কাজের প্রতি আবেগ-ভালোবাসা থাকা খুব জরুরি

বেনজির আবরার
বেনজির আবরার বেনজির আবরার , ফিচার লেখক
প্রকাশিত: ০২:১৫ পিএম, ১১ জুলাই ২০২১

রায়হান কবির পেশায় একজন ব্র্যান্ড মার্কেটিয়ার। তিনি বেক্সিমকো টেক্সটাইলের ‘ইয়েলো’ ব্র্যান্ডের মার্কেটিং ইনচার্জ। দীর্ঘ দশ বছরের ক্যারিয়ারে দারুণ সব অর্জন তার। সম্প্রতি জাগো নিউজের সঙ্গে আড্ডায় অভিজ্ঞতার ঝুড়ি থেকে কিছু কথা বের করে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফিচার লেখক বেনজির আবরার

জাগো নিউজ: প্রথমেই আপনার সম্পর্কে কিছু বলুন—
রায়হান কবির: ব্র্যান্ড মার্কেটিং, ট্রেড মার্কেটিং, অ্যাক্টিভেশন এবং এনগেজমেন্টসহ সব মিলিয়ে ১০ বছর যাবৎ কাজ করছি। বলতে পারি, কাজ শিখেছি ফ্যাশন রিটেইল, পেট্রোলিয়াম, ই-কমার্স, কনজিউমার ইলেকট্রনিক্সসহ বেশ কিছু ডাইভার্সিফায়েড ইন্ডাস্ট্রিতে। বর্তমানে কাজ করছি বেক্সিমকো টেক্সটাইলের ইয়েলো ব্র্যান্ড নিয়ে। সাথে বেক্সিমকো ফুডস এবং বেক্সিমকো হেলথেরও দায়িত্ব পালন করছি।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে মার্কেটিংয়ে গ্রাজুয়েশন শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ফ্যাকাল্টি থেকে মার্কেটিংয়ে এমবিএ করেছি। এসএসসি পাস করেছি রংপুর জিলা স্কুল থেকে। বাবার চাকরির সুবাদে বেড়ে ওঠা রংপুরে, তবে আমার হোম টাউন রাজশাহী।

ক্যারিয়ারের পাশাপাশি রোটারি ইন্টারন্যাশনালের সাথে যুক্ত আছি প্রায় ১২ বছর। ইয়ুথ এবং কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করছি। ২০১১-২০১২ সালে রোটার‌্যাক্ট ক্লাব অব ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট ছিলাম। ২০১২-২০১৩ সালে রোটার‌্যাক্ট ক্লাব অব ঢাকা নর্থের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। পোলিও, থেলাসেমিয়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপদ পানি নিয়ে আমাদের বেশ কিছু স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প আছে।

জাগো নিউজ: ক্যারিয়ারের নানা পর্যায় সম্পর্কে বলুন—
রায়হান কবির: আসলে সব সময়ই নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পছন্দ করি। ভার্সিটি জীবনের শুরুর দিক থেকেই টিউশনি করতাম। এরপর কল সেন্টার এক্সিকিউটিভ হিসেবে কাজ শুরু করেছিলাম উইন্ডমিলের হয়ে রবির জন্য ২০১০ সালে। তখন সেটা একটেল। এরপর বাংলালায়নের কন্ট্রাক্টচুয়াল অ্যাক্টিভেশন টিমের হয়ে ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসগুলোয় ক্যাম্পেইন করেছি কয়েক মাস। গ্র্যাজুয়েশনের পর একটি টেলিকম কোম্পানিতে ইন্টারন্যাশনাল কাস্টমার সার্ভিস নিয়ে কাজ করেছি বছর দেড়েক।

in-1

এনার্জিপ্যাক ইলেকট্রনিক্সে জয়েন করি ২০১৪ সালে মার্কেটিং কমিউনিকেশন্সের দায়িত্বে সিনিয়র অফিসার হিসেবে। ম্যানুফ্যাকচারার এবং রিটেল ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি হওয়ায় সেখানে মার্কেটিংয়ের সব কিছু নিয়ে অনেক গভীরভাবে কাজ শেখার সুযোগ পেয়েছি। বস ছিলেন শুরুতে ফায়াজ ভাই, পরে ফারাহ আপু। আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুজন ব্যক্তি; যারা ধরে ধরে আমাকে মার্কেটিংয়ের সব ডব্লিউএইচ প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর হাতেকলমে শেখাতেন। ইউএসপি ডেভেলপমেন্ট, মার্কেট রিসার্চ, কম্পিটিশন অ্যানালাইসিস, পজিশনিং, প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রিক মিডিয়া, মিডিয়া প্ল্যানিং, ক্যাম্পেইন এবং ট্রেড অ্যাক্টিভেশন—এককথায় প্রথম মার্কেটিংয়ের সব একসাথে শেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। এনার্জিপ্যাকে মূলত এটিএল এবং বিটিএল মিডিয়ায় খরচ করতাম আমরা। তখনো ডিজিটাল মার্কেট এতটা ডেভেলপ করেনি দেশে। গ্লোব্যাল মার্কেটে অনলাইন বিজনেসের কেস স্টাডি পড়তে পড়তে মাথায় ভূত চাপলো ই-কমার্স আর ডিজিটাল মার্কেটিং শেখা দরকার। পিকাবু ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা সিইও শাহরিয়ার ভাই সেই সুযোগ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু রিটেইল মার্কেট, মার্কেট ভিজিট আর বিটিএল মার্কেটিং মিস করছিলাম খুব।

এরপর র‌্যাংকন গ্রুপে শেল ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেলাম ২০১৭ সালে। ফিল্ড মার্কেটিংয়ের টিম লিডার হিসেবে। পরবর্তীতে এক এক করে ট্রেড মার্কেটিং, ডিস্ট্রিবিউশন ডেভেলপমেন্ট এবং ব্র্যান্ড যোগ হলো। সব মিলিয়ে ওভারঅল ব্র্যান্ড মার্কেটিংয়ের দায়িত্ব। বস ছিলেন সদ্য বিএটি থেকে আসা রেজওয়ান ভাই, সিইও খালেদ ভাইও এক্স-ব্যাট। তাদের সান্নিধ্যে রিটেইল ডিস্ট্রিবিউশন এবং ট্রেড মার্কেটিং নতুন করে শিখলাম। বলতে পারি, দুই বছরের একটা প্রাক্টিক্যাল ট্রেনিং নিয়েছি তাদের কাছে। শেলের ইন্টারন্যাশনাল ব্র্যান্ড গাইডলাইন অনেক গোছানো এবং এনরিচড। যা সরাসরি শেল গ্লোব্যাল টিম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যেটা আসলেই আমার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ ছিল বলে মনে করি।

ইঞ্জিন চালাতে ইঞ্জিন ওয়েল লাগবেই। দেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির সাথে ইঞ্জিন ওয়েলের মার্কেটও দ্রুতগতিতেই বড় হবে। তাই আমরা কেউই এ সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজি ছিলাম না। দেশজুড়ে বাইক বা কার সার্ভিস সেন্টার, ওয়ার্কশপ ছাড়াও বাস এবং ট্রাক স্ট্যান্ড কেন্দ্রীক ট্রেড প্রোগ্রাম, এনগেজমেন্ট এবং অ্যাক্টিভেশনের মাধ্যমে কাস্টমার এবং কনজ্যুমারের মধ্যে ব্র্যান্ডের একটা শক্ত এবং দীর্ঘস্থায়ী পজিশনিং করতে কাজ করছিলাম সবাই মিলে। এ ছাড়াও সদ্য ইমপ্লিমেন্ট করা জিরো ক্রেডিট পলিসি, ট্রেড পলিসি, মার্জিন পলিসি, সাথে নতুন বিটুসি টিম ডেভেলপমেন্ট—অনেক নতুন কিছু করতে গিয়েও আমরা সাফল্য এবং সমৃদ্ধিকে কখনোই ফোকাস থেকে সরাইনি। ফলাফল দু’বছরের মধ্যে বিটুসিতে আমাদের টপ থ্রির মধ্যে আসা, বিটুবিতে মার্কেট লিডারশীপ।

বর্তমানে কাজ করার কথা শুরুতেই বলেছি। আসলে ডাইভার্সিফায়েড ইন্ডাস্ট্রিতে অনেকেই কাজ করতে চান না। কোথাও ঢুকলে সেখানে জীবন কাটিয়ে দিতেই নিরাপদ বোধ করেন। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, এটি আমি বিশেষ একটা সুযোগ হিসেবে দেখি। নতুন ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন কিছু শেখার সুযোগ, নতুন কিছু করে দেখানোর সুযোগ। ভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে কনজ্যুমার বিহ্যাভিয়ার যেমন ভিন্ন; ঠিক তেমনই স্টেকহোল্ডার ম্যানেজমেন্ট, ব্র্যান্ডের পিলার, পজিশনিংয়ের উপায়, মিডিয়া সিলেকশন, বাজেট অ্যালোকেশনসহ সব কিছুই ইন্ডাস্ট্রিভেদে ভিন্ন।

জাগো নিউজ: চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মার্কেটিং সেক্টরেও বড় পরিবর্তন এনেছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
রায়হান কবির: চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বলতে বুঝি সিমুলেশন, ইন্টিগ্রেশন, সাইবার সিকিউরিটি, অগমেন্টেড রিয়ালিটি, রোবটস, ক্লাউডস এবং অবশ্যই বিগ ডাটা ম্যানেজমেন্ট। এআই বিপুল পরিমাণে ডেটাগুলোর মধ্যে প্যাটার্ন খুঁজে বের করতে পারে। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সেই তথ্যকে অবিশ্বাস্য গতিতে সংগঠিত করে। ইন্টারনেট অব থিংস তথ্যটি আপনাকে নেটফ্লিক্সে ঢুকলে কোন ডকুমেন্টরি দেখবেন, সেটা রিকমেন্ড করে। মার্কেটারদের কাছে এসব ডেটা মানে আরও পার্সোনালাইজড ওয়েতে নিজের ব্র্যান্ডকে প্রেজেন্ট করার সুযোগ। যত বেশি ডিভাইসের মধ্যে আন্তঃসংযোগ মানে আপনার ব্র্যান্ডের পজিশনিংয়ের জন্য তত বেশি সম্ভাবনা।

in-1

মার্কেটিং এখন যেকোনো বিজনেসের স্ট্র্যাটেজি মেকিং সেন্টার হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে। আধুনিক ডিভাইস এবং প্রযুক্তির কল্যাণে যেমন বড় ডাইভার্সিফাইড কোম্পানিগুলো তাদের কাজের পরিধি বাড়াতে পেরেছে। ঠিক তেমনই ছোট ছোট উদ্যোক্তারাও মার্কেটে ঢোকার জন্য নতুন গ্যাপ এবং সুযোগ খুঁজে পাচ্ছে। ভালোকরে খেয়াল করলেই দেখতে পাই, গত কয়েক বছরে কী পরিমাণ নতুন নতুন স্টার্টআপ তৈরি হয়েছে। সেটা শুধু গ্লোবাল মার্কেটে না, বাংলাদেশেও। ডিজিটাল বিপ্লবের এ শক্তির চিত্রটি সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকে প্রকাশিত ‘ডিজিটাল ডিভিডেন্ডস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ইন্টারনেটে এখন একদিনে বিশ্বে ২০,৭০০ কোটি ই-মেইল পাঠানো হয়। আর গুগলে ৪২০ কোটি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খোঁজ করা হয়। এক যুগ আগেও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এসব ছিল একদম অকল্পনীয়। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে এক যুগ পর বিশ্বের ৮০ কোটি বর্তমান চাকরি হারিয়ে যাবে।’ স্বভাবতই আমাদের মতো শ্রমনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলো বিপদে পড়বে। এখন থেকেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, আইওটি, ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে যারা নিজেকে যত এগিয়ে নিতে পারবে; তারাই ভবিষ্যতে মার্কেটে লিড করতে পারবে বলে মনে করি।

জাগো নিউজ: এ সময়ের তরুণদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
রায়হান কবির: আমি নিজেই এখনো তরুণ। তবুও চাকরির অল্প কিছু অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি—প্রথমত, সফ্ট স্কিলসগুলো ডেভেলপ করতে হবে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন এ স্কিলগুলো ডেভেলপ করা উচিত। কমিউনিকেশন্স, লিডারশীপ, টিমওয়ার্ক, প্রবলেম সলভিং, এটিটিউড, ম্যানার, নেটওয়ার্কিং—স্কিলগুলো ছাত্রজীবনে এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসের মাধ্যমে যত বেশি আয়ত্তে আনতে পারবেন, কর্পোরেট লাইফে ঢুকে তত সহজে পারিপার্শ্বিকতার সাথে অ্যাডাপ্ট করে শাইন করতে পারবেন। কোন ক্লাবে ঢুকবেন, সেটা আপনার ক্যারিয়ার প্ল্যানের সাথে কিভাবে কো-রিলেটেড সেটা বুঝে সিলেক্ট করলে ভালো। ইন্টার বা ইন্ট্রা ইউনিভার্সিটি কম্পিটিশনগুলোয় অংশগ্রহণ করতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, কৌতূহল এবং জানার বা শেখার আগ্রহ থাকতে হবে। বিজনেসের ইকোসিস্টেম বুঝতে হবে। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে, এভাবে না হয়ে অন্য কীভাবে হতে পারতো—এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে নিজেকে ডেভেলপ করতে হবে। বিভিন্ন সমস্যাগুলোর নতুন নতুন সমাধান করার চেষ্টা করতে হবে।

তৃতীয়ত, নিজেকে সময় দিতে হবে নতুন কিছু শেখার জন্য। প্রতিদিন কিছু সময় নিজেকে দিন। স্পিকিং, রাইটিং, লিসেনিং স্কিলস আরও শার্প করে নিন। ভোকাব্যুলারিটা আরও স্ট্রং করে নিন। চাকরিতে ঢুকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রয়োজনীয় টুল হলো মাইক্রোসফট পাওয়ারপয়েন্ট এবং মাইক্রোসফট এক্সেল। নিজেকে যত বেশি স্কিলড করতে পারবেন, পারফরমেন্স এবং গ্রোথ অপর্চুনিটি ততো বাড়বে।

চতুর্থত, নিজেকে ডিফারেনশিয়েবল করুন। নিজের মধ্যে ইউএসপি ডেভেলপ করুন। নিজের মধ্যে এমন কোনো স্কিল অ্যাড করার চেষ্টা করুন, যেটা আশেপাশে সবার মধ্যে নেই। কিন্তু আপনার ডিপার্টমেন্ট বা আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন। আপনার চাকরির সাথে সম্পর্কিত কেস স্টাডিগুলো খুঁজে খুঁজে পড়ুন। নতুন ট্রেন্ড সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা রাখুন। আরেকটি পরামর্শ হচ্ছে, গৎবাঁধা জীবনে নিজেকে বন্দি করে ফেলবেন না। চেষ্টা করেন সব সময় পজিটিভ থাকার, প্যাশনেট থাকার। নিজের কাজের প্রতি আবেগ বা ভালোবাসা থাকাটা খুব জরুরি। যে কাজই করেন, নিজের সেরাটা দিয়ে প্যাশনের সাথে করেন। দেখবেন সফলতা ঠিক সময়ে আপনার দরজায় এসে কড়া নাড়বে।

এসইউ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]