দক্ষিণ ভারতে বিজেপির ভরাডুবি, পশ্চিমবঙ্গ-আসামে তেলেসমাতিকাণ্ড

মো: শাহিন মিয়া
মো: শাহিন মিয়া মো: শাহিন মিয়া
প্রকাশিত: ০৪:০০ পিএম, ০৯ মে ২০২৬
শুভেন্দুর শপথ অনুষ্ঠানে মোদীসহ বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা

সম্প্রতি ভারতে কয়েকটি বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাডুর নির্বাচন। কারণ পশ্চিমবঙ্গে দেশটির স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। যার মুখ্যমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বিতর্কিত ও হিন্দুত্ববাদী নেতা শুভেন্দু অধিকারী। আর দক্ষিণ ভারতে নির্বাচনে জয় পেয়েছেন অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া থালাপতি বিজয়।

তবে নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে দুই রকম চিত্র। দক্ষিণ ভারতে বিজেপির কোনো অবস্থানই নেতা। তামিলনাডু ও কেরালায় দলটি মাত্র তিনটি করে আসন পেয়েছে। যদিও সেখানে তারা জোটগতভাবে নির্বাচন করেছে। তাছাড়া দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে বিজেপিকে মূলত মূল ধারার রাজনৈতিক দলই হিসেবেই বিবেচনা করা হয় না। বলা হয় এটি একটি সাম্প্রদায়িক দল।

বিপরীতে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে নজিরবিহীন সামল্য দেখিয়েছে ২০১৬ সালের নির্বাচনে একটিও আসন না পাওয়া বিজেপি। ২০২১ সালেরর নির্বাচনে দলটি ৭০টির মতো আসন পেয়েছিল। তবে ২০২৬ সালে এসে তারা মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয় পেয়েছে। অন্যদিকে ২০২১ সালের নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস দুই শতাধিক আসনে জয় পেলেও তা এবার কমে দাঁড়িয়েছে ৮০টিতে।

তবে এই ফলাফল মানছেন না মমতা ব্যানার্জী। তার দাবি এই নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করে অন্তত একশ আসন লুট করা হয়েছে।

নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর মমতা ব্যানার্জী বলেছেন, আমি হারিনি তাই আমি পদত্যাগও করবো না। যদিও তার পদত্যাগের বিষয়টি সংবিধানে কোনো বাধ্যবাধকা নেই।

মমতা ব্যানার্জীর সুরেই কথা বলেছেন, ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ও লোকসভার বিরোধীদলের নেতা রাহুল গান্ধী। বলেছেন নির্বাচনে কারসাজি করে মমতাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি সবার আগে সামনে আসে তাহলো নির্বাচনের আগে অন্তত ৯০ লাখ ভোটারের নাম লিস্ট থেকে বাদ দেওয়া। যা নিয়ে বিরোধীরা আপত্তি তোলেন। কারণ বিরোধীদের দাবি এই বড় অংশকে বাদ দেওয়া হয়েছে বিজেপিকে নির্বাচনে সুবিধাজনক অস্থানে রাখার জন্য। কারণ যাদের বাদ দেওয়া হয়েছে তাদেরকে বিজেপিবিরোধী বলে মনে করা হতো। অর্থাৎ তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটার।

সবচেয়ে বেশি ভোটার বাদ দেওয়া হয়েছে মুসলিম অধ্যুষিত জেলাগুলোতে। যেমন মুর্শিদাবাদ, মালদাহ ও উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলাগুলো। এর সুবিধা যে বিজেপি পেয়েছে তা ফলাফলেও দেখা গেছে।

মুর্শিদাবাদ, মালদা ও উত্তর দিনাজপুর—এই তিন জেলায় মোট ৪৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি এবার ১৮টি আসনে জয় পেয়েছে। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ জেলায়, যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা ৭০ শতাংশের বেশি। মালদাহে প্রায় ৫০ শতাংশ মুসলিম।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাওয়া শুভেন্দু অধিকারীর নন্দিগ্রাম আসনে বাদ পড়া ভোটাদের মধ্যে ৯৫ শতাংশই ছিল মুসলিম।

অনেককে মনে করছেন মোট ভোটারের অন্তত ১২ শতাংশ বাদ পড়ে যাওয়াই এবারের নির্বাচনে এমন নজিরবিহীন সফলতা দেখিয়েছে বিজেপি।

নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিজেপির জেতা বেশিরভাগ আসনেই দলটির জয়ের ব্যবধানের চেয়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা বেশি।

এই ১০৫টি আসনের মধ্যে ৮৬টিতেই আগে কখনো জয় পায়নি বিজেপি। অর্থাৎ, বিজেপি যে ২০৭ আসনে জিতেছে, তার প্রায় অর্ধেক আসনেই জয়-পরাজয় নির্ধারণে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয় আরেক বিজেপি শাসিত রাজ্য আসামে আগে থেকেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এবারের নির্বাচনে আসামে বিজেপি মোট ১২৬টি আসনের মধ্যে ১০৭টি আসনে জয় পেয়েছে যা গত বিধানসভার চেয়ে ২৯টি বেশি। ফলে আসামে তৃর্তীয়বারের মতো ক্ষমতায় যাচ্ছে আরেক উগ্রপন্থি নেতা হেমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বাধীন বিজেপি।

আসামের ৩ কোটি ১০ লাখ বাসিন্দার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই মুসলিম, যা ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ অনুপাত। মিয়া নামে অবমাননাকরভাবে পরিচিত এই জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নেতিবাচক প্রচারণার লক্ষ্যবস্তু হয়ে আসছে, যা ২০১৬ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর আরও জোরদার হয়েছে।

১২৬ সদস্যের আসাম বিধানসভায় ১০২টি আসন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ২০২১ সালের তুলনায় আরও বড় ব্যবধানে ক্ষমতায় ফিরেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই বড় জয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে তার আরও কঠোর অবস্থানকে উৎসাহিত করতে পারে। গত পাচ বছরে তিনি এবং তার সরকার মুসলিম সম্প্রদায়কে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছে, বহু মানুষকে উচ্ছেদ করেছে এবং ঘরবাড়ি ভাঙার অভিযোগ উঠেছে।

আসামে ২০২৩ সালের সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়া রাজ্যের রাজনৈতিক চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। ২০০১ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে পরিচালিত এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুসলিম-অধ্যুষিত বিধানসভা আসনের সংখ্যা আনুমানিক ৩৩-৩৫ থেকে কমে ২০-২৩টিতে নেমে আসে। সমালোচকদের মতে, বিশেষ করে নিম্ন আসামের বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভোটশক্তি কমানোর উদ্দেশ্যে আসনগুলোর সীমানা পুনর্গঠন করা হয়।

নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন আসনের সীমানা পরিবর্তন করে মুসলিমপ্রধান এলাকাগুলোর সঙ্গে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রাম বা অঞ্চল যুক্ত করে দেয়। এর ফলে বহু আসনে জনসংখ্যাগত ভারসাম্য বদলে যায় এবং বিজেপি ও তাদের মিত্রদের রাজনৈতিক সুবিধা বৃদ্ধি পায়। সমালোচকরা এই প্রক্রিয়াকে জেরিম্যান্ডারিং হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে মুসলিম ভোটব্যাংককে সীমিত কয়েকটি আসনে কেন্দ্রীভূত করা হয় এবং বৃহৎ ভোটঘাঁটিগুলোকে ভেঙে ফেলা হয়।

এই পুনর্বিন্যাসের ফলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং হিন্দু ভোটারপ্রধান আসন বাড়ে। এর প্রভাব ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, যেখানে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট বড় সাফল্য অর্জন করে। একই সঙ্গে বহু আসনের জনসংখ্যাগত চরিত্র বদলে যাওয়ায় আগের মুসলিম প্রতিনিধিদের জায়গায় বিজেপি ও এনডিএ-সমর্থিত অমুসলিম প্রার্থীরা নির্বাচিত হন।

এমএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।