মমি তৈরিই পেশা, কাজ শেষ হলেই মৃত্যু

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:০৯ পিএম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২

সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজ মহল সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। মমতাজের বিরহ কাটিয়ে উঠতে পারেননি সম্রাট কোনোদিনও। ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে তৈরি করেছেন আগ্রার তাজমহল। সারাবিশ্বে যেটি ভালোবাসার নিদর্শন হয়েই আছে এখনো।

কথিত আছে, তাজমহলের নকশাকারী এবং কারিগরদের কাজ শেষ হওয়ার পর দুই হাত কেটে ফেলেছিলেন সম্রাট। দু’চোখও অন্ধ করে দিয়েছিলেন। তারা যেন এই নকশা কখনো নকল করতে না পারেন, এজন্য ২২ হাজার কারিগর ও ডিজাইনারের এমন হাল করেছিলেন তিনি।

তবে এই ঘটনা কতটুকু সত্য তা নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক আছে ইতিহাসে। কিন্তু এমনই নির্মম পরিণতি হতো মমি কারিগরদের ভাগ্যেও। মমি তৈরি যাদের পেশা ছিল, তাদের কাজ শেষ হওয়ার পর হত্যা করা হতো। এমন তথ্যই উঠে এসেছিল এক গবেষণায়।

jagonews24

মিশরের নাম শুনলেই প্রথমেই যে কথাটা সবার মাথায় আসে, তা হচ্ছে মমি। তবে জানেন কি? শুধু প্রাচীন মিশরেই নয়; চীন, ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের প্রাচীন মানুষ, গুয়াঞ্চস এবং ইনকাসহ দক্ষিণ আমেরিকার অনেক প্রাক-কলম্বিয়ান সমাজেও মমিকরণের প্রচলন ছিল। মিশরীয় সভ্যতারও এক হাজার বছর আগে উত্তর চিলি এবং দক্ষিণ পেরুর চিনচেরাতে মমির সংস্কৃতি চালু হয়।

অন্যদিকে মমি মানেই হচ্ছে মিশরের পিরামিডের কোনো গুপ্তঘর। যেখানে গেলেই পাওয়া যাবে শত শত কফিনবন্দি মমি। মিশরের পিরামিডের ভেতরে এ পর্যন্ত অনেক ফারাও রাজাসহ বিভিন্ন মানুষ, পশু-পাখির মমির সন্ধান পাওয়া গেছে। সেকালে মানুষের ধারণা ছিল মৃত্যুর পর আবারও ফিরে আসা যায়। সেখানেও আছে আরেক জীবন। এজন্য শরীর নষ্ট হতে দিতেন না তারা। সংরক্ষণ করে রাখতেন। সঙ্গে খাবার, পোশাক, গয়না, টাকা-পয়সাসহ পোষা কুকুর-বিড়ালকেও দিয়ে দিতেন।

jagonews24

তবে মমিকরণের প্রথার সঙ্গে মিশরীয়দের আরও একটি অদ্ভুত প্রথা ছিল মমি কর্মীদের হত্যা করা। হায়ারোগ্লিফ লিপির পাঠোদ্ধারের পর প্রকাশ্যে আসে এমনই ভয়ংকর ইতিহাস। খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকের সিসিলিয়ান ঐতিহাসিক ডায়োডোরাস সিকুলাসের গ্রন্থ বিবলিওটেকা হিস্টোরিয়াতেও পাওয়া যায় এমন তথ্য। ওই সময়ের ধারাবাহিক ইতিহাসকে এ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছিলেন ডায়োডোরাস। এই গ্রন্থে মিশরীয়দের জীবনযাপন ও রীতি-রেওয়াজ, নীল নদ, মমির কথা বলেছেন তিনি।

ডায়োডোরাসের কথায়, মমি তৈরির মধ্যে যেমন মিশরীয়দের ধর্মীয় আচার লুকিয়ে আছে; তেমনই আছে বিজ্ঞানের ব্যবহারও। সমাজের কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি মারা গেলে প্রাথমিকভাবে তার দেহ নিয়ে যাওয়া হতো ‘ইবু’ নামের একটি ঘরে। মিশরীয় ভাষায় ‘ইবু’ কথার অর্থ ‘বিশুদ্ধকরণের মন্দির’।

একেকটি মমি তৈরি করতে লাগত ৪০ থেকে ৭০ দিন। মমি করার কাজে একইসঙ্গে চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং রসায়নে পারদর্শী হতে হতো কর্মীদের। মমি তৈরি করতে মৃতদেহ ইবুতে আনার পর তালের তৈরি মদ ও নীল নদের পানি দিয়ে পরিষ্কার করা হতো মৃতদেহ। এই কাজ করতেন, তাদের বলা হতো ‘স্ক্রাইব’। তাদের কাজ ছিল শুধু মৃতদেহ পরিষ্কার করা। অর্থাৎ আচার মেনে মৃতদেহের শুদ্ধিকরণ করতেন স্ক্রাইবরা।

এরপর শুরু হতো অস্ত্রোপচার। শরীর থেকে বের করা হতো হৃৎপিণ্ড ছাড়া বাকি সব পচনশীল অঙ্গ। হৃৎপিণ্ড তারা বের করতেন না। কারণ মিশরীয়দের ধারণা ছিল, মৃত্যুর পরে হৃৎপিণ্ডের ওজন করেই মানুষের আত্মার বিচার করেন আনুবিস। দেহের উপরিভাগের অঙ্গগুলো বড়শির সাহায্যে মুখ দিয়ে বের করে ফেলা হতো। তবে পাকস্থলি ও নিম্নাঙ্গগুলো বের করতে শরীরের বাঁ দিকে সামান্য গর্ত করে নিতেন।

মৃতদেহের শরীরে গর্ত করার এই কাজ করতেন ‘স্লিটার’ নামের একদল কর্মী। বলতে গেলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ছিল তাদেরই। মমিকরণের জন্য এ পদ্ধতি একদিকে যেমন অত্যন্ত জরুরি ছিল; তেমনই মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল মৃতদেহে আঘাত বা ক্ষত তৈরি করা ভয়াবহ পাপ এবং তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এজন্য মিশরীয়রা যে কাজটি করতেন, তা শুনলে যে কারো চক্ষু চড়কগাছ হতে বাধ্য।

jagonews24

স্ক্রাইবদের চিহ্ন করে দেওয়া অংশের মাংস কেটেই দৌড়াতে শুরু করতেন স্লিটাররা। অন্যদিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয়রা তাদের মাথা লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়তে থাকতেন। পাথরের আঘাতে অনেকে গুরুতর আহত হতেন। কেউবা ঘটনাস্থলেই মারা যেতেন।

এই পেশাকে মিশরীয়রা বলতেন অকৃতজ্ঞ কাজ। অকৃতজ্ঞ বলতে যেহেতু মৃতদেহে আঘাত করা ভয়াবহ পাপ, তাই স্লিটাররা ছিলেন পাপী আবার অকৃতজ্ঞ প্রজা। এমনকি তারা মারা গেলে তাদের মৃতদেহের কাছে ঘেঁষতেন না সাধারণ মানুষ।

অন্যদিকে মমিকরণের জগতে সবচেয়ে সম্মানজনক কাজ ছিল স্ক্রাইবদের। তবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য সবচেয়ে বেশি অর্থ পেতেন স্লিটাররা। কারণ তাদের কাজ ছিল ছুরি দিয়ে মাংস কাটা এবং দৌড়ানো। তাই স্লিটারদের শরীরবিদ্যা সম্পর্কে শুধু জ্ঞান থাকলেই চলত না। জানতে হতো দ্রুত দৌড়ানোর কৌশলও।

সূত্র: ওয়ার্ল্ড হিস্টোরি, গ্রাঞ্জ

কেএসকে/এসইউ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।