আল-জাজিরার প্রতিবেদন

ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভারতজুড়ে হামলার শিকার হচ্ছেন কাশ্মিরি ফেরিওয়ালারা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:৩২ পিএম, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ভারতশাসিত কাশ্মীরের শ্রীনগর শহরের একটি তাঁত কারখানায় শাল তৈরি করছেন দুই কারিগর/ ১৯ মার্চ, ২০২৫ তারিখে তোলা ছবি/ এএফপি

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কাশ্মীরি ফেরিওয়ালাদের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনায় দিশেহারা হয়ে পড়ছেন এসব শ্রমজীবী মানুষ। নিরাপদে বাঁচা নাকি পরিবার চালানোর জন্য পথে বের হওয়া, এই দুইয়ের মাঝে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে তাদের।

হরিয়ানার হিসার শহরে ঘরে ঘরে ঘুরে শাল ও হস্তশিল্প বিক্রি করেন ২৮ বছর বয়সী আয়াজ আহমদ। বহু বছর ধরেই কাশ্মীরি ব্যবসায়ীরা পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে দেশজুড়ে শাল বিক্রি করেন। ভারতে শীতকালের স্বাভাবিক দৃশ্য ছিলি এটি। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘৃণাত্মক হামলাগুলোর কারণে সেই চিত্র পাল্টে গেছে।

আয়াজ এখন একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ চালান, যেখানে প্রায় দুই ডজন কাশ্মীরি ফেরিওয়ালা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সতর্কতা শেয়ার করেন- কোথায় যাওয়া নিরাপদ, কোথায় নয়। তিনি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, অনেক জায়গা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিদিনই কোনো না কোনো সদস্য হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এখন ব্যবসার চেয়ে নিরাপত্তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

‘শুধু কাশ্মীরি মুসলমান পরিচয়ের কারণেই’

গত মাসের শেষ দিকে উত্তরাখণ্ডে ১৮ বছরের তাবিশ আহমদ গণিকে লোহার রড দিয়ে মারধর করেন এক হিন্দু দোকানি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে শোনা যায় ওই দোকানি বলছে, এটা হিন্দুদের গ্রাম, কাশ্মীরি মুসলমানরা এখানে কাজ করতে পারবে না।

অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকা গণির মাথায় ১২টি সেলাই দিতে হয়েছে, হাতে আঘাত, পায়ে হাড়ে ফাটলের কারণে হাঁটতেও পারছেন না। তিনি বলেন, আমি কোনো ভুল করিনি। শুধু কাশ্মীরি মুসলমান বলেই এমন হামলার শিকার হয়েছি।

কাশ্মিরের কুপওয়ারা জেলায় তার বাড়ি থেকে ঘটনাস্থল ৮০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে।

এদিকে, পাঞ্জাবের মোগা জেলায় চলতি জানুয়ারিতে শাল বিক্রি করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন ৫০ বছর বয়সী বশির আহমদ। স্থানীয় হিন্দুদের একটি দল তাকে ‘অনুমতি’ দেখাতে বলে। তিনি বুঝতে পারেন এটি অজুহাত। অনুমতি দেখাতে না পারায় তাকে গালিগালাজ করা হয় ও তার শালের ব্যাগ মাটিতে ছুড়ে ফেলা হয়।

তিনি কাশ্মীরে ফিরে এসে অন্য বিক্রেতাদের কেবল নিরাপদ এলাকাতেই ব্যবসা করার পরামর্শ দেন।

অন্যদিকে, পাঞ্জাবের জলন্ধরে ফল বিক্রি করতেন কুলগামের আবদুল হাকিম। তিনি জানান, স্থানীয় হিন্দু বিক্রেতাদের হয়রানির মুখে তাকে রাজ্য ছাড়ার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়।

৬ ফেব্রুয়ারি তিনি ব্যবসা গুটিয়ে ফিরে আসেন কাশ্মীরে। পেছনে ফেলে যেতে হয় প্রায় এক লাখ রুপির ফল। হাকিমের মা মিসরা বেগম বলেন, ছেলের নিরাপত্তা আগে। খাবার না খেয়ে থাকা লাগলেও তাকে বিপদে ফেলতে চাই না।

শুধু গণি বশির কিংবা হাকিম নন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারতের নানা রাজ্যে কাশ্মীরি বিক্রেতা ও শ্রমিকদের ওপর হামলা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাশ্মিরীদের ‘রাষ্ট্রবিরোধী’, ‘পাকিস্তানের এজেন্ট’ ও ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রচারণা বৃদ্ধি পেয়েছে।

আল-জাজিরা বলছে, ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ভারতজুড়ে মুসলমানবিরোধী ঘৃণা বৃদ্ধি পেয়েছে ও বহু সময় তা দলটির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে উৎসাহিত হয়েছে। কাশ্মিরীদের ক্ষেত্রে এই বৈরিতা আরও দ্বিগুণ, তাদের ধর্ম ও তাদের অঞ্চল- দুটিই এখন সন্দেহ আর ঘৃণার উৎস।

জাতীয়তাবাদী স্লোগান না বলায় হামলা

গত বড়দিনে উত্তরাখণ্ডের কাশীপুরে বিলাল আহমদ নামের এক শাল বিক্রেতাকে মারধর করে হিন্দু যুবকদের একটি দল। কারণ- তিনি ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগান দিতে অস্বীকৃতি জানান। এই স্লোগানটি বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর কাছে রাজনৈতিক-ধর্মীয় পরিচয়ের পরীক্ষায় রূপ নিয়েছে।

হামলার ভিডিও দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে তার পরিবার। পরে বিলাল ব্যবসা গুটিয়ে কাশ্মীরে ফিরে যান।

অনলাইন লাইভে অপমান

হিমাচল প্রদেশের কাংড়া জেলায় অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য সুরজিৎ রাজপুত গুলেরিয়া ১৭ জানুয়ারি এক কাশ্মীরি ফেরিওয়ালাকে রাস্তায় দাড় করিয়ে জেরা করেন ও ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করেন।

লাইভ ভিডিওতে সুরজিৎ রাজপুতকে মুসলমানবিদ্বেষী ও লজ্জাজনক যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করতে শোনা যায়। তিনি কাশ্মিরীদের ‘পাকিস্তানপন্থি’ আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর ওপর পাথর ছোড়ার অভিযোগ তোলেন।

পরে পুলিশ একটি প্রতিবেদন নিলেও আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়।

১ ফেব্রুয়ারি ওই একই সেনাসদস্য আরেক কাশ্মীরি বিক্রেতা মোহাম্মদ রমজানকে আবারও একইভাবে অপমান করেন। রমজান বলেন, আমাকে রাজ্যছাড়া করার হুমকি দেওয়া হয়। তিনি আমার শালের বান্ডিল খুলে ঠাট্টা করে বলেন- এগুলোর ভেতরে শাল নয়, আগ্নেয়াস্ত্র লুকিয়ে রেখেছি।

রমজান বলেন, এমন পরিবেশ শুধু জীবিকা নয়, তাদের পরিবারের জীবনকেও আতঙ্কিত করে তুলেছে।

বাড়ি ফেরা সহজ নয়

তবে কাশ্মীরে ফিরে যাওয়া সবার জন্য সম্ভব নয়। উপত্যকাটিতে দীর্ঘদিন ধরেই বেকারত্ব ভয়াবহ। সীমিত কর্মসংস্থানের কারণে হাজারো কাশ্মীরি তরুণ প্রতিবছর পাঞ্জাব, হরিয়ানা, হিমাচল, উত্তরাখণ্ড ও দিল্লিতে গিয়ে মৌসুমি ব্যবসা করেন।

২০১৯ সালে কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে কেন্দ্রের সরাসরি শাসন আরোপের পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়। অর্থনীতি ধসে পড়ে, কর্মসংস্থান কমে যায়। ফলে অনেকেই জীবিকার জন্য রাজ্যছাড়া হতে বাধ্য হন।

এ অবস্থায় গত বছর পহেলগামে পর্যটকদের ওপর সশস্ত্র হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর কাশ্মিরবিরোধী ক্ষোভ ও প্রচারণা আরও বেড়ে যায়। ভারত এই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে, পাকিস্তান এই অভিযোগ অস্বীকার করে। কয়েক দিনের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে চার দিনের বিমানযুদ্ধ শুরু হয়।

এর মাঝে দেশজুড়ে কাশ্মীরি ছাত্র, ফেরিওয়ালা ও শ্রমিকদের ওপর প্রায় ২০০টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- মারধর, হুমকি, অপমান ও জোরপূর্বক এলাকা ছাড়ানো।

অস্বস্তিকর ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি

ক্রমবর্ধমান হামলার ঘটনায় কাশ্মিরের প্রধান রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল কনফারেন্স ও পিডিপি কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি করেছে।

কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ বলেন, এসব হামলা ‘অগ্রহণযোগ্য’। তিনি উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠকে বিষয়টি তুলেছেন।

অন্যদিকে, পিডিপির প্রধান মেহবুবা মুফতি অভিযোগ করেন- হামলাকারীরা অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের ‘নীরব প্রশ্রয়ে’ এমন কাজ করছেন। মেহবুবা এক্সে লেখেন, ঘৃণাকে রাজনৈতিক লাভের শর্টকাট হিসেবে দেখা হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা কার্যত ভয় দেখানোর রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে।

বিজেপির কাশ্মীরি মুখপাত্র আলতাফ ঠাকুর হামলাগুলোকে ‘ভুল ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, কাশ্মিরিরা দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সরকার এমন আচরণ বরদাস্ত করবে না।

তবে কাশ্মিরের আইনপ্রণেতা মোহাম্মদ ইউসুফ তারিগামী বলেন, হামলার এই ধারা উদ্বেগজনক ও কাশ্মিরবাসীর কাছে ‘সতর্কতা সংকেত’ পাঠাচ্ছে।

তিনি বলেন, কাশ্মিরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শাল বিক্রেতারা জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন রাজ্যে যান। কিন্তু বারবার হামলা ও ভয় দেখানো তাদের মনে গভীর অনিরাপত্তা তৈরি করছে।

সূত্র: আল-জাজিরা

এসএএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।