তরুণদের স্বপ্ন এখন বিদেশমুখী কেন?

ড. হারুন রশীদ
ড. হারুন রশীদ ড. হারুন রশীদ , ডেপুটি এডিটর (জাগো নিউজ)
প্রকাশিত: ১০:১৫ এএম, ১৮ মে ২০২৬

ঢাকার মিরপুরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে নাঈম। দেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো ফল নিয়ে বের হয়েছেন দুই বছর আগে। চাকরির জন্য অসংখ্য আবেদন করেছেন। কয়েকটি লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও শেষ পর্যন্ত চাকরি হয়নি। এর মধ্যে বন্ধুরা একে একে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলে গেছে। এখন নাঈমও IELTS কোচিং করছেন। তার বাবা অবসরের টাকাটা ভেঙে ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কারণ পরিবারটির বিশ্বাস—এই দেশে মেধা, পরিশ্রম ও স্বপ্নের নিশ্চয়তা নেই। বিদেশে অন্তত একটা ‘ভবিষ্যৎ’ আছে।

এই গল্প শুধু নাঈমের নয়। বাংলাদেশের হাজারো তরুণের আজ একই স্বপ্ন—দেশের বাইরে চলে যাওয়া। একসময় বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা মূলত শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন সেই প্রবণতা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইটি কর্মী, গবেষক এমনকি নতুন উদ্যোক্তাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের তরুণ সমাজের বড় একটি অংশ এখন ভবিষ্যৎ খুঁজছে বিদেশে।

প্রশ্ন হচ্ছে—কেন?

এর উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসে কর্মসংস্থানের সংকট। দেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সে তুলনায় মানসম্মত চাকরি তৈরি হচ্ছে না। সাম্প্রতিক এক শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা প্রতি তিনজনের একজন দীর্ঘ সময় বেকার থাকছেন। প্রায় ৮ লাখের বেশি স্নাতক চাকরি পাচ্ছেন না।

এই বাস্তবতা তরুণদের মধ্যে ভয়াবহ হতাশা তৈরি করছে। কারণ তারা দেখছে, বছরের পর বছর পড়াশোনা করেও কাঙ্ক্ষিত চাকরি মিলছে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে চাকরি পেলেও বেতন জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঢাকার মতো শহরে একজন নতুন চাকরিজীবীর জন্য সম্মানজনকভাবে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরেকটি বড় কারণ হলো শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যে অসামঞ্জস্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ধরনের শিক্ষা দেওয়া হয়, বাস্তব চাকরির বাজারে তার চাহিদা অনেক ক্ষেত্রে নেই। ফলে ডিগ্রি বাড়ছে, কিন্তু দক্ষতা ও কর্মসংস্থান বাড়ছে না। অনেক তরুণ মনে করেন, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক শিক্ষা, গবেষণা ও বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বেশি। এ কারণে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।

ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫২ হাজার ৭৯৯ শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে গেছেন। ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজারের কিছু বেশি। সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী গেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায়।

তুলনামূলকভাবে দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। ভারত, চীন কিংবা ভিয়েতনামের মতো দেশ থেকেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিদেশে যায়। কিন্তু পার্থক্য হলো, ওই দেশগুলোর অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা শেষে নিজ দেশে ফিরে কাজের সুযোগ পায়। বাংলাদেশে সেই আস্থার জায়গাটি দুর্বল। এখানে অনেক তরুণ মনে করেন, দেশে ফিরে এলেও মেধার মূল্যায়ন কিংবা গবেষণার সুযোগ সীমিত।

তরুণদের স্বপ্নকে দেশের ভেতরেই ধরে রাখতে হলে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার মানোন্নয়ন, দুর্নীতি ও বৈষম্য কমানো এবং মেধাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা। গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ দরকার। তরুণদের এমন অনুভব দিতে হবে যে, এই দেশেও পরিশ্রম করলে ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব।

শুধু অর্থনৈতিক কারণ নয়, সামাজিক ও মানসিক কারণও এই বিদেশমুখী প্রবণতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। তরুণদের বড় একটি অংশ মনে করে, দেশে যোগ্যতার চেয়ে ‘যোগাযোগ’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চাকরি, পদোন্নতি কিংবা বিভিন্ন সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে অনেকেই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে।

২০২৪ সালের চাকরির কোটা আন্দোলনও তরুণদের ক্ষোভ ও হতাশার একটি বড় বহিঃপ্রকাশ ছিল। সরকারি চাকরিতে বৈষম্যের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের যে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল, তার পেছনেও ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক দিকও আছে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে পৃথিবী অনেক ছোট হয়ে গেছে। একজন তরুণ প্রতিদিন দেখছেন তার সহপাঠী বিদেশে গিয়ে ভালো জীবনযাপন করছেন, উন্নত পরিবেশে পড়াশোনা করছেন কিংবা বেশি আয় করছেন। এতে বিদেশকে ‘স্বপ্নের জায়গা’ মনে হওয়াটা স্বাভাবিক।

কিন্তু বাস্তবতা সবসময় এত সহজ নয়। বিদেশে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে কঠিন সংগ্রাম করতে হয়। উচ্চ টিউশন ফি, বাসাভাড়া, সাংস্কৃতিক মানিয়ে নেওয়ার চাপ, বৈষম্য, একাকিত্ব—সব মিলিয়ে বিদেশের জীবনও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো দেশে শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এমনকি খণ্ডকালীন চাকরির আয়ে অনেক শিক্ষার্থীর টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ছে।

তারপরও কেন তরুণরা যেতে চায়?

কারণ তারা শুধু অর্থ খুঁজছে না; তারা খুঁজছে নিশ্চয়তা, মর্যাদা ও সম্ভাবনা। তারা এমন একটি পরিবেশ চায়, যেখানে পরিশ্রম করলে সামনে এগোনোর সুযোগ থাকবে। যেখানে দক্ষতার মূল্যায়ন হবে। যেখানে ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিদিন অনিশ্চয়তায় ভুগতে হবে না।

এই প্রবণতার একটি ইতিবাচক দিকও আছে। বিদেশে যাওয়া অনেক তরুণ পরে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক দক্ষতা অর্জন করছেন এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ তৈরি করছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ১ কোটির বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করছেন এবং রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

কিন্তু উদ্বেগের জায়গা হলো—যদি একটি দেশের সবচেয়ে মেধাবী ও উদ্যমী তরুণেরা ক্রমাগত দেশ ছাড়তে চায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সেই দেশ ‘ব্রেইন ড্রেইন’র ঝুঁকিতে পড়ে। গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে তখন সংকট তৈরি হয়।

আজ বাংলাদেশের অনেক পরিবার সন্তানের ভবিষ্যৎ বলতে বিদেশকেই বোঝে। একসময় বাবা-মায়েরা চাইতেন সন্তান বিসিএস ক্যাডার হোক, চিকিৎসক হোক, প্রকৌশলী হোক। এখন অনেকেই চান—সন্তান যেন যে কোনোভাবে দেশ ছাড়তে পারে। এই মানসিক পরিবর্তন একটি রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

তরুণদের বিদেশে যাওয়া বন্ধ করা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। পৃথিবী এখন বৈশ্বিক। মানুষ পড়াশোনা করবে, কাজ করবে, অভিজ্ঞতা অর্জন করবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা তখনই, যখন দেশের ভেতরে আশা হারিয়ে ফেলে মানুষ বিদেশমুখী হয়।

তরুণদের স্বপ্নকে দেশের ভেতরেই ধরে রাখতে হলে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার মানোন্নয়ন, দুর্নীতি ও বৈষম্য কমানো এবং মেধাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা। গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ দরকার। তরুণদের এমন অনুভব দিতে হবে যে, এই দেশেও পরিশ্রম করলে ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব।

কারণ একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ সমাজ। তারা যদি নিজের দেশেই স্বপ্ন দেখতে না পারে, তাহলে উন্নয়নের সব পরিসংখ্যান একসময় অর্থহীন হয়ে পড়বে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।