শি জিনপিংয়ের গরম-নরম বার্তায় কেমন কাটলো ট্রাম্পের চীন সফর

মো: শাহিন মিয়া
মো: শাহিন মিয়া মো: শাহিন মিয়া
প্রকাশিত: ০৪:২৩ পিএম, ১৫ মে ২০২৬
চীনে শি জিনপিং ও ট্রাম্প/ ছবি: এএফপি

বিশ্বজুড়ে বিরাজ করছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ। অন্যদিকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তোলে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে শুরু হয় বাণিজ্য যুদ্ধ। যে যুদ্ধ ট্রাম্প প্রথম মেয়াদেই শুরু করেন।

এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি শুল্কে অনিশ্চয়তায় পড়ে যায় বাজার ও অর্থনীতি। কারণ বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতির মধ্যে চলা উত্তেজনার প্রভাব পরে সর্বত্র। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ছিল চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা। তবে ছেড়ে কথা বলেনি চীনও। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পাল্টা শুল্কের পাশাপাশি বিরল খনিজ রপ্তানির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করলে চাপে পড়ে ট্রাম্প প্রশাসন।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ ঘিরে নতুন করে চাপ তৈরি হয় অর্থনীতির ওপর। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।

ফলে এমন সময়ে ট্রাম্পের চীন সফর ঘিরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার আশা জাগে। কারণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাধর দেশ দুইটির মধ্যে ভালো সম্পর্ক বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যে সংঘাত চলছে তার সঙ্গে দেশ দুইটির সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে সেসব সমস্যার সমাধানে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে ট্রাম্পের এবারের এই গুরুত্বপূর্ণ সফরটি কীভাবে শেষ হলো এবং ট্রাম্প কি অর্জন করলেন তা নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ। তার এই সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাণিজ্য ও ইরান-তাইওয়ান ইস্যু।

বাণিজ্য ইস্যুতে ট্রাম্পের এই সফরে দুই দেশের মধ্যে কিছুটা অগ্রগতি ও সমঝোতার লক্ষণ দেখা গেলেও ইরান ও তাইওয়ান ইস্যুতে বিবাদ মেটেনি।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান ইস্যু সঠিকভাবে সামাল না দিলে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সংঘাত তৈরি হতে পারে।

দুই নেতার বৈঠকে শি জিনপিং বলেন, তাইওয়ান প্রশ্নটি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শি আরও বলেন, তাইওয়ানের স্বাধীনতা এবং তাইওয়ান প্রণালিতে শান্তি— আগুন ও পানির মতো পরস্পরবিরোধী।

২৩ মিলিয়ন মানুষের স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ান নিজেকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে। তবে চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে মনে করে। আর এক্ষেত্রে তাইওয়ানকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। শুধু রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সমর্থনই নয়, দেওয়া হচ্ছে সামরিক সহায়তাও। যা ভালোভাবে দেখছে না চীন।

শি জিনপিং ও ট্রাম্পের বৈঠকের আগে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে। বিবৃতিতে বলা হয়, এই সংঘাত কখনোই হওয়া উচিত ছিল না এবং এর অব্যাহত থাকারও কোনো কারণ নেই। একই সঙ্গে চীন জানায়, যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তারা শান্তি চুক্তির প্রচেষ্টাকে সমর্থন করছে।

যদিও বেইজিংয়ের ঝোংনানহাইয়ে বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেন, ইরান ইস্যুতে দুই নেতা খুবই কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছেন। তবে শি জিনপিং প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
মার্কিন কর্মকর্তারা আগে থেকেই আশা করছিলেন, চীন তার প্রভাব ব্যবহার করে ইরানকে সমঝোতায় আনতে ভূমিকা রাখবে এবং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে সহায়তা করবে। বৈঠকের পর হোয়াইট হাউজের সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলা হয়, দুই নেতা একমত হয়েছেন যে হরমুজ প্রণালি খোলা থাকা জরুরি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, শি জিনপিং নাকি একমত হয়েছেন যে ইরানের কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয়। তবে এ বিষয়ে চীনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কিন্তু বেইজিং ইরানের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে আগ্রহী নয়। কারণ, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে চীন।

তাছাড়া দুই নেতার এই বৈঠকে কিছু বাণিজ্যিক সমঝোতার কথা বলা হলেও বড় ধরনের কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ, বিরল খনিজ সরবরাহ এবং শুল্কবিরোধ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই দেশ কৃষিপণ্য বিক্রির বিষয়ে কিছু চুক্তিতে সম্মত হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন কাঠামো তৈরির দিকেও অগ্রগতি হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের অ-সংবেদনশীল পণ্য চিহ্নিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

এদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, চীন প্রায় ২০০টি বিমান কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে, যা মার্কিন বিমান নির্মাতা বোয়িংয়ের কাছ থেকে প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথম বড় ক্রয়াদেশ হতে পারে। তবে বাজারের প্রত্যাশা ছিল প্রায় ৫০০ বিমানের অর্ডার। ফলে বিনিয়োগকারীদের হতাশায় বোয়িংয়ের শেয়ারের দাম ৪ শতাংশের বেশি পড়ে যায়।

বৈঠকের ফলাফল সীমিত হওয়ায় চীনের শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীরা দ্রুত বুঝতে পারেন যে এই শীর্ষ বৈঠক বড় কোনো সমাধান আনতে পারেনি।

তবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে দরকষাকষি চললেও শি জিনপিং ও ট্রাম্পের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট নিজে ট্রাম্পকে একটি গোপন বাগান ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। তাছাড়া ট্রাম্পের সম্মানে এক জাঁকজমকপূর্ণ ভোজসভার আয়োজন করা হয়। আয়োজিত এই নৈশভোজটি ছিল ট্রাম্পের বহুল আলোচিত রাষ্ট্রীয় সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। ২০১৭ সালের পর এই প্রথম চীন সফরে গিয়ে ট্রাম্পকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয় বেইজিং। ভোজসভায় ট্রাম্পের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা এবং সফরসঙ্গী হিসেবে থাকা মার্কিন শীর্ষ ধনকুবের ও করপোরেট প্রধানরা। অতিথিদের জন্য পরিবেশন করা হয় বিভিন্ন ধরনের বিলাসবহুল ও ঐতিহ্যবাহী খাবার।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের ফাঁকে চীনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, আমি চীনকে দেখে খুবই মুগ্ধ।

ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউজে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত চীন নিশ্চিত করেনি যে শি জিনপিং আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন কি না। যদিও শুক্রবার চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে, আলোচনা অব্যাহত রাখার জন্য ট্রাম্পের আমন্ত্রণের বিষয়টি বেইজিং নোট করেছে।

এমএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।