শিশুশ্রম-বিরোধী দিবস কী জানে না আকাশ
শুক্রবার সন্ধ্যা। রাজধানীর পল্টন থানা সংলগ্ন পলওয়েল সুপার মার্কেটের তিনতলায় একটি দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে ঘড়ির কাঁটার দিকে বারবার তাকাচ্ছিল আনুমানিক নয়-দশ বছরের একটি ছেলে। তার নাম আকাশ। এ বয়সে তার স্কুলে যাওয়ার কথা থাকলেও দরিদ্র বাবার সংসারের চাকা সচল রাখতে দৈনিক মাত্র ৩০ টাকা বেতনে চাকরি নিতে হয়েছে তাকে।
প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কর্মব্যস্ত থাকতে হয়। সকালে দোকানের শাটার খুলতেই দোকান ঝাড়ু দেয়া ও ফ্লোর ঘষে পরিস্কার করার মধ্য দিয়ে দিনের কাজ শুরু হয়। এরপর চা-বিস্কুট, সিংগারা আনাসহ দুপুর পর্যন্ত নানা ফুট-ফরমায়েশে ব্যস্ত থাকে সে।
দুপুর ২টায় বাসা থেকে নিয়ে আসা ছোট বক্সে মায়ের দেয়া খাবার খেয়ে উঠতে না উঠতেই মালিকের জন্য পান-সিগারেট আনতে দৌড়াতে হয়। আর কাস্টমার দেখলেই দিনে কতবার যে আপা, ভাই, আঙ্কেল, আন্টি এদিকে আসেন বলতে হয় তার হিসেব নেই।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পর আকাশের দোকানে আর মন বসে না। বারবার ঘড়ি দেখে নেয় কখন বাড়ি ফিরবে। কিন্তু মালিকের কড়া নির্দেশ, সাড়ে ৯টায় দোকান বন্ধের আগে কেউ যেতে পারবে না। তাই মন পড়ে থাকলেও বাড়ি ফেরা হয় না আকাশের।
শুক্রবার বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে শিশুশ্রম-বিরোধী দিবস পালিত হলেও আকাশের মতো হাজার হাজার শিশু-শ্রমিককে আর দশটা দিনের মতো সারাদিন কর্মব্যস্ততায় কাটাতে হয়েছে। এ দিবসের কোনো মূল্য নেই অযত্নে-অবহেলায় বেড়ে ওঠা এসব শিশু-শ্রমিকদের কাছে। আকাশের মতো আরো অনেক শিশু-শ্রমিক- রাব্বি, সাদ্দাম, জব্বার, সুমন সবাই দৈনিক ৩০ টাকা বেতনে পলওয়েলে মার্কেটের বিভিন্ন দোকানে পিচ্ছি (ক্ষুদে শিশুদের সবাই পিচ্ছি নামে ডাকে) চাকরি করছে। 
এ প্রতিবেদক আকাশের কাছে শিশুশ্রম-বিরোধী দিবস সম্পর্কে জানতে চাইলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বললো জানেন আমি কিন্তু স্কুলে যাইতাম। পরীক্ষায় একবার খারাপ করায় বাবায় দোকানের কাজে লাগাইয়া দিল। তয় আমি বাবারে কইছি, ঈদের পরে আমি আর চাকরি করুম না, আবার স্কুলে যামু।
আকাশের সঙ্গে কথা বলতে শুনে কপালে ভাজ আর কিছুটা বিরক্তি নিয়ে সামনে এগিয়ে এলেন দোকান মালিক। পরিচয় পেয়ে বিরক্তি লুকিয়ে মেকি হেসে বললেন, গরিবের পোলাপান, ওর বাপে আইয়া হাত-পা ধইরা কইল সংসার চলে না তাই দোকানে রাইখ্যা দিলাম আর কি? আজ যে শিশুশ্রম-বিরোধী দিবস সে সম্পর্কে দোকান মালিকও জানেন না।
কিছুক্ষণ পর রাব্বি নামে আরেক শিশুশ্রমিক আকাশকে দোকানের বাইরে ডেকে নিয়ে গেল। একটি জুতার বাক্সে কোয়েল পাখি ডিম পেড়েছে দেখে দুই শিশু খিলখিল করে হাসতে হাসতে জুতার বাক্সের দিকে ছুটে গেল। 
১৯৯৯ সালে জুন মাসে আন্তজার্তিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) শিশুশ্রম নিরসন সনদ-১৮২ গ্রহণের পর থেকে প্রতি বছর ১২ জুন শিশুশ্রম-বিরোধী দিবস পালন করা হচ্ছে।
২০১০ সাল আইএলও সংস্থার হিসেবে বিশ্বে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ২৪ কোটি ৬০ লাখ। বাংলাদেশের শ্রম অধিদফতরের হিসেব অনুযায়ী দেশে ৪৯ লাখ শিশুশ্রমিক রয়েছে।
এমইউ/বিএ/এমএস