দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন

ইউরোপীয় কৃষি ভর্তুকির কোটি কোটি ইউরো যাচ্ছে আমিরাতের রাজপরিবারের পকেটে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৩৫ পিএম, ০৮ মে ২০২৬
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান/ ছবি: এএফপি

সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাসক রাজপরিবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কৃষি ভর্তুকি থেকে কোটি কোটি ইউরো সুবিধা পাচ্ছে। ইউরোপে উৎপাদিত এসব ফসলের বড় অংশই পরে উপসাগরীয় অঞ্চলে রপ্তানি করা হচ্ছে।

ডিসমগের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে, যা পরে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, আল নাহিয়ান পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো গত ছয় বছরে রোমানিয়া, ইতালি ও স্পেনে থাকা কৃষিজমির জন্য ৭ কোটি ১০ লাখ ইউরোরও বেশি ভর্তুকি পেয়েছে।

আল নাহিয়ান পরিবারকে বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী রাজপরিবার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ৩২০ বিলিয়ন বা ৩২ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। এই বিপুল সম্পদের বড় অংশ এসেছে আমিরাতের বিশাল তেলসম্পদ থেকে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘কমন অ্যাগ্রিকালচারাল পলিসি’ (ক্যাপ) বা সাধারণ কৃষিনীতি কর্মসূচির আওতায় দেওয়া ভর্তুকি পুরো ইইউ বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবছর কৃষক ও গ্রামীণ উন্নয়নে প্রায় ৫৪ বিলিয়ন বা ৫ হাজার ৪০০ কোটি ইউরো ব্যয় করা হয়।

তবে এই বিপুল অর্থের একটি অজানা অংশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতেও যাচ্ছে, যাদের মধ্যে স্বৈরশাসিত রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত কোম্পানিও রয়েছে।

ডিসমগ, স্পেনের এল ডিয়ারিও ও রোমানিয়ার সংবাদমাধ্যম জি৪মিডিয়ার যৌথ অনুসন্ধানে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হাজার হাজার ক্যাপ সুবিধাভোগীর তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল নাহিয়ান পরিবার ও দেশটির সার্বভৌম সম্পদ তহবিল এডিকিউ-নিয়ন্ত্রিত কোম্পানি ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে অন্তত ১১০টি ভর্তুকি পরিশোধ গেছে।

এসব অর্থের সবচেয়ে বড় অংশ পেয়েছে রোমানিয়ার কৃষি কোম্পানি অ্যাগ্রিকস্ট। প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় একক খামারের মালিক। এর আয়তন ৫৭ হাজার হেক্টর বা প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার একর, যা প্যারিস শহরের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বড়।

ইইউ কৃষি ভর্তুকি যে বড় জমির মালিকদেরই বেশি সুবিধা দেয়, তা আগেই উঠে এসেছিল। ২০২৪ সালে গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, মাত্র ১৭ জন বিলিয়নিয়ার ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ৩ বিলিয়ন ইউরোরও বেশি ভর্তুকি পেয়েছেন।

শুধু ২০২৪ সালেই অ্যাগ্রিকস্ট সরাসরি ১ কোটি ৫ লাখ ইউরো ভর্তুকি পেয়েছে। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় একটি খামারের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৬০০ গুণ বেশি।

মানবাধিকারকর্মীরা বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। কারণ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। দেশটিকে মানবাধিকারকর্মীদের কারাবন্দি করা, সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং নির্যাতনের অভিযোগে সমালোচনা করা হয়, যদিও এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে আমিরাত।

এই প্রতিবেদনে উল্লেখিত আল নাহিয়ান পরিবার ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি। এডিকিউও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

এমন সময় এই তথ্য সামনে এলো, যখন ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকরা কৃষি ভর্তুকি ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ইউরোপীয় কমিশন ২০২৮ থেকে ২০৩৪ সালের জন্য নতুন ক্যাপ ভর্তুকি প্রস্তাব প্রকাশ করে। সেখানে একজন কৃষকের জন্য বছরে সর্বোচ্চ ১ লাখ ইউরো পর্যন্ত ভর্তুকি সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।

ইউরোপীয় কমিশনের এক মুখপাত্র বলেন, ক্যাপের আয় সহায়তা আরও লক্ষ্যভিত্তিক হওয়া উচিত এবং বড় খামারের জন্য ভর্তুকি কমানো বা সীমাবদ্ধ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও কাউন্সিলকে নতুন প্রস্তাব সমর্থনের আহ্বান জানান।

ইউরোপিয়ান এনভায়রনমেন্ট ব্যুরোর প্রকৃতি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক পরিচালক ফস্টিন বাস-ডেফোসেজ বলেন, ক্যাপ ইউরোপীয় কৃষকদের সহায়তা করছে না; বরং এটি সবচেয়ে ধনী জমির মালিকদের আরও ধনী করছে। এখন আরও খারাপ বিষয় হলো, এটি স্বৈরশাসিত সরকারগুলোকে শক্তিশালী করছে।

আল নাহিয়ান পরিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজপরিবার। সাতটি স্বশাসিত আমিরাত নিয়ে গঠিত দেশটির প্রতিটি অঞ্চলের আলাদা রাজপরিবার থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে রয়েছেন আবুধাবির শাসক ও আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান।

মাত্র ১৫ বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে এই আমিরাতি রাজবংশ বৈশ্বিক কৃষিখাতে বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে তারা বিপুল কৃষিজমি ও কৃষিভিত্তিক কোম্পানি কিনেছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর কৃষিজমির ওপর আমিরাতের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত আমিরাতের খাদ্য নিরাপত্তা কৌশলের অংশ। কারণ অতিরিক্ত গরম, পানির সংকট ও বালুময় মাটির কারণে দেশটিতে কৃষিকাজ কঠিন। বর্তমানে আমিরাত তার মোট খাদ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইউরোপে এই সম্প্রসারণ মূলত স্পেন, ইতালি ও রোমানিয়ার তিনটি বড় কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে।

রোমানিয়ার বিশাল কৃষি প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রিকস্ট ২০১৮ সালে প্রায় ২৩ কোটি ইউরো দিয়ে কিনে নেয় আমিরাতভিত্তিক কৃষি কোম্পানি আল দাহরা। এই আল দাহরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রেসিডেন্টের ভাই শেখ হামদান বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। পরে ২০২০ সালে আবুধাবির সার্বভৌম তহবিল এডিকিউ কোম্পানিটির ৫০ শতাংশ মালিকানা কিনে নেয়।

বর্তমানে আল দাহরার মালিকানা কাঠামো নিয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি তথ্য নেই। তবে ডিসমগ জানতে পেরেছে, কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সঙ্গে এখনো আল নাহিয়ান পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এর চেয়ারম্যান শেখ হামদান বিন জায়েদ এবং তার ছেলে শেখ জায়েদ বিন হামদান আল নাহিয়ান, যিনি আমিরাতের প্রেসিডেন্টের মেয়ের স্বামী।

২০১২ সাল থেকে আল দাহরা স্পেনেও একাধিক কৃষি কোম্পানি অধিগ্রহণ করেছে, যাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ৮ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমি। ডিসমগের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠান ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৫০ লাখ ইউরোর বেশি ক্যাপ ভর্তুকি পেয়েছে।

আমিরাতের স্পেন ও রোমানিয়ার খামারগুলোতে মূলত পশুখাদ্যের জন্য আলফালফা ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন করা হয়। উৎপাদিত পণ্যের বেশিরভাগই উপসাগরীয় অঞ্চলে রপ্তানি করা হয়। আল দাহরার সঙ্গে আমিরাত সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পশুখাদ্য সরবরাহ চুক্তিও রয়েছে, যা দেশটির দ্রুত সম্প্রসারিত দুগ্ধশিল্পে ব্যবহৃত হয়।

২০২২ সালে এডিকিউ প্রায় ৮৩ কোটি ডলার মূল্যের ফল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইউনিফ্রুটি কিনে নেয়। ডিসমগের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিক্রির পরবর্তী তিন বছরে ইউনিফ্রুটির ইতালির খামারগুলো অন্তত ১ লাখ ৮৬ হাজার ইউরো ভর্তুকি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমিরাতের কাছে এত বড় অঙ্কের ভর্তুকি পৌঁছানো দেখিয়ে দেয় যে ক্যাপ ভর্তুকি হিসাবের পদ্ধতিতেই বড় সমস্যা রয়েছে। কারণ এই ভর্তুকি মূলত জমির পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।

ইউরোপীয় কমিশনের নতুন প্রস্তাবে সরাসরি ভর্তুকি সীমা নির্ধারণ করা হলেও, তা ইউরোপের মাত্র শীর্ষ ০.৫ শতাংশ জমির মালিককে প্রভাবিত করবে। অথচ বর্তমানে এই গোষ্ঠী পুরো ক্যাপ বাজেটের ১৬ শতাংশ পাচ্ছে।

অস্ট্রিয়ার গ্রিন পার্টির এমইপি ও কৃষিবিষয়ক সমন্বয়ক থমাস ওয়েইৎজ বলেন, আমিরাতের এই ভর্তুকি পাওয়া এমন এক কেলেঙ্কারি, যা সবার চোখের সামনেই লুকিয়ে আছে।

তিনি বলেন, ইউরোপের প্রকৃত ৯৯ শতাংশ কৃষক ১ লাখ ইউরোর কম ভর্তুকি পান। এই অর্থ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর রাজবংশের জন্য নয়, বরং প্রকৃত ইউরোপীয় কৃষকদের সহায়তার জন্য ছিল।

ভর্তুকিপ্রাপ্ত এসব খামার ইউরোপে আল দাহরা ও এডিকিউর কৃষি সম্প্রসারণের মাত্র একটি অংশ। এর বাইরে গ্রিস ও বুলগেরিয়ায় তাদের শস্যকল এবং সার্বিয়ায় বিশাল দুগ্ধ খামারও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাগজে-কলমে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হলেও এডিকিউ কার্যত আমিরাতের রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।

এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক মার্ক ভ্যালেরি বলেন, রাষ্ট্রীয় কোষাগার আর রাজপরিবারের ব্যক্তিগত সম্পদের মধ্যে স্পষ্ট কোনো সীমারেখা নেই। এটি অত্যন্ত কর্তৃত্ববাদী ও দমনমূলক একটি শাসনব্যবস্থা, যেখানে রাষ্ট্রের অর্থ ও পারিবারিক অর্থ প্রায় একাকার হয়ে গেছে।

২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, আমিরাতের সাতটি সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার।

এসব সম্পদের বড় অংশ প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নিয়ন্ত্রণে। ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এডিকিউর চেয়ারম্যান ছিলেন শেখ তাহনুন বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, যিনি প্রেসিডেন্টের ভাই ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এডিকিউ আবুধাবির নতুন সার্বভৌম তহবিল ‘লিমাদ হোল্ডিং’-এর অংশ হয়েছে। এর চেয়ারম্যান শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, যিনি প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ ছেলে ও সম্ভাব্য উত্তরসূরি।

ডিসমগ বলছে, তাদের অনুসন্ধানে উঠে আসা ভর্তুকির পরিমাণ হয়তো মোট চিত্রের একটি অংশমাত্র। কারণ সরকারি তথ্য অসম্পূর্ণ এবং আমিরাতি কোম্পানিগুলোর মালিকানা কাঠামো যথেষ্ট স্বচ্ছ নয়।

ইইউভুক্ত সব দেশকেই ক্যাপ ভর্তুকি পাওয়া খামার ও মালিকদের তথ্য প্রকাশ করতে হয়।

তবে তালিকায় শুধু সরাসরি ভর্তুকিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের নাম থাকে। ফলে প্রকৃত মালিক বা শেষ পর্যন্ত কারা এই অর্থের সুবিধাভোগী, তা শনাক্ত করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন বা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

উদাহরণ হিসেবে ইউনিফ্রুটির কথা বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সিসিলি ও স্পেনের আলমেরিয়া অঞ্চলে খামার রয়েছে। কিন্তু এসব খামার কী পরিমাণ ভর্তুকি পেয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

এসএএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।