ব্রেকআপের কষ্ট ভুলতে সাবেক প্রেমিক-প্রেমিকার ‘এআই প্রতিরূপ’!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭:০৫ পিএম, ০৬ মে ২০২৬
ছবি: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

চীনে ব্রেকআপের কষ্ট সামলাতে তরুণদের মধ্যে নতুন এক ট্রেন্ড জনপ্রিয়তা পাচ্ছে- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকার ‘ডিজিটাল প্রতিরূপ’ তৈরি করা। এআই প্রযুক্তিনির্ভর এই ‘এক্স’, ‘সাবেক’ আগের সঙ্গীর কণ্ঠস্বর, প্রিয় বাক্য কিংবা কথার ভঙ্গি পর্যন্ত নকল করতে পারে, ফলে ভার্চুয়ালভাবে যেন ফিরে আসে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক।

তবে এই অভিনব পদ্ধতি যেমন আবেগগত নিরাময়ের নতুন পথ দেখাচ্ছে, তেমনি গোপনীয়তা, মানসিক নির্ভরতা ও সম্পর্কের সীমা নিয়ে নতুন বিতর্কও তৈরি করছে।

কীভাবে তৈরি হচ্ছে ‘ডিজিটাল এক্স’?

ডিজিটাল এক্স তৈরি করতে ব্যবহারকারীরা নিজেদের পুরোনো চ্যাট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ও ছবি একটি এআই প্ল্যাটফর্মে আপলোড করেন। এরপর ‘এক্স-পার্টনার ডট স্কিল’ নামের একটি প্যাকেজ ব্যবহার করে এআই সেই ব্যক্তির একটি প্রাথমিক ভার্চুয়াল সংস্করণ তৈরি করে।

এরপর ব্যবহারকারীরা ব্যক্তিগত স্মৃতি- যেমন ভ্রমণ, খাওয়ার অভ্যাস, সম্পর্কের বার্ষিকী বা অতীতের ঝগড়া- যোগ করে ধীরে ধীরে সেই প্রতিরূপকে আরও বাস্তবসম্মত করে তোলেন। ফলে এই ডিজিটাল ‘এক্স’ আগের মতোই পরিচিত ভঙ্গিতে কথা বলতে পারে।

কেউ কেউ এটিকে মেসেজিং অ্যাপেও যুক্ত করছেন। এক ব্যবহারকারী জানান, তিনি পুরো রাত জেগে এআইকে ‘প্রস্তুত’ করেছেন। পরে যখন তার সাবেক প্রেমিকা উইচ্যাটে ‘উপস্থিত’ হয়, তখন তিনি বলেন, আমার সব পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।

কোথা থেকে এলো এই ধারণা?

এই প্রবণতার শুরু ‘কলিগ ডট স্কিল’ নামে একটি ওপেন সোর্স প্রকল্প থেকে, যা তৈরি করেছিলেন সাংহাইভিত্তিক এআই প্রকৌশলী ঝোউ তিয়ানি। মূলত কর্মক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য তৈরি এই টুলটি দৈনন্দিন যোগাযোগ, নথি ও অভিজ্ঞতা থেকে পুনঃব্যবহারযোগ্য এআই স্কিল প্যাকেজ তৈরির জন্য ব্যবহৃত হতো।

পরবর্তী সময়ে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠলে ডেভেলপাররা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার শুরু করেন। কেউ কেউ জীবনী আপলোড করে ইলন মাস্ক বা স্টিভ জবসের ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি করেছেন। আবার কেউ বসের সঙ্গে চ্যাট বা মিটিংয়ের তথ্য দিয়ে এআইকে তার যোগাযোগের ধরন বিশ্লেষণ করিয়ে কাজের পরিস্থিতি অনুশীলন করেছেন।

যদিও ঝোউ তিয়ানি অন্যকে ‘কপি’ করতে সতর্ক করেছিলেন, তবুও ব্যক্তিগত ও আবেগঘন অভিজ্ঞতা দ্রুতই এতে যুক্ত হতে থাকে।

তরুণদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা

এই প্রেক্ষাপটে ‘এক্স-পার্টনার ডট স্কিল’ ‘ডিজিটাল এক্স’ ফিচারটি দ্রুত চীনের তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে অনেকে এটি সেটআপ করতে ২৫ থেকে ৪৫ ইউয়ান (প্রায় ৩.৭ থেকে ৬.৬ মার্কিন ডলার) পর্যন্ত খরচ করছেন।

সমর্থকদের যুক্তি

সমর্থকদের মতে, ডিজিটাল এক্স মানসিক স্বস্তি দেয় এবং অতীতের অপূর্ণতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে।

একজন ব্যবহারকারী বলেন, আমি অবশেষে সেই কথাগুলো বলতে পারছি, যা কখনো বলতে পারিনি- এতে আমার অনেক ভালো লাগছে। আরেকজন জানান, ডিজিটাল এক্সের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি বুঝতে পেরেছেন, তার সাবেক সঙ্গীকে তিনি যতটা নিখুঁত ভাবতেন, আসলে ততটা ছিলেন না।

আরেক ব্যবহারকারী হাজার হাজার চ্যাট আপলোড করার পর আবারও ‘ব্রেকআপ’-এর মতো অভিজ্ঞতার কথা জানান। তবে তার মতে, এই প্রক্রিয়া তাকে সম্পর্কটি আরও বাস্তবভাবে বুঝতে ও সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

সমালোচকদের উদ্বেগ

তবে সবাই এই ট্রেন্ডকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। অনেকেই এটিকে আবেগগত প্রতারণার নতুন রূপ হিসেবে দেখছেন- বিশেষ করে যখন কেউ নতুন সম্পর্কে থেকেও ডিজিটাল এক্সের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।

গুয়াংডংয়ের বিবাহ পরামর্শক ওয়ানকিউ বলেন, পুরোনো সম্পর্কের জন্য আকুলতা মানেই প্রতারণা নয়। এটি স্বাভাবিক আবেগ। যতক্ষণ এটি বর্তমান সঙ্গীকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, ততক্ষণ একে প্রতারণা বলা উচিত নয়। বরং দম্পতিরা ডিজিটাল এক্স ব্যবহার করে নিজেদের সম্পর্ক উন্নত করতে পারেন।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ধরনের ডিজিটাল এক্স মানসিক নির্ভরতা তৈরি করতে পারে, যা বাস্তব সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাধা হতে পারে।

গোপনীয়তা নিয়ে শঙ্কা

গোপনীয়তা নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে। গুয়াংডংয়ের আইনজীবী ঝং বলেন, সাবেক সঙ্গীর অনুমতি ছাড়া তার চ্যাট বা পোস্ট ব্যবহার করা ব্যক্তিগত তথ্য আইনের লঙ্ঘন হতে পারে।

প্রযুক্তি ও আবেগ- নতুন বাস্তবতা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তি মানুষের সম্পর্ক ও মানসিক আঘাত সামলানোর পদ্ধতিকে বদলে দিয়েছে। মার্চ মাসে পুরোনো এআই মডেল বন্ধ হওয়ার পর অনেক ব্যবহারকারী ‘সাইবার হার্টব্রেক’-এর কথা জানান, কারণ নতুন এআই আগের মতো উষ্ণ বা পরিচিত মনে হয়নি।

এদিকে, অনেকে মৃত প্রিয়জনদের ডিজিটাল প্রতিরূপ তৈরিতেও এআই ব্যবহার করছেন।

একজন নেটিজেন এই প্রবণতা নিয়ে মন্তব্য করেন, এই যুগে প্রযুক্তির কারণে আমরা নৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি। কিন্তু মানুষের মূল্য কেবল কার্যকারিতায় নয়, বরং তার বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায়।

তিনি আরও বলেন, জীবনের হতাশা, বিভ্রান্তি, আনন্দ বা রাগ- এসব কখনো ডিজিটাল করা যায় না। এটাই মানুষের অদ্বিতীয়তা।

সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

এসএএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।