ইরানের ৯ নম্বর শর্ত

‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’: জোটকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রেখেছে তেহরান

কামরুজ্জামান মামুন
কামরুজ্জামান মামুন কামরুজ্জামান মামুন , সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ০৪:৪৭ পিএম, ১০ এপ্রিল ২০২৬
এআই

পারমাণবিক অস্ত্র ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির মিথ্যা অভিযোগ এনে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় ইসরায়েল-মার্কিন যৌথ বাহিনী। যৌথ বাহিনীর আগ্রাসনে ইরানের ইমাম আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কিছু শীর্ষ স্থানীয় নেতা নিহত হয়। তবে এই যুদ্ধে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা তাদের সমর্থিত বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর ব্যাপক প্রতিরোধে মুখে পড়ে যৌথ বাহিনী। এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি বন্ধ এবং দীর্ঘ সময় যুদ্ধের ব্যয় বহন করতে গিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এই অবস্থায় মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) আগ্রাসনের প্রায় ৩৯ দিন দিন পর ইরানের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাব মেনে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই যুদ্ধবিরতিতে আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে পাকিস্তান। পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের প্রচেষ্টায় আজ শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ইসলামাবাদে আলোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হবার কথা রয়েছে।

তবে যে আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে তা কতটুকু সফল হবে সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে রাশিয়া। রাশিয়ার নিরাপত্তা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেন, ট্রাম্পের ১০ দফা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে সম্মত হওয়াটাই ইরানিদের জন্য একটি বিজয়। এখন প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটন আদৌ এই প্রস্তাবে সম্মত হবে কি না।
মেদভেদেভ দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি মেনে নেবে না, যার ফলে আবার সংঘাত শুরু হতে পারে।

আরও পড়ুন>>
১০ দফা শর্তে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ‘ইরানের বিজয়’: দিমিত্রি মেদভেদেভ

ইরানের ৯ নম্বর শর্ত:

ইরানের প্রস্তাবিত ১০ দফার ৯ নম্বর যে শর্ত দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ৯ নম্বর দফায় ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সমর্থিত প্রতিরোধ জোটগুলোর (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স) বিরুদ্ধে সব ধরনের আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে। তবে ইরানের এই শর্ত অক্ষ শক্তি মেনে নেবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ কী?

ইরানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ জোট বুঝাতে এই টার্ম ব্যবহার করা হয়। অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের একটি অনানুষ্ঠানিক জোট বা নেটওয়ার্ক যা মূলত ইরানপন্থি প্রতিরোধ শক্তিগুলো নিয়ে গঠিত এবং যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবৈধ প্রভাবের বিরোধিতা করে।

কারা এতে অন্তর্ভুক্ত?

এই জোটে সাধারণত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে- লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী, ইরাকের মিলিশিয়াদের সংগঠন পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স (পিএমএফ) এবং সিরিয়ায় উৎখাত হওয়া বাশার আল-আসাদের সরকারি বাহিনী। ইরাকে হারকাত আল-নুজাইবা, বদর অর্গানাইজেশন, কাতাব হিজবুল্লাহ এবং আসাইব আহল আল-হক সংগঠন মিলে পিএমএফ গঠন করেছে যা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত দেশটির আধা-সামরিক বাহিনী।

মূল লক্ষ্য কী?

১) মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের প্রভাব কমানো

২) ইসরায়েলের বিরোধিতা করা

৩) এই অঞ্চলে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বাড়ানো

ইরান যুদ্ধে ‘প্রতিরোধ জোটে’র অবদান:

লেবাননের হিজবুল্লাহ:

ইরানের ওপর হামলার প্রতিবাদে ২ মার্চ যুদ্ধ শুরুর মাত্র ৩ দিনের মাথায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার দিনই লেবাননে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ১৭৩৯ জন নিহত হবার খবর পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন>>
অবশেষে আলোচনায় রাজি ইসরায়েল, ‘প্রস্তুতিমূলক’ বৈঠক বলছে লেবানন

ইয়েমেনের হুথি:

এরপর গত ১৫ মার্চ ইরানের প্রতি সমর্থন জানায় ইয়েমেনে সশস্ত্র সংঠন হুথি। ইরানে চলমান ইসরায়েল-মার্কিন অভিযানে সমর্থন দেওয়া হলে মৃত্যুর দরজা খ্যাত ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালি বন্ধ করার হুমকি দেয় আনসার আল্লাহ মুভমেন্ট (হুথি)। এর পর মার্চের শেষ সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিলে যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধের হুশিয়ারি দেয় হুথি বিদ্রোহীরা।

আরও পড়ুন>>
ইরানের সমর্থনে ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালি বন্ধের হুমকি হুথি বিদ্রোহীদের

ইরাকের পিএমএফ:

ইরাকে মার্কিন বাহিনীর ঘাঁটি লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি হামলা চালায় পিএমএফ। এমনকি বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে হওয়া হামলাও পিএমএফ চালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরানের সমর্থনে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে ৫০ জনের ওপর পিএমএফ যোদ্ধা নিহত হবার খবর পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন>>

ইরাকে মার্কিন হামলায় আঞ্চলিক কমান্ডারসহ ১৫ সেনা নিহত

যুদ্ধবিরতি ও ৯ নম্বর শর্তে ইরানের অনড় অবস্থান:

ইরানের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর যুদ্ধবিরতির আলাপ উঠার আগেই নেতানিয়াহু ঘোষণা দেয় যে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি হলেও লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখবে ইসরায়েল। এমনকি দুই দিন আগেও ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পিট হেগসেথ জানান, এই যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। এর ধারাবাহিকতায় যুদ্ধবিরতির পরপরই ১০ মিনিটে ১০০ বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। তবে, প্রক্সি সংগঠনগুলোর বিশ্বাসের মর্যাদা দিয়েছে ইরান।

ইরানে পক্ষ থেকে যৌথ বাহিনীকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়। এই বার্তা ইরান জানায়, লেবাননসহ সকল প্রতিরোধ শক্তির ওপর হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে বসবে না ইরান। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে লেবাননে হামলা বন্ধ ও আলোচনায় রাজি হয়েছে ইসরায়েল।

কেএম 

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।