ট্রাম্প-ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস ‘চাচাতো ভাই’: ডেইলি মেইলের গবেষণা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাই। পড়তে অবাক লাগলেও ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলের এক বিশদ গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, দুজনেরই বংশসূত্র একই স্কটিশ অভিজাত পরিবারের সঙ্গে যুক্ত।
ডেইলি মেইলের পক্ষে করা বিস্তারিত গবেষণায় দেখা গেছে, ট্রাম্প ও কিং চার্লসের অভিন্ন পূর্বপুরুষ হচ্ছেন তৃতীয় আর্ল অব লেনক্স, যিনি স্কটল্যান্ডের রাজা জেমস দ্বিতীয়ের প্রপৌত্র ছিলেন। এই সূত্রে তারা ১৫তম কাজিন বা দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাই।
তবে এই অভিন্ন পূর্বপুরুষের পরিণতি ছিল করুণ। লর্ড লেনক্স শিশু রাজা জেমস পঞ্চমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক তীব্র ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন ও ১৫২৬ সালে লিনলিথগো ব্রিজের যুদ্ধে পরাজিত হন।
বন্দি হওয়ার পর তিনি হত্যার শিকার হন। তার ছেলে, চতুর্থ আর্ল অব লেনক্স, পরে লর্ড ডার্নলি নামে এক পুত্রের জন্ম দেন, যিনি ছিলেন স্কটল্যান্ডের রানি মেরির স্বামী। তাদের সন্তানই পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের রাজা জেমস প্রথম হন, যার থেকে স্টুয়ার্ট রাজবংশ ও পরবর্তীতে হাউস অব উইন্ডসরের বংশধারা গড়ে ওঠে।
লর্ড লেনক্সের আরও কয়েকজন সন্তান ছিল, যার মধ্যে লেডি হেলেন নামে এক কন্যা ১১তম আর্ল অব সাদারল্যান্ডকে বিয়ে করেন। তাদের ছেলে, ১২তম আর্ল বিষ প্রয়োগে হত্যাচেষ্টার শিকার হন- যেখানে ১১তম আর্ল নিহত হন- কিন্তু তিনি (১২তম আর্ল) বেঁচে যান ও লেডি জেন নামে এক কন্যার জন্ম দেন।
লেডি জেন পরে ক্ল্যান ম্যাকের প্রধানকে বিয়ে করেন। তাদের ছেলে ডোনাল্ড ম্যাকে, যিনি একাধিকবার বিয়ে করেছিলেন পরে প্রথম লর্ড রে উপাধি পান ও আরেকজন কিং চার্লসের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন।
এই ডোনাল্ড ম্যাকে থেকে শুরু করে ম্যাকে ও পরে ম্যাকলিওড বংশের মাধ্যমে এই বংশধারা এগিয়ে আসে মেরি অ্যান ম্যাকলিওড পর্যন্ত, যিনি ১৯৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি সম্পত্তি ব্যবসায়ী ফ্রেড ট্রাম্পকে বিয়ে করেন ও তাদের পাঁচ সন্তানের মধ্যে ১৯৪৬ সালে জন্ম নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি ছিলেন চতুর্থ সন্তান।
ট্রাম্প এর আগেও বলেছেন, তার মা রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের বড় ভক্ত ছিলেন ও তিনিও রানির প্রতি একই ধরনের শ্রদ্ধাবোধ পোষণ করতেন। তিনি একবার বলেন, তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব ভালো ছিল। তিনি অসাধারণ ছিলেন। আমি তাকে পছন্দ করতাম, তিনিও আমাকে পছন্দ করতেন।
২০১৮ সালে তাদের প্রথম সাক্ষাতে রানির কাছ থেকে প্রিয় প্রেসিডেন্টের নাম জানার চেষ্টা করেও তিনি তা জানতে পারেননি, রানির এই নিরপেক্ষ অবস্থান তাকে মুগ্ধ করেছিল। সেই সাক্ষাৎ এতটাই সফল হয়েছিল যে, সংক্ষিপ্ত সৌজন্য সাক্ষাৎ প্রায় এক ঘণ্টা স্থায়ী হয় ও পরের বছর পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে রূপ নেয়, যা রানির শাসনামলের শেষ রাষ্ট্রীয় সফর ছিল।
এছাড়া গত বছর উইন্ডসরে কিং চার্লসের আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় সফরেও ট্রাম্প বেশ সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি বলেন, রাজা একজন অসাধারণ মানুষ ও খুব কঠোর লড়াই করেছেন। তিনি একজন যোদ্ধা। আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো।
এই সবকিছু মিলিয়ে এখন ট্রাম্পের জন্য ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে সরাসরি বংশগত সম্পর্ক আবিষ্কার নিঃসন্দেহে আনন্দের বিষয় হতে পারে।
এর আগে অনলাইন বংশতালিকা গবেষকরা ট্রাম্পের পারিবারিক ইতিহাস নির্ধারণে সমস্যায় পড়েছিলেন, কারণ পুরনো স্কটিশ নথিতে বিভ্রান্তি ও ঘাটতি ছিল।
তবে ডেইলি মেইলের সাবেক গবেষণা সম্পাদক ও অভিজ্ঞ বংশতত্ত্ববিদ রবার্ট ব্যারেট একাধিক ভূমি, গির্জা ও অভিজাত বংশের নথি বিশ্লেষণ করে এই সংযোগটি বের করেন। উদাহরণস্বরূপ, ডোনাল্ড ম্যাকে থেকে ট্রাম্পের বংশসূত্র কিছুটা জটিল, কারণ তার কন্যার প্রথম বিয়ে হয়েছিল ম্যাকডোনাল্ড পরিবারের একজনের সঙ্গে, পরে তিনি হিউ মনরো নামে এক ধর্মযাজককে বিয়ে করেন ও ট্রাম্পের বংশধারা সেখান থেকেই এসেছে।
এই প্রাচীন ডোনাল্ড ম্যাকে ও কিং চার্লসের সম্পর্কও ছিল ‘বিশেষ’। ডোনাল্ড ম্যাকে ইংলিশ গৃহযুদ্ধে ইংলিশ সিভিল ওয়ারে কিং চার্লস প্রথমে পক্ষে লড়াই করেন, একসময় কারাবন্দি হন ও পরে ডেনমার্কে নির্বাসনে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি বিতর্কপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন ও একবার দ্বন্দ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া ঠেকাতে তাকে টাওয়ার অব লন্ডন-এ আটক রাখা হয়েছিল।
ট্রাম্প আরও জানতে পেরে খুশি হতে পারেন যে তার বংশসূত্র নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কের রাজপরিবারের সঙ্গেও যুক্ত। এতে ডেনমার্ক-নিয়ন্ত্রিত গ্রিনল্যান্ড দখলের তার পরিকল্পনাও নতুন দৃষ্টিকোণ পেতে পারে, কারণ ট্রাম্প ও রাজা ফ্রেডেরিক দশম- উভয়েই ডেনমার্কের রাজা ক্রিশ্চিয়ান প্রথমের বংশধর।
এতে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্প আরও কূটনৈতিক হবেন নাকি মালিকানাবোধ বাড়বে—তা সময়ই বলে দেবে।
তবে ট্রাম্পের নতুন এই রাজকীয় বংশসূত্র তাকে একটি অস্বস্তিকর সত্যের মুখেও দাঁড় করিয়েছে। তিনি একই সঙ্গে সেই রাজা তৃতীয় জর্জের আত্মীয়, যাকে ‘স্বৈরাচারী রাজা’ বলা হতো ও যাকে ১৭৭৬ সালে বিতাড়িত করার মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভ করে।
সূত্র: ডেইল মেইল
এসএএইচ