যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদে বন্দুক হামলা নিয়ে যা জানা গেলো
যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো শহরের একটি মসজিদে দুই কিশোর বন্দুকধারী গুলি চালিয়ে তিনজনকে হত্যা করেছে। পরে তারা নিজেরাও আত্মহত্যা করে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কর্তৃপক্ষ বলেছে, ইসলামিক সেন্টার ফর সান ডিয়েগোর হামলাটিকে সম্ভাব্য বিদ্বেষমূলক অপরাধ (হেট ক্রাইম) হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছে।
সান ডিয়েগো পুলিশ প্রধান স্কট ওহল বলেন, তদন্তকারীরা এখনও হামলার কারণ অনুসন্ধান করছেন। তিনি জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে হামলার পেছনের পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও তথ্য প্রকাশ পেতে পারে।
মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা এবং সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় বার্ষিক হজযাত্রার ঠিক এক সপ্তাহ আগে এই হামলার ঘটনা ঘটলো।
মসজিদে কী ঘটেছিল?
স্থানীয় সময় সোমবার (১৮ মে) সকাল প্রায় ৯টা ৪২ মিনিটে পুলিশ এক মায়ের কাছ থেকে ফোন পায়, যিনি তার নিখোঁজ অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান সম্পর্কে জানান।
স্কট ওহল বলেন, তিনি আমাদের যে তথ্য দিচ্ছিলেন, তাতে পরিস্থিতির ঝুঁকির মাত্রা বাড়তে থাকে। তিনি বিশ্বাস করছিলেন তার ছেলে আত্মহত্যাপ্রবণ, এবং তিনি আরও জানান যে তার কয়েকটি অস্ত্র, গাড়িয়ে নিয়ে ছেলে নিখোঁজ।
প্রায় দুই ঘণ্টা পরে, স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৪৩ মিনিটে পুলিশ এক সক্রিয় বন্দুকধারীর খবর পেয়ে একস্ট্রম অ্যাভিনিউয়ের ৭০০০ নম্বর ব্লকে পৌঁছায়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চার মিনিটের মধ্যেই কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
ওহল বলেন, মসজিদে গুলির খবর পাওয়ার পর প্রায় ১০০ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ইসলামিক সেন্টার ফর সান ডিয়েগোতে প্রবেশ করেন।
কর্মকর্তারা সেখানে পৌঁছে ভবনের বাইরে তিনজনকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। এরপর পুরো কমপ্লেক্সজুড়ে সক্রিয় বন্দুকধারী পরিস্থিতি মোকাবিলার অভিযান শুরু হয়।
ওহল বলেন, ভবনের বিভিন্ন কক্ষে প্রবেশ করতে দরজা ভাঙতে হয়েছে। সেখানে ৫০ থেকে ১০০ জন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, কোনো পুলিশ সদস্য অস্ত্র ব্যবহার করেননি।
পুলিশ এলাকা নিরাপদ করার সময় কয়েক ব্লক দূরে আবার গুলির শব্দ শোনা যায়। সেখানে এক ল্যান্ডস্কেপ কর্মীর দিকে গুলি চালানো হলেও তিনি আহত হননি বলে ওহল জানান। পরে সন্দেহভাজন হামলাকারীদের একটি গাড়ির ভেতরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
টেলিভিশনের আকাশপথের ফুটেজে দেখা যায়, এক ডজনের বেশি শিশু হাত ধরে মসজিদের পার্কিং এলাকা থেকে বেরিয়ে আসছে, চারপাশে পুলিশি যানবাহন মোতায়েন ছিল।
ওহল বলেন, আমাকে সবচেয়ে নাড়া দিয়েছে বাচ্চাদের দৌড়ে বেরিয়ে আসা—শুধু বেঁচে থাকার জন্য কৃতজ্ঞ।
কর্তৃপক্ষ বলেছে, ভিন্ন কোনো প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত ঘটনাটি হেট ক্রাইম হিসেবেই তদন্ত করা হবে।
হামলার স্থান কোথায়?
মসজিদের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এটি সান ডিয়েগো কাউন্টির সবচেয়ে বড় মসজিদ, যেখানে ৫ হাজারের বেশি মুসল্লি নিয়মিত আসেন।
কমপ্লেক্সটিতে আল-রশিদ স্কুলও রয়েছে, যেখানে পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী শিশুদের আরবি, ইসলামিক স্টাডিজ ও কোরআন শিক্ষা দেওয়া হয়।
আবাসিক এলাকায় অবস্থিত এই মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য সান ডিয়েগোর মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণ করা এবং একই সঙ্গে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সহায়তা ও শিক্ষা দেওয়া।
মসজিদ কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমার খুতবা, শিক্ষামূলক আলোচনা ও কমিউনিটি সেমিনার আয়োজন করা হয় এবং সব ধর্মের মানুষকে স্বাগত জানানো হয়।
হামলার পরপরই ইসলামিক সেন্টারের ইমাম তাহা হাসানে এ ঘটনার নিন্দা জানান।
তিনি বলেন, উপাসনালয়কে লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত জঘন্য। মানুষ এখানে নামাজ পড়তে, উদযাপন করতে, শিখতে আসে—শুধু মুসলমান নয়, সব শ্রেণির মানুষই আসে।
মসজিদটি সান ডিয়েগোর কেন্দ্রীয় এলাকা থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত।
হামলাকারীদের সম্পর্কে কী জানা গেছে?
গাড়ির ভেতরে মৃত অবস্থায় পাওয়া দুই সন্দেহভাজন কিশোর ছিল বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ওহল বলেন, তাদের বয়স ১৭ ও ১৯ বছর।
তাদের সম্পর্কে খুব সীমিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
দিনের শুরুতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগকারী মা তদন্তকারীদের বলেন, দুইজনই ছদ্মবেশী সামরিক পোশাক পরেছিল এবং তারা একটি নিখোঁজ ঘোষিত গাড়িতে একসঙ্গে চলাচল করছিল।
ওহল বলেন, আমরা আরও জানতে পেরেছি, তাদের একজন কোনো না কোনোভাবে ম্যাডিসন হাই স্কুলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তদন্ত চলাকালে স্কুলটিতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়।
মা একটি নোটও খুঁজে পেয়েছিলেন বলে জানান ওহল। তবে তিনি এর বিস্তারিত প্রকাশ করেননি। তিনি বলেন, এতে অবশ্যই বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছিল।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুই কিশোর তিনজনকে হত্যা করে, যাদের মধ্যে মসজিদের এক নিরাপত্তাকর্মীও ছিলেন। পরে তারা আত্মহত্যা করে।
ভুক্তভোগীদের সম্পর্কে কী জানা গেছে?
নিহতদের মধ্যে একজন ছিলেন কেন্দ্রটির নিরাপত্তাকর্মী, যিনি হামলাকে আরও ভয়াবহ হওয়া থেকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ওয়াহল বলেন, নিঃসন্দেহে তার কর্মকাণ্ড ছিল বীরত্বপূর্ণ। তিনি আজ অনেকের জীবন বাঁচিয়েছেন।
কর্তৃপক্ষ এখনও তিন নিহতের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। তবে কমিউনিটি নেতারা নিরাপত্তাকর্মীর নাম আমিন আব্দুল্লাহ বলে শনাক্ত করেছেন। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিনি আট সন্তানের জনক ছিলেন।
প্রতিক্রিয়া কী এসেছে?
কিউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
সিএআইআর-সান ডিয়েগোর নির্বাহী পরিচালক তাজহিন নিজাম এক বিবৃতিতে বলেন, নামাজ বা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে কারও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা উচিত নয়।
জোহরান মামদানি বলেন, ইসলামবিদ্বেষ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভয় ও বিভেদের রাজনীতির বিরুদ্ধে আমাদের একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে।
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসোম বলেন, তিনি আজকের সহিংস হামলায় আতঙ্কিত এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় বিদ্বেষের কোনো স্থান নেই।
যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষের পরিস্থিতি কেমন?
মার্কিন অধিকারকর্মীরা বহু বছর ধরে ইসলামবিদ্বেষ বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন। তারা এর পেছনে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হামলার পরবর্তী পরিস্থিতি, তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ, অভিবাসীবিরোধী বক্তব্য, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী আন্দোলন এবং গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধকে ঘিরে উত্তেজনাকে দায়ী করছেন।
সিএআইআর জানিয়েছে, ২০২৫ সালে তারা ৮ হাজার ৬৮৩টি মুসলিমবিরোধী ও আরববিরোধী অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে, যা ১৯৯৬ সালে তথ্য প্রকাশ শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ।
এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে কথা বলা মুসলিমরা ক্রমেই সরকারি নীতি, রাজনৈতিক বক্তব্য ও জনসন্দেহের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন।
এদিকে এপ্রিল মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের শুরু থেকে রিপাবলিকান রাজনীতিকদের মধ্যে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অধিকারকর্মীরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মসজিদ, ইসলামিক স্কুল ও মুসলিম কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে হুমকি ও হামলার ঘটনাও বেড়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।
সূত্র: আল-জাজিরা
এমএসএম