জেরুজালেমে কেন দূতাবাস সরিয়ে নিলো যুক্তরাষ্ট্র?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭:১৫ পিএম, ০৭ মে ২০১৮

আগামী ১৪ মে জেরুজালেমে নতুন দূতাবাস চালু করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের এ পদক্ষেপে ইসরায়েল খুশি হলেও উদ্বেগের মধ্যে পড়েছেন ফিলিস্তিনিরা।

সোমবার জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাসমুখী রোড সাইন বসানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহে ইসরায়েলের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে নতুন মার্কিন দূতাবাসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।

কয়েক দশকের মার্কিন নীতি লঙ্ঘন করে গত বছর দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। তার ওই ঘোষণার পর জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস চালুর এ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

ট্রাম্প বলেছেন, তার প্রশাসনের শান্তি প্রস্তাবনা কাজ করছে এবং জেরুজালেমকে আমেরিকার অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত শান্তি আলোচনার কঠিন অংশ।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ ঘোষণায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু স্বাগত জানালেও আরব বিশ্ব ও মার্কিন পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে বিরক্তি তৈরি করে।

ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেছেন, ট্রাম্পের ওই ঘোষণা ফিলিস্তিনিদের গালে থাপ্পড়। ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় ওয়াশিংটন কোনো ধরনের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে না বলেও সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি।

দক্ষিণ জেরুজালেমের একটি ভবনে ছোট পরিসরে দূতাবাসের কার্যক্রম পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পরে নিরাপদ স্থানের খোঁজ পাওয়া গেলে তেলআবিব থেকে পুরো দূতাবাস সেখানে স্থানান্তর করা হবে।

jagonews24

জেরুজালেম ঘোষণা কেন?

ওয়াশিংটনে ইসরায়েলপন্থী রাজনীতিকদের দীর্ঘদিনের চাপের মুখে তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। যা ২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার সময় অঙ্গীকার করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত দেশটির অনেক রক্ষণশীল ও খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়। এছাড়া জেরুজালেমকে ইসরায়েলের অংশ হিসেবে মনে করেন এমন অনেক মার্কিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে ভোট দেন।

ট্রাম্প ওই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৯৫ সালের একটি আইন অনুযায়ী। ওই আইনে তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে মার্কিণ দূতাবাস সরিয়ে নেয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ আছে। তবে অতীতে বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বারাক ওবামা ধারাবাহিকভাবে এই আইন এড়িয়ে গেছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জেরুজালেমের ভূমিকা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ধর্ম, রাজনীতি ও ইতিহাস। আঞ্চলিক ক্ষমতাধর ও বহিরাগতদের হাজার বছরের লড়াইয়ের স্বাক্ষী জেরুজালেম। ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের কাছে পবিত্র স্থান জেরুজালেম। এই তিন ধর্মের ধর্মীয় স্থাপনা রয়েছে এখানে যা, ব্যাপক তাৎপর্যপূর্ণ।

ইসরায়েল সরকার মনে করে জেরুজালেম তাদের শাশ্বত ও অবিভক্ত রাজধানী; যদিও তাদের এই দাবির প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন নেই। ফিলিস্তিনিরাও একই ধরনের দাবি করেন। জেরুজালেমকে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী মনে করেন ফিলিস্তিনিরা।

এমনকি শহরটির ভিন্ন ভিন্ন নামও রয়েছে। ইহুদিরা এই শহরকে জেরুজালেম বা ইয়েরুশালাইম বলে ডাকেন। আরবরা আল-কুদস বলে ডাকেন যার অর্থ 'পবিত্র'

কিন্তু শহরটির গুরুত্ব সবকিছুকেই ছাড়িয়ে গেছে। জেরুজালেমের প্রাচীন নগরীর বুকে রয়েছে মুসলিমদের পবিত্র স্থাপনা আল-হারাম আল শরিফ। ইহুদিদের পবিত্র হার হা-বায়িত বা টেম্পল মাউন্টও আছে সেখানে। অষ্টম শতাব্দিতে নির্মিত মুসলিমদের প্রথম কেবলা আল-আকসা মসজিদ আছে। মুসলমানরা মক্কা ও মদিনার পর ইসলাম ধর্মের তৃতীয় পবিত্র স্থাপনা মনে করে আল-আকসা মসজিদকে।

খ্রিস্টানরাও এই শহরকে পবিত্র এবং তাৎপর্যপূর্ণ মনে করেন। তাদের বিশ্বাস যীশু খিস্ট্র জেরুজালেমে ধর্ম প্রচার করেছেন, মারা গেছেন।

 

কী ঘটতে পারে জেরুজালেমে?

ট্রাম্পের ঘোষণার পর সেখানে ফিলিস্তিনিরা প্রতিবাদ করেছেন। ব্যাপক রাজনৈতিক উত্তেজনাও দেখা গেছে জেরুজালেমে। আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরা শুরু হতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি আলোচনা ভেস্তে যেতে পারে বলেও সতর্ক করে দিয়েছেন তারা।

হারানো ভূমি ফিরিয়ে পাওয়ার দাবিতে ছয় সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে ন ফিলিস্তিনিরা। এসময় তারা ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়িয়েছে। এতে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে অন্তত ৪০ ফিলিস্তিনির প্রাণহানি ঘটেছে।

ফিলিস্তিনিরা ১৯৮৭-১৯৯৩, ২০০০-২০০৫ সাল পর্যন্ত যে ইন্তিফাদা করেছেন এবারের সংঘর্ষ এখন পর্যন্ত সেই মাত্রায় পৌঁছায়নি। অতীতে সার্বভৌমত্ব ও ধর্মীয় বিভিন্ন ইস্যুতে সেখানে ব্যাপক সহিংসতা দেখা গেছে।

১৯৬৯ সালে আল আকসা মসজিদ পুড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক মেসিয়ানিক ক্রিশ্চিয়ান। তিনি ব্যর্থ হলেও মসজিদের ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং এ ঘটনার পর পুরো আরব বিশ্বে প্রচণ্ড ক্ষোভ দেখা যায়। (সংক্ষেপিত)

রয়টার্স অবলম্বনে সাইফুজ্জামান সুমন

এসআইএস/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :