উচ্চশিক্ষায় তুরস্ক এখন মুসলিম শিক্ষার্থীদের শীর্ষ গন্তব্য
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তুরস্কের প্রতি শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ দিনদিন বাড়ছে, বিশেষ করে মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য। ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের পাশাপাশি শিক্ষার মান, ভৌগোলিক নিকটতার কারণেও তুরস্কে মুসলিম শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার আজকা মাউলা ইসকান্দার মুদা সেই উদাহরণের একটি উজ্জ্বল নাম। ইস্তাম্বুলের নামকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কোচ ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করছেন তরুণ এই শিক্ষার্থী। নিক্কেই এশিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ২৬ বছর বয়সী মুদা বলেন, আমার লক্ষ্য অনেক বড়। আমি কম্পিউটিংয়ের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে চাই। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে তিনি ভবিষ্যতে এনভিডিয়া, ইন্টেল ও মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চান।
মুদা জানান, ইউরোপের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ থাকলেও তিনি স্নাতক ডিগ্রির জন্য বেছে নিয়েছিলেন আংকারার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শীর্ষ বিদ্যাপীঠ মিডল ইস্ট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি (মেটু)। তার ভাষায়, শিক্ষাব্যয় একই হলেও মেটুতে গবেষণা সুবিধা বেশি।
তুরস্কে এরকম শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে দেশটিতে শুধু ইন্দোনেশিয়া থেকেই পড়ছে ৫ হাজার ৪৬০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী, যা গত এক দশকে বেড়েছে প্রায় ৬৫৫ শতাংশ। পাকিস্তানি শিক্ষার্থীর সংখ্যা একই সময়ে চারগুণ বেড়ে ৬ হাজার ৭৫ ছাড়িয়েছে। সামগ্রিকভাবে, বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত ১০ বছরে বেড়েছে ২৫১ শতাংশ। আর শুধু ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে এই সংখ্যা পৌঁছেছে রেকর্ড ৩ লাখ ৭৯ হাজারে, জানাচ্ছে তুরস্কের উচ্চশিক্ষা পরিষদ (ওয়াইওকে)।
২০১৩ সালে যেখানে তুরস্কে বিদেশি শিক্ষার্থীর হার ছিল ০.৯ শতাংশ, সেখানে এখন তা ৫.৫ শতাংশ। তুরস্কের লক্ষ্য ২০২৮ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৫ লাখে উন্নীত করা ও পরবর্তী সময়ে তা দ্বিগুণ করা।
ওয়াইওকের সভাপতি এরল ওজভার নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, তুরস্ক এখন শিক্ষার্থী টানার প্রতিযোগিতায় মালয়েশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের সঙ্গে সমানতালে চলছে। তুরস্কে বিদেশি শিক্ষার্থীর ৮০ শতাংশই আসে মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ থেকে। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে এবং ১৪ শতাংশ আফ্রিকা থেকে।
ওজভার বলেন, ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনই তুরস্কে মুসলিম শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার মান, ভৌগোলিক নিকটতা ও তুলনামূলক স্বল্প শিক্ষাবয়সও শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করছে।
মুদার কথায়ও সেই বাস্তবতা ফুটে ওঠে। মেটুতে করা তার গবেষণা নিবন্ধ কোচ ইউনিভার্সিটির নজরে পড়ে। ফলে পেলেন পূর্ণ বৃত্তি, যাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে- শিক্ষাব্যয়, ডরমিটরি ও মাসিক ভাতা।
তিনি জানান, ফোটনিক নিউরাল নেটওয়ার্ক নিয়ে কাজ করার সময় নিজের ডিজাইন করা অপটিক্যাল চিপ তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের লিথোগ্রাফি মেশিনে ঘণ্টায় মাত্র ১৫০ লিরা (প্রায় ৩ ডলার) খরচে তৈরি করতে পারছেন। চিপ তৈরিতে তার মোট খরচ হয়েছে মাত্র ২ হাজার লিরা, যা ইউরোপে হলে হাজার হাজার ইউরো লাগার আশঙ্কা ছিল।
২০২৬ সালের টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংয়ে তুরস্কের চারটি বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা পেয়েছে শীর্ষ ৫০০ এর তালিকায়। সেগুলোর মধ্যে সবার উপরে কোচ ইউনিভার্সিটি, তারপর মেটু ও ইস্তাম্বুলের বেসরকারি সাবাঞ্জি ইউনিভার্সিটি। শীর্ষ ১ এর তালিকায় তুরস্কের ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।
বিদেশি শিক্ষার্থীর উৎস দেশ হিসেবে ৬৫ হাজার ৮৮৪ জন শিক্ষার্থী নিয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে তুর্কমেনিস্তান, যা মোট বিদেশি শিক্ষার্থীর ১৭ শতাংশের বেশি। এরপর আছে সিরিয়া, আজারবাইজান, ইরান, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তান।
ওজভার জানান, দক্ষিণ এশিয়া, আসিয়ান ও পূর্ব এশিয়া থেকে আরও শিক্ষার্থী আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে তুরস্ক, কারণ উচ্চশিক্ষার চাহিদা এই অঞ্চলগুলোতে দ্রুত বাড়ছে। এরই মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ব্রুনেই, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের সঙ্গে উচ্চশিক্ষায় সহযোগিতা চুক্তি করেছে তুরস্ক।
এছাড়া তুর্কি বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি সংগঠনগুলো আজারবাইজান, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তানে একাডেমিক ইউনিট খুলেছে। ইরাক ও পাকিস্তানেও একই পরিকল্পনা রয়েছে।
গত অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান জানান, বিদেশি শিক্ষার্থীরা তাদের ৯৫ শতাংশ টিউশন, বাসস্থান ও অন্যান্য ব্যয় নিজেরাই বহন করেন ও তারা তুরস্কের অর্থনীতিতে বছরে ৩ বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি ডলার অবদান রাখে।
তবে কিছু শিক্ষা বিশেষজ্ঞ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি মান কমিয়ে বেশি শিক্ষার্থী নেওয়ার সমালোচনা করেন। শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও লেখক আব্বাস গুচলু বলেন, ফি-নির্ভর আকর্ষণ থাকলেও, ভর্তি মান উন্নত করা গেলে শিক্ষার মানও বাড়বে।
ওজভার জানান, শিক্ষার্থীর মান নিশ্চিত করতে তারা টিআর-ওয়াইওএস নামে নিজেদের বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা ব্যবহারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উৎসাহিত করছেন। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড- ইন্টারন্যাশনাল ব্যাকালোরিয়েট, জার্মান আবিতুর ও এসএটির ফলাফলও মূল্যায়ন করে থাকে।
বর্তমানে তুরস্কে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ৭৫ শতাংশ তুর্কি ভাষায় পড়ানো প্রোগ্রামে ভর্তি হন আর ২৩ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজি মাধ্যমে পড়েন। তুরস্কের সরকার ইংরেজি কারিকুলামে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বাড়াতে চায়। তুর্কি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের প্রথমে এক বছর ভাষা কোর্স করতে হয়, তারপর চার বছরের স্নাতক ক্লাস শুরু হয়।
তুর্কি ও অন্যান্য তুর্কিক ভাষা দক্ষিণ ককেশাস, মধ্য এশিয়া, বলকান ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু অঞ্চলে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বজুড়ে তুর্কি টিভি নাটকের জনপ্রিয়তাও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়িয়েছে।
মধ্য এশিয়ার মতো মধ্যপ্রাচ্য থেকেও তুরস্কে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী আসে। বিশেষ করে- সিরিয়া, ইরান, ইরাক, মিশরসহ অন্যান্য দেশ থেকে।
ইস্তাম্বুলের রাষ্ট্রীয় ইয়িলদিজ টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির পাকিস্তানি শিক্ষার্থী মোহাম্মদ বিলাল হাসান জানান, তার সবচেয়ে বড় সমস্যা ভাষা। কোর্স ইংরেজিতে হলেও অনেক অধ্যাপক মাঝেমধ্যেই তুর্কিতে ফিরে যান। তাই তুর্কি জানা জরুরি।
ইরানের সামার কাজেমিনেজাদ, ইয়িলদিজের তৃতীয় বর্ষের ব্যবসা–প্রশাসন শিক্ষার্থী, প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে চেয়েছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। এরপর তিনি কানাডায় আবেদন করেন, কিন্তু করোনা ভাইরাসের কোভিডের বিলম্বে তাঁর ভিসা শেষ হয়ে যায়।
ওজভার বলেন, যেসব শিক্ষার্থী ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারছে না, তাদের জন্য তুরস্ক ‘একটি নিরাপদ ও মানসম্মত বিকল্প।’ সেই লক্ষ্যেই তারা আন্তর্জাতিক শিক্ষা মেলায় অংশগ্রহণ বাড়াচ্ছেন ও ডিজিটাল প্রচারণা জোরদার করছেন।
ইরানের আজারবাইজানি তুর্কিক জনগোষ্ঠীর সদস্য কাজেমিনেজাদ জানান, তুরস্ক তার কাছে অনেকটা নিজের বাড়ির মতোই। বার্ষিক টিউশন ৫০ হাজার লিরা (১ হাজার ১৪৬ ডলার) ছাড়াও তিনি মাসে ২৫০-৩০০ ডলার ব্যয় করেন (আবাসন ছাড়া)।
কাজেমিনেজাদ স্বীকার করেন, তুরস্কে ৩০ শতাংশের বেশি মুদ্রাস্ফীতি তাকে উদ্বিগ্ন করে। তবে তার ভাষায়, তুরস্ক ঘরবাড়ির মতোই। ইস্তাম্বুল থেকে ইরান যেতে মাত্র তিন ঘণ্টার ফ্লাইট। সংস্কৃতি, জীবনের খরচ, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা- সবই আমাদের দেশের মতো।
সূত্র: নিক্কেই এশিয়া
এসএএইচ