গাজায় থার্মোবারিক বোমার ব্যবহার, মৃত্যুর পর ‘বাষ্প’ হয়ে গেছে ২৮৪২ জন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৩৭ পিএম, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর, বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয়স্থল থেকে ধোঁয়া ও আগুনের কুণ্ডলী উড়ছে/ ছবি: এএফপি

ছেলে সাদের খোঁজে ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট ভোরে গাজা সিটির আল-তাবিন স্কুলের ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে হাঁটছিলেন ইয়াসমিন মাহানি। পাশে তার স্বামী চিৎকার করছিলেন, কিন্তু তাদের ছেলের কোনো খোঁজ মিলছিল না।

আল জাজিরা আরবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাহানি বলেন, মসজিদে ঢুকে দেখি মাংস আর রক্তের ওপর পা পড়ছে। একের পর এক হাসপাতাল ও মর্গে খুঁজেছি, কিন্তু সাদের কিছুই পাইনি। দাফন করার মতো কোনো অংশও না। এটাই ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর।

মাহানি সেই নারীদের একজন, যাদের প্রিয়জন ইসরায়েলের গাজায় ‘গণহত্যা’ চলাকালে হঠাৎ হারিয়ে গেছে।

আল-জাজিরা আরবির অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান দ্য রেস্ট অব দ্য স্টোরিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গাজার সিভিল ডিফেন্স এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৮৪২ জন ফিলিস্তিনির নথি করেছে, যাদেরকে ‘সম্পূর্ণ বাষ্পীভূত’ বলে বিবেচনা করা হয়েছে। তাদের দেহর কোনো অস্তিত্বই আর পাওয়া যায়নি। যা পাওয়া গেছে, তা শুধু রক্তের ছিটেফোঁটা বা মাংসের খুব ক্ষুদ্র অংশ।

বিশেষজ্ঞ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ইসরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ তাপভিত্তিক ও থার্মোবারিক (ভ্যাকুয়াম বা অ্যারোসল) বোমা নিয়মিতভাবে ব্যবহার করছে, যেগুলো ৩ হাজার ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (৬ হাজার ৩৩২ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেশি তাপ উৎপন্ন করতে সক্ষম।

ভয়াবহ ফরেনসিক হিসাব

২ হাজার ৮৪২ জন পুরোপুরি বাষ্প হয়ে যাওয়ার বিষয়টি কোনো অনুমান নয়। এটি গাজার সিভিল ডিফেন্সের বাস্তব ফরেনসিক গণনা। সংস্থার মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল আল-জাজিরাকে বলেন, আমরা ‘বর্জন পদ্ধতি’ ব্যবহার করেছেন। আমরা লক্ষ্যবস্তু হওয়া বাড়িতে ঢুকে স্পষ্টভাবে জানি যে, হামলার সময় সেখানে কতজন ছিল ও কয়টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, তার তুলনা করি।

যদি কোনো পরিবার আমাদের বলে যে ভেতরে পাঁচজন লোক ছিল এবং আমরা কেবল তিনটি অক্ষত মরদেহ উদ্ধার করি, তাহলে আমরা বাকি দুটিকে ‘বাষ্পীভূত’ বলে গণ্য করি। বাষ্পীভূত তখনই বলি, যখন পুরো অনুসন্ধানে দেয়ালে রক্তের ছিটা বা মাথার ত্বকের মতো ছোট ছোট টুকরো ছাড়া আর কোনো জৈবিক চিহ্ন পাওয়া যায় না।

বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে সন্তান হারানো রফিক বাদরানে তিনি বলেন, আমার চার সন্তানই বাষ্প হয়ে গেল। লক্ষবার খুঁজেছি। কোনো অংশ অবশিষ্ট ছিল না। কোথায় গেল তারা? তিনি আরও বলেন, গাজা ও এখানে ইসরায়েলের চালানো গণহত্যা নিয়ে যেসব আইনি আলোচনা তেমন অর্থ বহন করে না।

বাষ্পীভবনের রসায়ন

আল-জাজিরার অনুসন্ধান বলছে, ইসরায়েলের ব্যবহৃত নির্দিষ্ট রাসায়নিক অস্ত্র কয়েক সেকেন্ডে মানবদেহকে ছাইয়ে পরিণত করে। রাশিয়ার সামরিক বিশেষজ্ঞ ভাসিলি ফাতিগারভ ব্যাখ্যা করেন, থার্মোবারিক অস্ত্র শুধু হত্যা করে না, লক্ষ্যবস্তুকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়।

এই অস্ত্র প্রথমে জ্বালানি-ভর্তি মেঘ ছড়ায়, এরপর তা জ্বালিয়ে বিশাল আগুনের গোলা ও ভ্যাকুয়াম সৃষ্টি করে। দহন দীর্ঘায়িত করতে অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও টাইটানিয়ামের গুঁড়া যোগ করা হয়। ফলে তাপমাত্রা বেড়ে ২৫০০ থেকে ৩০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ড. মুনির আল-বুরশ বলেন, মানবদেহের ৮০ শতাংশ পানি হওয়ায় এত তাপের সামনে দেহের ভেতরের তরল মুহূর্তে ফুটে ওঠে। ১০০ ডিগ্রিতে পানি ফোটে। ৩০০০ ডিগ্রি তাপ, উচ্চচাপ ও অক্সিডেশনে দেহের টিস্যু সঙ্গে সঙ্গে বাষ্পে পরিণত হয়। এটি রসায়নের অনিবার্য ফল।

কোন কোন বোমা ব্যবহার করা হয়েছে

তদন্তে গাজায় ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি নির্দিষ্ট কিছু অস্ত্র শনাক্ত করা হয়েছে যা এই অমানবিক সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন-

এমকে-৮৪ ‘হ্যামার’: ট্রাইটোনাল দিয়ে ভরা এই ৯০০ কেজির (২০০০ পাউন্ড) আনগাইডেড বোমাটি ৩৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৬৩৩২ ফারেনহাইট) পর্যন্ত তাপ উৎপন্ন করে।

বিএলইউ-১০৯ বাঙ্কার বাস্টার: ২০২৪ সালে ইসরায়েলঘোষিত ‘নিরাপদ অঞ্চল’ আল-মাওয়াসিতে হামলায় এই বোমা ব্যবহৃত হয়। এটি ২২ জনকে বাষ্পীভূত করেছিল। এই বোমাতে একটি স্টিলের আবরণ ও একটি বিলম্বিত ফিউজ রয়েছে। এটি আবদ্ধ স্থানের ভিতরে একটি বড় আগুনের গোলা তৈরি করে, যা নাগালের মধ্যে থাকা সবকিছু পুড়িয়ে দেয়।

জিবিইউ-৩৯: এই নির্ভুল গ্লাইড বোমাটি আল-তাবিন স্কুল হামলায় ব্যবহৃত হয়েছিল। এটি এএফএক্স-৭৫৭ বিস্ফোরক ব্যবহার করে। জিবিইউ-৩৯ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে ভবনের কাঠামো মোটামুটি অক্ষত থাকে ও ভেতরে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। এটি মূলত একটি চাপ তরঙ্গের মাধ্যমে মৃত্যু ঘটায় যা ফুসফুস ফাটিয়ে দেয় ও এটির উত্তাপ নরম টিস্যু পুড়িয়ে দেয়।

বেসাল অব সিভিল ডিফেন্স নিশ্চিত করেছে যে মরদেহগুলো নিখোঁজ হয়ে যাওয়া স্থানে জিবিইউ-৩৯ এর ডানার টুকরো খুঁজে পাওয়া গেছে।

আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অস্ত্র ব্যবহার করে নির্বিচার হত্যা কেবল ইসরায়েলকেই দায়ী করে না, বরং যেসব পশ্চিমা দেশ এসব অস্ত্র সরবরাহ করছে, তারাও দায়ী।

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির কাতার ক্যাম্পাসের বক্তা আইনজীবী ডায়ানা বুত্তু বলেন, এটি বৈশ্বিক গণহত্যা। শুধু ইসরায়েলের নয়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ জানে যে এসব অস্ত্র কোনো শিশু ও যোদ্ধার জন্য আলাদা প্রতিক্রিয়া দেখায় না। এরপরও তারা ইসরায়েলকে এসব অস্ত্র পাঠাতে থাকে। তাই এটি আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ।

আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার পতন

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিজে) ইসরায়েলকে গণহত্যা প্রতিরোধের নির্দেশ দিয়েছিল। একই বছরের নভেম্বরে আইসিসি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। কিন্তু ‘গণহত্যা’ বেড়েই চলেছে।

আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক তারিক শানদাব বলেন, গাজার পরীক্ষায় আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে। অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও ৬০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। অবরোধ, অনাহার, অব্যাহত হামলা- সবকিছু মিলেই অপরাধ চলমান।

শানদাব বলেন, জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ইসরায়েলকে ‘অপরাধের দায়মুক্তি’ দিয়েছে। তবে জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো দেশে ‘ইউনিভার্সাল জুরিসডিকশন’ আদালত বিকল্প পথ হতে পারে, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে।

সূত্র: আল-জাজিরা

এসএএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।