যেভাবে এলো নন্দিত নরকে

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান মুহাম্মদ ফরিদ হাসান , কবি ও কথাসাহিত্যিক
প্রকাশিত: ০৭:০৯ এএম, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭

বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখকদের কথা বললে যে নামটি সবার আগে সামনে চলে আসে; সে নামটি নিঃসন্দেহে হুমায়ূন আহমেদের। তিনি তাঁর চর্চার মাধ্যমে সীমাহীন পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন এবং সে পাঠকপ্রিয়তার ধারা তাঁর মৃত্যুর পরও স্তিমিত হয়ে যায়নি। হুমায়ূন আহমেদ প্রচুর লিখেছেন, গ্রন্থের সংখ্যা তাই তিনশ’র ঘর অনায়াসে পেরিয়ে গেছে। লেখা প্রচুর হলেও তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এটি হুমায়ূন আহমেদের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস হলেও এটি তাঁর প্রথম লেখা নয়। তাঁর প্রথম লেখা উপন্যাস ‘শঙ্খনীল কারাগার’। প্রথম বই প্রকাশ বলেই হয়তো ‘নন্দিত নরকে’র প্রকাশনা নিয়ে হুমায়ূন আহমেদকে বিবিধ ঘটনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিলো। সেসব ঘটনাবলির সবটুকু যে সুখকর অভিজ্ঞতা তেমনটিও কিন্তু নয়।

১৯৭০ সাল। হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ছাত্র। থাকেন মহসিন হলে। এ সময়েই তিনি লিখে ফেলেন ‘নন্দিত নরকে’। কিন্তু পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এটি আর বই আকারে প্রকাশিত হয়নি। দেশ স্বাধীনের পর ‘নন্দিত নরকে’ প্রথমে ‘মুখপত্র’ নামে একটি সংকলনে প্রকাশিত হয়। এ উপন্যাসটি পড়ে আহমদ ছফা মুগ্ধ হন। তিনিই এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করতে উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

আরও পড়ুন- নায়করাজের যত অর্জন

১৯৭২ সালের শেষ দিকে খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি থেকে ‘নন্দিত নরকে’ বই আকারে প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়। হুমায়ূন আহমেদ নন্দিত নরকের যে পাণ্ডুলিপি খান ব্রাদার্সে জমা দিয়েছিলেন সেটি প্রথমে ছিলো তিন ফর্মা নয় পৃষ্ঠার। সেজন্যই প্রকাশনীর সত্ত্বাধিকারী ‘খান সাহেব’ একদিন তরুণ ঔপন্যাসিককে ডাকলেন ফর্মা মেলানোর জন্য। এ ঘটনার সরস বর্ণনা পাওয়া যায় হুমায়ূন আহমেদের জবানীতেই : ‘খান ব্রাদার্স এন্ড কোম্পানির মালিক খান সাহেব আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তাঁকে যথেষ্ট বিরক্ত মনে হলো। তিনি নন্দিত নরকে উপন্যাসের প্রুফ আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, বই ছোট হয়েছে, বড় করতে হবে। ...আপনি একটা উপন্যাস লিখলেন তিন ফর্মা নয় পৃষ্ঠা। বাকি সাত পৃষ্ঠায় আমি কী করবো? কাগজ-কলম নিয়ে বসেন। এখানেই ঠিক করেন।’ খান সাহেবের কথামতো হুমায়ূন আহমেদ সেখানে বসেই নতুন লেখা যুক্ত করলেন। তারপর বের হলো নন্দিত নরকে। বইটির ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন বাংলা ভাষার বিশিষ্ট গবেষক ড. আহমদ শরীফ।

huma

গ্রন্থটির প্রকাশের প্রথম দিকে হুমায়ূন আহমেদ পাঠকদের কাছ থেকে ওইভাবে সাড়া পাননি। উপন্যাসটি প্রথমে যে প্রচ্ছদে বের হয়েছিলো সে প্রচ্ছদ করেছিলেন লেখকের ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ভাস্কর শামীম শিকদার। কিন্তু প্রচ্ছদটি তেমন ভালো হয়নি।

আরও পড়ুন- বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ১৩ শতাধিক বই

বই প্রকাশের মাস ছয়েক পরের ঘটনা। প্রকাশনীর সত্ত্বাধিকারী হুমায়ূন আহমেদকে ডাকলেন। জানালেন, তাঁর বই তেমন বিক্রি হচ্ছে না। পুশিং সেল দেওয়ার কথাও বললেন। হুমায়ূন আহমেদ বুঝতে পেরেছিলেন বইয়ের প্রচ্ছদ ভালো হয়নি। তিনি তাই প্রস্তাব করলেন, প্রখ্যাত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীকে দিয়ে বইটির নতুন প্রচ্ছদ করানো যায় কি না। তাঁর এ কথা খান সাহেব যে সহজেই মেনে নিবেন সেটি তিনি ভাবতে পারেননি। খান সাহেব সাথে সাথেই হুমায়ূন আহমেদকে দুইশ’ টাকা দিয়ে কাইয়ুম চৌধুরীর কাছ থেকে প্রচ্ছদ করিয়ে আনতে পাঠালেন।

হুমায়ূন আহমেদ গেলেন, কিন্তু কাইয়ুম চৌধুরী ব্যস্ত মানুষ। হুমায়ূন আহমেদ অনেকদিন ঘোরাঘুরি করেও প্রচ্ছদ সংগ্রহ করতে পারলেন না। ‘নন্দিত নরকে’র প্রচ্ছদ নিয়েও একটি মজার ঘটনা রয়েছে। সে ঘটনাটি লেখকের মুখেই শোনা যাক : ‘একদিন খান সাহেব বললেন, আমি যাব আপনার সঙ্গে (কাইয়ুম চৌধুরীর কাছে প্রচ্ছদ আনতে)। ...গেলাম খান সাহেবকে নিয়ে। ঘণ্টাখানিক বসে রইলাম। ...কাইয়ুম চৌধুরী খবর পাঠালেন, তিনি একটা ডিজাইন নিয়ে বিশেষ ব্যস্ত। ডিজাইনটা শেষ হলেই আসবেন। আরো দশ-পনের মিনিট লাগবে। দশ-পনের মিনিট পর কাইয়ুম চৌধুরী বের হলেন না। ভয়ালদর্শন এক কুকুর বের হয়ে খান সাহেবের পা কামড়ে ধরলো। আমি খান সাহেবকে কুকুরের হাতে ফেলে রেখে দৌড়ে পালিয়ে গেলাম।’

আরও পড়ুন- বিশ্বের যত অভিনব পাঠাগার

কুকুরের কামড় খেয়ে খান সাহেব কাইয়ুম চৌধুরীর প্রচ্ছদের আশা ছেড়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত প্রচ্ছদ পাওয়া গেলো। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর আত্মজীবনী ‘বলপয়েন্ট’র একাংশে লিখেছেন সে কথা, ‘কাইয়ুম চৌধুরী শেষ পর্যন্ত কভার করে দিয়েছিলেন। অপূর্ব কভার। কভার দেখে খান সাহেব কুকুরের কামড়ের দুঃখ ভুলে গেলেন।’ কভার নিয়ে আসার সময় কাইয়ুম চৌধুরী তরুণ হুমায়ূনের মধ্যে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখেছিলেন এবং সে কথা অকপটে তাঁকে জানিয়েছিলেনও। কাইয়ুম চৌধুরীর দূরদৃষ্টি যে বৃথা যায়নি, সেটা তিনি জীবিতাবস্থাতেই দেখে গেছেন।

huma

নতুন প্রচ্ছদে শোভিত হওয়ার পর নন্দিত নরকে নতুন করে আলোচনায় আসে। এ উপন্যাস নিয়ে সে সময়ে ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘সনাতন পাঠক’ ছদ্মনামে লিখেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। লিখেছেন শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমানসহ আরো অনেকে। নানা বিঘ্ন, গল্প, আনন্দের স্মৃতির মধ্য দিয়ে ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশের পর হুমায়ূন আহমেদ আরো তিন শতাধিক গ্রন্থ লিখেছেন। কিন্তু প্রথম প্রকাশিত উপন্যাসের মতো মহার্ঘ লেখা তিনি পরবর্তীতে খুব বেশি লিখতে পারেননি।

প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস নন্দিত নরকে প্রথম হলেও হুমায়ূন রচনাভাণ্ডারের মধ্যে এটি নিঃসন্দেহে অন্যতম এবং অধিকতর পাঠকপ্রিয়।

এসইউ/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :