যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ থেকে কী শিখছে চীন?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৫৮ এএম, ১১ মে ২০২৬
চীনের পতাকা ও প্লেন/ ফাইল ছবি: শিনহুয়া

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ তৃতীয় মাসে পা দিয়েছে। পারস্য উপসাগরের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখন শুধু দুটি দেশের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বেইজিংয়ের জন্য হয়ে উঠেছে এক বিশাল ‘ল্যাবরেটরি’। এই যুদ্ধ থেকে চীন বোঝার চেষ্টা করছে, মার্কিন সামরিক শক্তি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ঠিক কীভাবে কাজ করে এবং পাল্টা আঘাত সামলানোর ক্ষেত্রে তাদের সীমাবদ্ধতা কোথায়।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দুই মাসের লড়াই বেইজিংকে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধের রণকৌশল সাজাতে নতুন রসদ দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছেন, চীনের অভিজ্ঞতার অভাব এবং নিজেদের শক্তি নিয়ে অতি-মূল্যায়ন হিতে বিপরীত হতে পারে।

আক্রমণ নয়, প্রতিরক্ষায় জোর

চীনের সাবেক বিমানবাহিনী কর্নেল ফু কিয়ানশাও বলেন, এই যুদ্ধের বড় শিক্ষা হলো—আক্রমণের চেয়ে প্রতিরক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইরান যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রিয়ট বা থাডের মতো শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে পেরেছে, তা বেইজিংয়ের জন্য ভাবনার বিষয়।

আরও পড়ুন>>
চীনের স্যাটেলাইট যেভাবে বাড়াচ্ছে ইরানের যুদ্ধশক্তি
বেইজিংয়ে ড্রোন বিক্রিতে কেন নিষেধাজ্ঞা দিলো চীন?
ইরানে যুদ্ধবিমান ধ্বংসকারী ক্ষেপণাস্ত্র পাঠাতে পারে চীন!

ফু বলেন, ভবিষ্যৎ যুদ্ধে অপরাজেয় থাকতে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। আমাদের বিমানবন্দর ও বন্দরগুলোকে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষা করার কৌশল আরও উন্নত করতে হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং জে-২০র মতো পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ ফাইটার জেট তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু ইরানের সস্তা ‘শাহেদ’ ড্রোন যেভাবে মার্কিন শিবিরে ত্রাস সৃষ্টি করেছে, তা চীনকে নতুন করে ভাবাচ্ছে।

তাইওয়ান ও ড্রোনের লড়াই

তাইওয়ান প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কা দীর্ঘদিনের। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন বর্তমানে এমন এক সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছে যা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো উচ্চপ্রযুক্তির নিপুণতা রাখে, আবার ইরানের মতো সস্তা ও বিপুল সংখ্যক ড্রোন দিয়ে হামলা চালানোর সক্ষমতাও রাখে।

তাইওয়ানের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি রিসার্চের গবেষক চিহ চুং বলেন, ‘তাইওয়ান দখলে চীন সম্ভবত ড্রোনের বিশাল ঝাঁক ব্যবহার করবে।’ এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের সাধারণ কলকারখানাগুলো চাইলে বছরে প্রায় ১০০ কোটি ড্রোন তৈরির সক্ষমতা রাখে। এই সংখ্যাটি যে কোনো দেশের প্রতিরক্ষার জন্য বড় হুমকি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল পাপারো সতর্ক করেছেন, ড্রোন প্রযুক্তি এখন রক্ষণভাগের হাতেও বড় অস্ত্র। চীন যদি তাইওয়ান আক্রমণ করতে হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে জাহাজ পাঠায়, তবে কয়েকশ ড্রোনের মাধ্যমে সেই দামি জাহাজগুলো ডুবিয়ে দেওয়া সম্ভব।

অভিজ্ঞতার অভাবই বড় দুর্বলতা

প্রযুক্তি ও রসদ থাকলেও চীনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ‘যুদ্ধের অভিজ্ঞতা’। ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে লড়াইয়ের পর চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি বড় কোনো যুদ্ধে অংশ নেয়নি। অন্যদিকে, মার্কিন বাহিনী গত কয়েক দশকে ইরাক, আফগানিস্তান এবং কসোভোর মতো রণক্ষেত্রে সরাসরি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

সিঙ্গাপুরের এস রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো ড্রু থম্পসন কোরিয়া যুদ্ধের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘একজন দক্ষ পাইলট সাধারণ বিমান নিয়েও একজন অদক্ষ পাইলটের উন্নত বিমানকে হারিয়ে দিতে পারে।’ অর্থাৎ, রণক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং অভিজ্ঞতা চীনের জে-২০ বা হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব

ইরান যেভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থাকে অচল করে দিয়েছে, তা থেকে বেইজিংয়ের জন্য সতর্কবার্তা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে কোনো যুদ্ধ শুরু হলে তা কেবল ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি প্রবাহকে এমনভাবে ওলটপালট করে দেবে, যা চীনের নিজের অর্থনীতির জন্যও আত্মঘাতী হতে পারে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ক্রেগ সিঙ্গেলটন বলেন, মাঠে জয় মানেই যে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। চীনকে বুঝতে হবে যে রণক্ষেত্রের সাফল্য সব সময় কাঙ্ক্ষিত শেষ ফল এনে দেয় না।

সূত্র: সিএনএন
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।