পেরে ভালো লাগছিল।’

রেলে যোগ দেওয়ার পর চট্টগ্রামের হালিশহরের রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমিতে চার মাস প্রশিক্ষণ নেন তানজিনা। কীভাবে ট্রেনের আসা-যাওয়া সমন্বয় করতে কনট্রোল প্যানেল পরিচালনা করতে হয়, প্ল্যাটফর্ম বরাদ্দ করতে হয় এবং সঠিক সিগন্যালিং নিশ্চিত করতে হয় সেসব শেখানো হয় ওই ট্রেনিংয়ে। ট্রেনের চলাচলের রেকর্ড রাখা, কনট্রোল সেন্টার এবং পাশের স্টেশনগুলোর সাথে যোগাযোগ করা এবং দুর্ঘটনাসহ জরুরি অবস্থা মোকাবিলা করাও শেখেন তিনি। এর পর ছিল অন-দ্য-জব ট্রেনিং।
রেলে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তরা কাজ শুরু করেন সহকারী স্টেশন মাস্টার হিসেবে। স্টেশন মাস্টার গ্রেড ৪, গ্রেড ৩, গ্রেড ২ এবং গ্রেড ১-এর মাধ্যমে পদোন্নতি পান। গ্রেড ১ এর পরে আসে স্টেশন সুপারিনটেনডেন্ট, যা এই স্তরের সর্বোচ্চ পদ। তানজিনা এখন গ্রেড ৩-এ।
স্টেশন মাস্টাররা তিন শিফটে কাজ করেন – সকাল (সকাল ৮টা-দুপুর ২টা), সন্ধ্যা (দুপুর ২টা-রাত ১০টা) এবং রাত (রাত ১০টা-সকাল ৮টা)। কনট্রোল প্যানেল অকেজো হয়ে গেলে তারা ম্যানুয়ালি কাজ করেন এবং সে অনুযায়ী পয়েন্টসম্যানদের নির্দেশ দেন। স্টেশন মাস্টার, লোকোমোটিভ মাস্টার এবং ট্রেন পরিচালকদের মধ্যে যোগাযোগ সাধারণত কনট্রোল সেন্টারের মাধ্যমে হয়।
এই কৌশল পাহাড়তলী কনট্রোল অফিসের কর্মকর্তাদের নজর কাড়ে। তিনি কেবল তাদের প্রশংসাই পাননি, বরং বিশ্বাসও অর্জন করেছেন
‘চাকরির শুরু থেকেই সময়সূচি অপটিমাইজেশনের দিকে মনোযোগ দিয়েছি আমি। ট্রেনের আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারগুলো সতর্কতার সাথে সেট করেছি, যাতে বিলম্ব যতটা সম্ভব কমানো যায়। এ জন্য প্রায়ই ক্যালকুলেটেড রিস্ক নিতে হতো এবং আমার সহকর্মীরাও আমাকে সতর্ক করেছিলেন। তবুও আমি আমার ক্যালকুলেশনের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলা’, তিনি বলেন।
উদাহরণ দিতে গিয়ে তানজিনা জানান, ধরা যাক চট্টগ্রামের একটি প্রান্তিক স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনের লোকোমাস্টার (ট্রেনের প্রধান চালক) ক্লিয়ারেন্স সিগন্যাল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন চালু করেন না। প্রায়ই তারা যাত্রীদের ওঠার জন্য দুই থেকে তিন মিনিট অপেক্ষা করেন। তানজিনা এই দুই-তিন মিনিট সময় ব্যবহার করে একটি আগমনী ট্রেনকে বাইরে দাঁড় করিয়ে না রেখে স্টেশনে ঢোকার সিগন্যাল দিতেন।
তার এই কৌশল পাহাড়তলী কনট্রোল অফিসের কর্মকর্তাদের নজর কাড়ে। তিনি কেবল তাদের প্রশংসাই পাননি, বরং বিশ্বাসও অর্জন করেছেন। এটি তার জন্য এক বিরাট আনন্দ। চাকরি স্থায়ী হওয়ার আগেই এটি রীতিমতো এক স্বীকৃতি!

রেলে তানজিনাকে সবাই পরিশ্রমী এবং পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে চেনেন। এসব বাবার কাছ থেকে পাওয়া মূল্যবোধের ফসল! শৈশবে দেখতেন, বাবা সব সময় ড্রেসকোড মেনে চলতেন, প্রতিদিন সময় মতো কাজে যেতেন। বাবা প্রায়ই তাকে অফিসে নিয়ে যেতেন। তখন তানজিনা লক্ষ্য করতেন, বাবা কীভাবে কাজ করেন, কীভাবে মানুষের সঙ্গে কথা বলেন।
কাজটি কি কঠিন? এমন প্রশ্নে তানজিনা জানান, কঠিন নয়। কনট্রোল প্যানেল পরিচালনায় ভুল করার কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে। কারণ এটি ভুল ইনপুট গ্রহণ করবে না। তবে সিস্টেমের ত্রুটির সময় ম্যানুয়ালি কাজ করার সময় ভুল হতে পারে। তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল বা ম্যানুয়াল, এই কাজের জন্য পূর্ণ একাগ্রতা প্রয়োজন। এমনকি সামান্য বিচ্যুতিও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।’ এখন পর্যন্ত বড় কোনো ভুল তার হাত থেকে হয়নি। কাজের প্রতি তার ভালোবাসা অসীম।
প্রায় ছয় বছর নাইট শিফটে কাজ করেছেন তানজিনা। রাতের ঘুম বিসর্জন দিয়েছেন। এই বাস্তবতা তাকে মেনে নিতে হয়েছে যে, রাতের রেলওয়ে স্টেশন নিরাপদ নাও হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত তার কোনো নেতিবাচক অভিজ্ঞতা হয়নি। ‘আমি ছোটবেলা থেকেই একটু নির্ভীক। কেউ যদি বলত যে, অন্ধকারে ভয়ঙ্কর কিছু আছে, আমি সেখানে যাওয়ার জন্য উৎসুক হয়ে উঠতাম’ হাসতে হাসতে বলেন তানজিনা।
প্রায়ই ইয়ার্ডে যোগাযোগ করেন তিনি, যে ট্রেনটা ছাড়ার সময় হয়েছে সেটার অবস্থা জানতে। এমনকি তিনি লোকোমোটিভ শেডে যোগাযোগ করেন এবং ইঞ্জিন দ্রুত রিলিজ করতে তাগাদা দেন, যদিও এটি তার দায়িত্ব নয়
মাও সতর্ক করে বলেছিলেন, মেয়ে মানুষ, ঝামেলায় পড়বে! তানজিনা সময় বদলাননি। রাতে ডিউটি করার সময় অনেক রাত অফিস ঘরের বাইরে বের হয়ে চারদিকে তাকিয়ে দেখেছেন, অলৌকিক কিছু চোখে পড়েনি কখনও। তার বিশ্বাস, রেলওয়ে স্টেশনকে কেবল সাহিত্যেই ভুতুড়ে জায়গা হিসেবে বর্ণনা করা হয়, বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন।
কখনও কখনও অসুস্থতা নিয়েও অফিস করেছেন তানজিনা। ব্যাগে করে ওষুধ নিয়ে গেছেন অফিসে। ‘সহকর্মীরা বলতেন, অসুস্থ অবস্থায় কাজ করা উচিত না। আমি মরে গেলেও ট্রেন চলা বন্ধ হবে না। আমি তাদের বলি যে, কঠোর পরিশ্রম করে আমি অসুস্থ হয়েছি এবং একই কাজ করেই আমি সুস্থ হবো’, বলেন তানজিনা।
প্রায়ই গেটম্যান, পার্শ্ববর্তী স্টেশন, কনট্রোল সেন্টার এবং ইয়ার্ড কর্মীদের সঙ্গে একযোগে সমন্বয় করেন তানজিনা। তাকে নিয়ে সহকর্মীদের মন্তব্য – রোবটের মতো কাজ করেন তিনি। শুনে বেশ মজা পেয়েছেন তিনি। তানজিনা বলেন দ্রুত কাজ করা এবং সিরিয়াস থাকাটাই তার ধরন। যেমন, প্রায়ই ইয়ার্ডে যোগাযোগ করেন তিনি, যে ট্রেনটা ছাড়ার সময় হয়েছে সেটার অবস্থা জানতে। এমনকি তিনি লোকোমোটিভ শেডে যোগাযোগ করেন এবং ইঞ্জিন দ্রুত রিলিজ করতে তাগাদা দেন, যদিও এটি তার দায়িত্ব নয়। ‘আমি সত্যিই আমার কাজ উপভোগ করি। স্টেশন মাস্টারের ঘরে বসতে আমার খুব ভাল লাগে’, বলেন এই রেলকন্যা।
তবে প্রায়ই ট্রেন নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখেন তানজিনা। ঘুমের ঘোরে দেখেন, দুই ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ বা শান্টিংয়ের সময় ট্রেন ভুল দিকে চলে যাচ্ছে। প্রায়ই এ রকম দুঃস্বপ্ন দেখে চমকে জেগে ওঠেন। তার মা বলেন, তিনি ঘুমের ভেতর উল্টোপাল্টা বকতে থাকেন।

কাজের প্রতি ভালোবাসা, দক্ষতা ও একাগ্রতা তাকে দিয়েছে সম্মান ও স্বীকৃতি। ২০২৩ সালে বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) অফিস থেকে তিনি পেয়েছিলেন আনুষ্ঠানিক সেই স্বীকৃতি। তানজিনাসহ কয়েকজন কর্মচারীকে ইউনিফর্ম পরে ডিটিও অফিসে ডেকে পাঠানো হয়। তারা ভেবেছিলেন, হয়তো কোনো ভুলের জন্য জবাবদিহি করতে হবে! পরে দেখলেন, সেটা ছিল চমক! তানজিনার ভাষায়, ‘আমি রোমাঞ্চিত ছিলাম যে, তারা কর্মক্ষেত্রে আমার সক্রিয় ভূমিকা এবং দায়িত্ববোধকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি আমাকে আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা দিয়েছে।’
একঘেয়ে লাগে না তার? জানতে চাইলে এই রেলকন্যা বলেন, ‘পুরো কর্মজীবনে একবারই চাকরি ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করেছিল। সেদিন অসংখ্য ফোন কল আসছিল, অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলাম। মাথার ওপর এমন চাপ পড়েছিল! পরে কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিজেকে শান্ত করলাম, কাজে ফিরে গেলাম।
যারা এই পেশায় আসতে চান, সেই নারীদের জন্য তানজিনার পরামর্শ হলো সময়নিষ্ঠ এবং মনোযোগী হতে হবে। তিনি বিশ্বাস করেন নারীর নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ দরকার, যা তারা ইতিমধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে করেছেও। ভবিষ্যতে যখন আরও নারী স্টেশন মাস্টার হিসেবে কাজ করতে আসবেন, তখন কেউ এই চাকরিকে নারীদের জন্য ‘অনুপযুক্ত’ মনে করবে না।
কাজে এতটাই মগ্ন যে, এখনও বিয়ে করা হয়নি তানজিনার। অবশ্য তিনি মনে করেন না যে, এই ক্যারিয়ার গড়তে গিয়ে তাকে ব্যক্তিগত জীবনে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। এখানকার সুযোগ-সুবিধার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রে নারী স্টেশন মাস্টারদের জন্য টয়লেট এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আছে। তবে নিরাপত্তা এখনও একটি উদ্বেগের বিষয়।’ তিনি জানান, যদি সুযোগ ও ক্ষমতা থাকত, নারী কর্মীদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতেন। তিনি মনে করেন, পরিবেশ যদি হয়রানিমুক্ত হয়, নারীরা দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারেন।
আরএমডি


